গল্পেরা জোনাকি তে সুতপা পূততুণ্ড

গর্ব

সাময়িক ভট্টাচার্য্য মহাশয়,তার মেয়ের জন্যে পাত্র দেখতে এসেছেন,ওনার বড় ছেলে রেলে চাকরি করেন,উনি কাস্টমসে।
ভদ্রলোকের খুব নাম ডাক,এমন অনেক কেস উনি সরকারকে ধরে দিয়েছেন,ওপরওয়ালা খুশি হয়ে প্রমোশন দিয়েছে।
পাত্রের বয়েস ৩০ পাত্র ইংরিজী মিডিয়ামে পড়াশুনা করে এক আমেরিকান ফার্মে চাকরি করেন।খুব স্পিডএ শর্ট হ্যান্ড, টাইপিং করতে পারেন ,কিন্তু কথা বলার বেলায় তোতলা!
শুধু তোতলাই নয়,পাত্র অ এর ওপর অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকেন,সে কথা পাত্রের বাড়ির লোকজন লুকিয়ে গেছেন,নিঃশব্দে।
ভট্টাচার্য্য বাবু নাম জিজ্ঞেস করায় কোনো ক্রমে নাম বলেই অন্য ঘরে চলে গিয়েছিলেন।
যাই হোক বিয়ে হয়ে গেল! পাত্র এত টাই কথা বলায় অপারগ, নব বিবাহিত জীবনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো,সব কথাই ওর মা বলে দেয়,মাঝে মাঝেই ছেলের কথার ওপরে নিজের কথাই বসিয়ে দেন,মাস তিনেক যেতে না যেতেই মেয়ে গোপন করলেও ভট্টাচার্য্য বাবুর কানে যায়,এবং বুঝতে পারেন,তিনি লোক চিনতে কত বড় ভুল করেছেন। যে ছেলের পার্সোনালিটি নেই,সে কি করে সংসার করবে? বকুল ত জলে পড়ে গেল!
সাময়িক বাবু সুসাইড এটেমড করেন,কিন্তু ছেলের তৎপড়তায় সফল হন নি।এদিকে দিন দিন শরীর স্বাস্থ্য ভাঙতে থাকে।
এদিকে চক্রবর্তী গিন্নি ছেলের গর্বে গর্বিত! কারন তার ছেলেই একমাত্র বংশধর! অন্য দুই যা এর শুধুই মেয়ে।

