T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় স্বপন পাল

ভালো থাকা
অসভ্য, ইতর, আনকালচারড, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, ইচ্ছে করে মেয়েদের গায়ে এসে পড়েন। আপনাদের মতো লোকের হাতটা মুচড়ে ভেঙ্গে দিতে হয়।
বাসের দুলুনিতে একটু ঘুম ঘুম ভাব লাগছিল সুমিত্রর। চিল চিৎকারে সেটুকু কেটে গেল। ঠাস-জমাট ভিড় এখন বাসে। বইমেলার পাশের স্ট্যান্ড থেকে যখন উঠেছিল, বাস তখন বেশ খালি ছিল। লম্বা রাস্তাটা পাড়ি দিতে দিতে সন্ধ্যে যেমন রাতের দিকে ঝুঁকেছে ভিড়ও তেমনি বেড়েছে। তবু সুমিত্র এর ওর পা বা কোমরের ফাঁক গ’লে দেখার চেষ্টা করলো নারীশক্তিটিকে। তবে কিছু বিকৃত মনের মানুষ ভিড়ের সুযোগে মেয়েদের হেনস্তা করার ছুতো খোঁজে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সুমিত্র জানে এরপরই দু’চারজন মানুষ মেয়েটিকে সমর্থন করবে আর অপরাধী যদি চিহ্নিত হয়ে থাকে তবে তাকে দিয়ে ক্ষমাও চাওয়াবে । প্রায় নিশ্চিন্ত সুমিত্রকে চমকে দিয়ে মেয়েটি আবার চিৎকার করে উঠলো। ধস্তাধস্তির মতো কিছু একটা হতে যাচ্ছে অনুমান করে ভিড়টা অকুস্থল থেকে একটু সরে যেতেই সুমিত্র দেখতে পেলো ফর্সা সুন্দর দেখতে একটি বছর চব্বিশ-পঁচিশের মেয়ে মারমুখী হয়ে নিজের সীট ছেড়ে সামনে দাঁড়ানো পঁয়ত্রিশ-চল্লিশের এক সুঠাম ভদ্রলোকের ডানহাতটা ধরে মুচড়ে দেবার চেষ্টা চালাচ্ছে। মেয়েটির ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখ দু’টো আর মুখের ভঙ্গিতে চরম জিঘাংসা যেন তাকে হিংস্র কোন প্রাণীর চেহারায় নামিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সুমিত্র এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে সে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো,
এ কি করছেন, আপনি সরাসরি গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন ? ভিড় বাসে উনি তো বলছেন টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেছেন, তা ছাড়া আপনি জানলার ধারে বসে, কোন খারাপ মতলবে ওঁর পক্ষে সকলকে ডিঙ্গিয়ে আপনাকে ছোঁয়া সম্ভব নাকি ?
ব্যস, আর যায় কোথায়, মেয়েটি প্রায় সমান আক্রোশে ভিড়ের ওপাশ থেকেই চেঁচিয়ে উঠলো, আবার দেখতে পেলো সুমিত্র, সেই অস্বাভাবিক বড় বড় চোখ আর সুন্দর ছাঁদের মুখখানার জান্তব বিকৃতি।
আপনি আবার কে এলেন ? এই লোকটার জুড়িদার নাকি ? চুপচাপ বসে থাকুন, নইলে-।
নইলেটা আর কি হতে পারে ভাবতে ভাবতে মাথাগরম হয়ে আসে সুমিত্রর। সে বলে ফেলে,
দেখুন আপনি কিন্তু একটা অফেন্সিভ কাজ করেছেন। আমরা সেটা সবাই দেখেছি, হলেনই বা আপনি মহিলা, নিরীহ ভদ্রলোককে আক্রমণ করে আপনি অন্যায় কাজ করেছেন।
উদ্ধত গলায় মেয়েটি বললো,
বেশ করেছি। কোথাকার উকিল এলো রে, ন্যায় শেখাচ্ছে ? কোথায় নিয়ে যাবি চল, থানায় ? কোর্টে ? তোর সঙ্গে আমার কোর্টেই দেখা হবে।
এবার হঠাৎ বাসের ড্রাইভার প্রতিবাদের গলায় বলে উঠলো,
ভদ্র ভাবে কথা বলুন, একজন বয়স্ক মানুষকে এই ভাষায় কথা বলছেন, আপনি কি শিক্ষিত ? আপনার ভাষা শুনে কেউ সে কথা বলবে না।
সুমিত্র এবার থমকালো। সত্যিই তো সে একজন বয়স্ক মানুষ, তার কি উচিত হচ্ছে এই মেয়েটির সঙ্গে অযথা বিতর্কে জড়িয়ে পড়া ? সে ভাবতে শুরু করলো। ইতিমধ্যে বাসের অনেকে মেয়েটিকে পাগল, খুনি মেন্টালিটির মানুষ এইসব নানা বিশেষণে অভিহিত করে চলেছে। কেউ একটু এগিয়ে বলছে, এর তো পাগলা গারদে নয়তো জেলে থাকা উচিত।
