মার্গে অনন্য সম্মান শ্যামাপ্রসাদ সরকার (সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৭৯
বিষয় – নারী

পাষাণী

সুমনা তার ছোট্ট সংসারের সর্বময়ী কর্ত্রী। কদিন ধরেই একটা ওয়াটার পিউরিফায়ার মেশিন নিজের নতুন ফ্ল্যাটে কোম্পানীর লোকই এসে লাগিয়ে যাবার কথা। এই ফ্ল্যাটটাতে দুমাস হল ওরা এসেছে। বেশ সস্তায় পেয়েছে ফ্ল্যাটটা। একদম নতুন নয়, তবে আগের মালিক বড়জোর একবছর ফেলে ছড়িয়ে থেকেছে। মোটামুটি নতুনই বলা চলে। সুপ্রতীম লোনটা আর একটু আগে পেলেই নববর্ষের সময়ই ওরা চলে আসতে পারত। শ্বশুরবাড়ী সেই রাজপুর ছাড়িয়ে। যৌথপরিবারে যে প্রাইভেসিটা কখনোই ছিলনা, নিজের ফ্ল্যাটে সেটা উসুল করবে এবার। কয়েকটা বাহারী পাতার টবের খুব ইচ্ছা ছিল, পেলমেট থেকে ঝোলা ভারী বাদামীরঙের পর্দা, পোর্সেলিনের ডিনার সেট আস্তে আস্তে এসবই পূরণ করে একচিলতে নিজের নীড় কি সে বানিয়ে উঠতে পারবেনা?

সুপ্রতীম অফিস বেরিয়ে গেলে টুকিটাকি সেলাই নিয়ে সুমনা বসে। বাহারী টি -কোজি বা বালিশের ওয়ার এগুলো হাতেই বানাতে ভালবাসে। হাবড়ার বসন্তকুমারী শিল্পনিকেতনের শিক্ষা কাজে লাগে এতদিনে। একটা বাচ্চাকাচ্চা থাকলে এই সময়টি হয়তো অন্যভাবে কাটত। সবে দু বছর বিয়ে হয়েছে, এখন আর আগের মত কেউ হুট করে বাচ্চাকাচ্চা নেয় না।
….
ডোরবেলটা বাজল হঠাৎ। যাক্ জলের মেশিনের লোকটা এসেছে তাহলে। সুমতি উঠে দরজা খুলে অবাক ! সুপ্রতীম, এই সময়ে হঠাৎ ! শরীর টরীর ঠিক আছে তো। চটজলদি লেবুর শরবৎ বানিয়ে ওর সামনে আনে ! ততক্ষণে জামাটামা খুলে গেঞ্জী আর হাফপ্যান্টে সুপ্রতীম ওর পিছনে এসে দাঁড়ায়। জাপটে ধরে তীব্রতম আশ্লেষে সুমনাকে । নটমল্লার রাগে বিলম্বিত থেকে দ্রুত লয়ে বেজে ওঠে সেতার। আলাপ থেকে ঝালায় বাজে ঝংকার।

অনেকদিনের পর বৃষ্টি এলে যেমন হয়, তেমনই ঝড় বয়ে গেল সুমনার ভিতরে। ক্লায়েন্টের অফিস নাকি ওদের বাড়ীর কাছেই, তারই ফাঁকে নাকি তেনার এই অসময়ে আগমন ও প্রাণপ্রিয়াকে চমকে দেবার হঠাৎ ইচ্ছা। দুজনে একসাথে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার সুপ্রতীম বেরিয়ে যায় ক্লায়েন্টের কাছে। সুমনা তারপর মুহূর্তটার ভালোলাগা আর তৃপ্তি নিয়ে ভাবতে বসে। অনেকদিন পর ঝড় উঠল আজ। কিন্তু একটা খটকা ! সুপ্রতীমের পিঠের বাঁদিকের ওপর একটা বড় আঁচিল আছে সেটা ওর খুব প্রিয় লাভস্পট, কিন্তু আজকের আদরের সময় পিঠে ওর ঐ আঁচিলটা আজ সুমনা খুঁজে পেল না কেন !
…………..