বকুল খুব ঠান্ডা মেয়ে,নাচে ডিপ্লমা,বি এ পাশ। শশুর বাড়ি তে নাচের কথা কেউই জানত না!কেউ জানতেও চায় নি।
ও রান্না করতে অত ভালোবাসত না! কিন্তু কোটা বাছা,আরো অন্যান্য কাজ সবই করত!
চক্রবর্তী গিন্নি মাঝে মাঝেই অসুস্থ হওয়ার বাহানায় ছেলে কে নিজের ঘরে ডেকে নেন,নতুন বৌ একাই শোয়,অথবা নিজেই চলে আসেন গল্প করতে, রথিন ছোট বেলায় কিরকম ছিলো,ওর বাবা ফেলুনাথ চক্রবর্তী মিলিটারিতে ছিলেন,তার এবং তাদের জীবন যাত্রার গল্প কেমন ছিল,ইত্যাদি…
এইভাবেই নতুন বৌ পুরোনো হোলো অথচ স্বামীর সোহাগ কি আজও বুঝে উঠতে পারলো না!
একদিন চক্রবর্তী গিন্নি সত্যিই অসুস্থ হয়ে বেস হাসপাতালে ভর্তি হলেন, বেশ কিছুদিন বাড়ির বাইরে!
প্রায় দিন পনেরো কাটিয়ে বাড়ি ফিরেই ছেলের খোঁজ নিলেন ঘরে ডেকে নিজের কাছে শুতে বললেন,এবার ছেলেই বেঁকে বসল!
সেদিন থেকে বকুলের সাথে তুমুল অশান্তি!
একদিন অশান্তি চরমে উঠলো, রথিন সমালাতে পারলো না,বকুলের গায়ে হাত তুলে বসলো!
বকুল বাপের বাড়ি গেল না! মুখ বুজে পরে থাকলো!
মাস খানেক পর জানা গেল বকুল মা হতে চলেছে!
শাশুড়ির অত্যাচার বেড়ে গেল! তিন মাসের মাথায় বকুল বাপের বাড়ি চলে গেল…
মেয়ে হোলো, খুব ফর্সা টুকটুকে। রথিন গিয়েছিল,দেখতে অফিস ফেরত।
মেয়ে যখন তিন মাস বয়েস শশুড় অসুস্থ হওয়ায়,বকুল কে মেয়ে বাড়ি নিয়ে আসে রথিন। বেশ কিছুদিন শাশুড়ি ঠান্ডা ছিলেন।স্বামী গত হলেন,উনি আবার একা!
সবাই বল্ল এক কাজ করো মেয়ে কে শাশুড়ির কাছে শোয়াও,ওনার আর একলা একলা লাগবে না! আর বয়েস্ক মানুষের কাছে বাচ্চারা ভালোই থাকে!
বকুল রাজি হোলো না! অগত্যা ছেলেই মায়ের সাথে পাশের ঘরে থাকতে শুরু করলো…..
মেয়ে ক্লাস সেভেন ওদের বাড়ির মেজো গিন্নি অসুস্থ, বেশ কিছু দিন পর উনি গত হলেন,বড় গিন্নি ওমনি বলে উঠলেন দেখলে ত!বৌমা, আমার ছেলেই ত মুখে আগুন দেবে!
তোমারো যা কপাল একটা ছেলে বিয়োতে পাড়লে না? সেই মেয়ে!
এদিকে রথিন, মা আর বৌ দুজনের সম্পর্কের যাঁতা কলে পড়ে মদ খেতে শুরু করল,দিনের পর দিন তা মাত্রাতিরিক্ত! বকুল এতই অপারগ যে স্বামী কে বোঝাতে অক্ষম।
বাড়ির ছোট কর্তাও হঠাৎ স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন!
বড় গিন্নি মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলেন দেখলে ত বকুল,কি বলেছিলাম? আমার ছেলেকেই শ্রাদ্ধ শান্তি করতে হবে! বংশের বাতি বুঝলে বংশের বাতি।

রথিন দিন দিন কমজোর হতে লাগলো, একটার পর একটা চাকরি চলে গিয়ে ঘরে বসা! সব খরচ মায়ের পেনশন আর বকুলের বাপের বাড়ি থেকে ওর দাদা হাত খরচ পাঠাত,তাই দিয়েই চলত।
একে একে সবাই গত হলেন, ,মেজো কর্তা,ছোট কর্তা কেউ আর বেঁচে নেই! এদিকে বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় ছোট মেয়ের ঘরে মেয়ে কে নিয়ে এলেন ছোট গিন্নি। আর মেজো কর্তার ঘরে তার বড় মেয়ে থাকতে শুরু করল!
বাড়ি টা আবার জমজমাটি!
কিন্তু রথিন দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়লো! না মায়ের হুস আছে না বকুল এর।
একদিন বাথরুম করতে গিয়ে রক্ত দেখে রথিন আঁতকে ওঠে!
কথা জানাজানি হয়,বড়দি বর জামাই বাবু বেস হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলে আমরা কিছুই করতে পারব না,ওর লাস্ট স্টেজ জন্ডিস! লিভারের বারোটা বেজে গেছে!
আপনারা কমান্ডে নিয়ে যান।
ওখানে প্রায় দিন পনেরো ছিলো,তারপর শব শেষ!
বড় চক্রবর্তী গিন্নি পাগল হয়ে গেলেন!
একদিন নিজেই গায়ে আগুন ধরিয়ে চিৎকার করতে করতে বাইরে বেড়িয়ে অজ্ঞান হয়ে বারান্দায় অর্ধমৃত অবস্থায় পরে রইলেন,হাসপাতালে তিন দিন ছিলেন,তারপর যবনিকা পতন।
বড় চক্রবর্তী গিন্নির মুখাগ্নি করলেন তার মেয়ে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।