সুমিত্রর ভাবনায় তখনই ভেসে উঠলো একটা মেয়ের মুখ। রাকা। ভালবেসে বিয়ে করেছিল প্রীতমকে। দু’জনেই চাকরী করে কনসাল্টেন্সি ফার্মে। রাকা সফ্টওয়ার আর প্রীতম ইলেক্ট্রিক্যাল। চাকরী করতে করতেই চেনা, পছন্দ, তারপর বিয়ে। রাকার বাবা-মা আপত্তি করেননি তেমন। শুধু প্রীতমরা পাঞ্জাবের বাসিন্দা, এই নিয়ে রাকার মায়ের একটু খুঁতখুঁতানি ছিল প্রথম দিকে। তবে নিখুঁত বাংলা বলতো প্রীতম। আদব কায়দাতে বোঝার উপায় ছিল না যে ও পাঞ্জাবী। বছর দুই আগে শেষবার যখন দিল্লী গিয়েছিল রাকার বাবা-মা, তখনও বোঝা যায়নি ওদের ভিতরের সাঙ্ঘাতিক ভাঙ্গন, ধরা পড়েনি ওঁদের অভিজ্ঞ চোখেও। শুধু রাকার মা ফিরে এসে বলেছিলেন, রাকার অন্যমনস্কতা নিয়ে। হতে পারে সেটা রাকার মিসক্যারেজের কারণে। সান্ত্বনা দিয়ে এসেছিলেন রাকার মা রাকাকে। এত দৌড়-ঝাঁপ করে চাকরী করা, হয়তো ঠিকঠাক নিজের দিকে খেয়াল দিতে পারেনি। আবার সন্তান আসবে, এবার সে নিশ্চয় অনেক বেশী সতর্ক থাকবে, ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলবে। রাকাকে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, এবার খবর পেলেই তিনি চলে আসবেন এখানে, মেয়ের দেখাশোনা করতে।
দিল্লী থেকে ফেরার তিনটে মাস যেতে না যেতে শুনলেন দুঃসংবাদটা। প্রীতম ওর এক বান্ধবীর সঙ্গে লিভইন করছে। ছেড়ে গেছে রাকাকে। ওই সম্পর্ক নাকি অনেক দিনের। শুধু রাকা নিজেদের সম্পর্কটা কোনমতে টিকিয়ে রেখেছিল। আর মিসক্যারেজ হয়নি রাকার, ওকে প্রায় জোর করে অ্যাবর্শান করিয়েছিল প্রীতম। একটা অপরাধবোধে ভুগতো মেয়েটা, যেটাকে ওর মা অন্যমনস্কতা ভেবেছিল। গায়ে হাত পর্যন্ত তুলতো প্রীতম, মেয়েটার। তবু রাকা কেলেঙ্কারির ভয়ে থানা-পুলিশ করেনি। দু’জনেই প্রশ্নের মুখে পড়বে তাদের কাজের যায়গায়। হয়ে গেছে ওদের ডিভোর্স। তবু শান্তিতে আছে কি রাকা ? সুমিত্র জানে, শান্তিতে নেই তার একমাত্র সন্তান রাকা। ওর মা তো সেই শয্যাশায়ী হলো, আর সুস্থ হলো না। গতবছর শীতে সে চলে গেল সুমিত্রকে একা করে দিয়ে। মেয়ে বলেছিল খুব করে, তার কাছে চলে যেতে। না, সুমিত্র আর মায়ায় জড়াতে চায়নি। এই ভাল আছে। এখানে ওখানে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ায়। মেয়ে নিয়ম করে প্রতিদিনের খবর নেয়। সেটাও সুমিত্রর অভ্যাসে ঢুকে আছে। বেরিয়ে যেতেই বা কতক্ষণ।
সুমিত্রর স্টপেজ এসে পড়েছে। কেউ নেই তার অপেক্ষায়, তবু ফেরে। চলন্ত বাসের সীট ছেড়ে উঠে ছাদের রড ধরে টাল সামলায়। কন্ডাক্টার স্টপেজের নাম বলে চলেছে নামবার যাত্রীদের উদ্দেশ্যে। এক পা এগোতেই প্রায় ফাঁকা হয়ে আসা বাসের সামনের জানালার ধারের সীটের দিকে চোখ চলে যায় সুমিত্রর। সেই মেয়েটি তখনও সেখানে বসে। আরও পরের দিকে নামবে হয়তো। একমনে হাতের স্মার্টফোনের স্ক্রীনে কোন ভিডিও দেখে চলেছে। না, এখন তার মুখে কোন হিংস্রতার চিহ্নমাত্র নেই। কি কোমল, সুন্দর মুখখানি। থেমে যাওয়া বাসের পা-দানি থেকে মাটিতে নামতে নামতে যেন একচিলতে মুচকি হাসি দেখতে পেল সুমিত্র, মেয়েটার ঠোঁটে। চোখ তার সেই মোবাইল স্ক্রীনে। কেন জানি সুমিত্রর মনটা হাল্কা হয়ে এলো, মনে মনে বলেও ফেললো, ভাল থাকিস মা।