নর্মদা নদীতটে শান্ত সমাহিত এক ঋষির আশ্রম। ঋষিপত্নী তখন পরমান্ন রন্ধনে ব্যস্ত। হঠাৎ অসময়ে ঋষির গৃহে আগমন। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কামনা করলেন ঋষিপত্নীর দেহসান্নিধ্য। বহুযুগের জটাধারী জিতেন্দ্রিয় ঋষির কামনার আগুনে পুড়তে পুড়তে তৃপ্তির অভিনয় করলেন ঋষিপত্নী আজ। একটি বিষয়ে তিনি সন্দিহান হলেন, যে দীর্ঘকাল উপবাসের পরেও রতিসঙ্গমে তো ঋষির দ্রুত স্খলন ইতিপূর্বে কখনো ঘটেনি !

বিকেলে সুপ্রতীম ফিরল একদম অন্য মানুষ হয়ে।সেই ঝড়ের দাপাদাপির কোনও উচ্যবাচ্যই সে আর করলো না। অন্যদিনের মত মাথা ধরেছে বলে বাম লাগিয়ে গা এলিয়ে টিভি চালালো। সুমনা তখন রান্নাঘরে রুটি সেঁকছে। সারাদিনের পর সুপ্রতীম যেন দুপুরটির কথা ভুলেই গেছে। নিজেকে এবার খুব বোকা ও অপমানিত লাগে সুমনার।
…………….
সঙ্গমের অতৃপ্তি নিয়ে ঋষিপত্নী আবার রন্ধনশালায় পরমান্ন সহ সামান্য গোধূমচূর্ণের মন্ড প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করেন। ঋষি তখন যজ্ঞের সমিধ আহরণের নিমিত্তে তপোবনের অন্যপ্রান্তে নিষ্ক্রান্ত হলেন। ঋষিপত্নী খাদ্যের আয়োজন করে ঋষির জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকেন। দ্বিপ্রহরের উপান্তে ঋষি এসে হঠাৎ বিস্মিত হন ! কেন এই খাদ্যের আয়োজন অসময়ে? কোন অতিথি তবে এসেছেন তাঁর কুটিরে? ঋষিপত্নী বিস্মিত হন বেশী !খানিক পূর্বেই তো তিনি সঙ্গম তৃপ্ত হয়ে সমিধ সংগ্রহের জন্য অরণ্যের গভীরে গেলেন ! এত বিস্মৃতিও কি সম্ভব?
….
যোগবলে ঋষি জানতে পারেন তাঁর বেশধারণ করে দেবরাজ ইন্দ্র এসে ভোগ করে গেছেন তাঁর স্ত্রীকে। আর রতিপ্রিয়া কামুক ঋষিপত্নী উপভোগ করেছে সেই স্বাদু বলাৎকার! ক্রোধে ঋষির ব্রহ্মতেজ উদ্দীপিত হয়। উভয়কেই অভিসম্পাত করতে যজ্ঞোপবীত স্পর্শ করেন ঋষিবর।
…………..
এবারে সুপ্রতীমকে রাতে কাছে ডাকে সুমনা। তার পিঠে আঁচিলটাকে হাত দিয়ে খোঁজে সে। ওই তো! আঁচিলটা তো আছে এখন ঠিক জায়গায়। সে স্হির জানে, দুপুরের দামালপনার সময় ওটা সে খুঁজে পায়নি তখন! এদিকে সুপ্রতীম সারাদিনের ক্লান্তিতে বিরক্ত মুখে ঘুমিয়ে পড়ে।
….
সুমনা নিদ্রাহীন জেগে থাকে বিছানায়। সে অনুভব করে তার পেলব নরম বিছানাটা আস্তে আস্তে কঠিন প্রস্তরবৎ হয়ে যাচ্ছে। যেন পুরো এই দুকামরার ফ্ল্যাটটাকে গ্রাস করে নিচ্ছে সেই পাথরের দেওয়াল। আর যেন নিজেই ক্রমে সে একটা পাথুরে ফসিল হয়ে যাচ্ছে, একা অন্ধকারে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।