গল্পেরা জোনাকি তে স্মার্ট পরিয়াল – ৪

আই ফিল দ্য এন্ডিং, বিফোর ইট ইভেন স্টার্টস
বর্তমান সময়,
আমি বললাম,’তুই কিন্তু এখনো ডিটেইলসে বলিসনি চয়ন কীভাবে মারা গেল।’
অংশুমান বলল,’বেশ। বলছি। মৃত্যুর সময় রাত বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে। গোয়েন্দারা মনে করছে সুইসাইড। হয়তো জেনে গেছিল বেঁচে ফেরার পথ নেই তাই এই পদক্ষেপ। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। কারণ আমি জানি তুই স্বপ্ন দেখিস। কীভাবে মারা গেছিল শুনবি? কানে পেন্সিল ঢুকিয়ে। ঠিক যেমন বলেছিলিস,সেলের মধ্যে রক্ত ভেসে যাচ্ছে। চয়নের বডি সেখানেই পড়ে আছে। হ্যাঁ ভয়াবহ দৃশ্য।’
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,’তোর বলা শেষ হলে,আমিও কিছু বলব এবার। কৃষ্ণা মারা যাওয়ার সময় আমার অ্যাক্সিডেন্ট হয়,তখন তুই কোথায় ছিলিস?’
-‘নিজের বাড়িতেই ছিলাম,তারপর পুলিশ খবর দেয় তখন স্টেশনে যাই।’
-‘আর তুই ফোন করে সবার আগে আমাকে খবরটা দিলি। রীতেশ মারা যাওয়ার পরেও তুই এসে খবর দিলি আমাকে ঘুম থেকে তুলে। তখন তুই কী করছিলিস আমি জানি না। আমার ঘরে তালা দেওয়া থাকলেও তোর ঘর তো খোলা ছিল। আজকেও চয়ন মারা গেলে তুই প্রথম খবরটা দিস আমাকে। আর কাল সারারাত তুই বাড়ি ছিলিস না। চয়নের মৃত্যুর সময় বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে। মানে অ্যালিবাই কিন্ত তোরও নেই।’
অংশুমান হাসতে শুরু করল,বলল,’যাক,বুঝেছিস তবে?’
আমার অস্বস্তি হতে থাকল কেমন,ও হাসছে কেন,চিৎকার করে বললাম,’কেন হাসছিস তুই?’
অংশুমান বলল,’বুঝেই যখন গেছিস নে আমাকেও মার!’
এই বলে ছুড়িটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল,’তার মানে সত্যিই তুই! তুই খুন করছিলিস?’
-‘হ্যাঁ। নে খুন কর এবার।’
মনে মনে ভাবছিলাম সবকিছু এতটাই সহজ?এত সহজে কেউ স্বীকার করে নেয় যে সে খুনি?আর তারপর খুন করতে বলে?খুন করাটা এত সহজ?আমি বললাম,’না। আমি ওসব করি না। কিন্তু কেন খুন করেছিস তুই ওদের?’
অংশুমান বলল,’করতে হতো তাই।’
-‘মানে?কেন করতে হতো?’
-‘তুই তো বলেছিলিস করতে।’
-‘কীসব বলছিস!’
-‘হ্যাঁ তোর স্বপ্ন। তোর স্বপ্নই তো বলছিস খুনগুলো করতে।’
-‘আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।’
-‘একটা কথা বল। এই জগতটা তোর কী খুব সাধারণ লাগছে?এই যেমন ধর,এতগুলো খুন হল,তুই কী কারুর বডি দেখতে পেয়েছিস?’
-‘না দেখিনি,দেখতে চাইনি বরং। তুই তো দেখেছিস।’
-‘উহু,আমিও না। কারণ এখানে কেউ মারা গেলে সে ভ্যানিস হয়ে যায়।’
-‘তুই কি মস্করা করছিস আমার সাথে?এটা এসব করার সময়!’
-‘যা বলছি সত্যি বলছি। শোন তবে। শেক্সপিয়ার কী বলেছিলেন জানিস? এই দুনিয়া একটা রঙ্গমঞ্চ,আর আমরা এক একটা কাঠপুতুল। এই দুনিয়া যেভাবে নাচাচ্ছে আমরা নাচছি। কেউ জানি না কে নাচাচ্ছে, কেন নাচাচ্ছে কিন্ত আমাদের নাচতেই হবে।’
আমি জানি না হঠাৎ করে কেন এসব বলছে,মুখ ফসকে বলে ফেললাম,’প্যারালাল ইউনিভার্স!’
-‘ঠিক তাই। তুই যেগুলো স্বপ্নে দেখছিলিস সেগুলো স্বপ্ন নয়। সেগুলো প্যারালাল ইউনিভার্সে আসলেই ঘটেছে। হয়তো সেই ইউনিভার্সে আমরা সবাই আছি,সেখানেও একে একে সবাই খুন হচ্ছে কিন্ত একভাবে নয়। প্যারালাল ইউনিভার্সের সৃষ্টি হয় এক একটা সম্ভাবনা থেকে। যেমন একটা ছোট্ট জিনিস,কেউ কাউকে খুন করলে পৃথিবীর সমস্ত ঘটনা একরকম হতো,আবার ঠিক তাকেই বাঁচিয়ে রাখলে সমস্ত ঘটনা অন্যরকমভাবে ঘটতো,আর এই নিয়েই হতো আর একটা সম্ভাবনা,আর একটা ইউনিভার্স। এবার এই ইউনিভার্সের আমার সাথে প্যারালাল ইউনিভার্সের আমার সম্পূর্ণ মিল নাও থাকতে পারে। শরীর এক,কিন্ত চরিত্র এক নয়। এই পৃথিবীর চরিত্রগুলো উল্টেপাল্টে আর এক পৃথিবীর চরিত্র তৈরি হচ্ছে। যেমন ওখানে তুই আমার ছেলে,বাবা এমনকী স্ত্রীও হতে পারিস। হতে পারিস তুই নারী,কিন্তু ওটা তুই।’
-‘কিছু জিনিস বুঝতে পারছি। তোর ঘরে যে বইটা আছে সেটাও পড়লাম। তার মানে প্যারালাল ইউনিভার্সে এই ঘটনাগুলো ঘটছে। আর হতে পারে সেই খুনগুলো আমিই করছি। যার জন্য আমার স্বপ্নে সেগুলো আসছে। এর কারণ হল দুই ইউনিভার্সের চরিত্রগুলোর মধ্যে একটা কানেকশন আছে সেইজন্য!’
-‘একদমই তাই। ভেবে দেখ প্রথমে তুই খুন হতে দেখিস রীতেশকে,লাল জ্যাকেটের সাথে। কিন্ত সেই লাল জ্যাকেটটাই কৃষ্ণা পরে আর সে মারা যায়। পরেরবার তুই খুন হতে দেখিস চয়নকে,কিন্ত খুন হয় রীতেশ। মানে ওই ইউনিভার্সে অর্ডার এভাবেই ছিল,রীতেশ তারপর চয়ন। এবার আগেরদিন তুই আবার খুন হতে দেখলি চয়নকে। হতে পারে এই দুনিয়ার চয়ন ওই দুনিয়ার কৃষ্ণা! বললাম না চরিত্রগুলো উল্টেপাল্টে একটা পৃথিবী তৈরি হয়।’
-‘আমার কেন জানি সব গুলিয়ে যাচ্ছে।’
-‘স্বাভাবিক। তবে তুই এখনও আমাকে দেখিসনি খুন হতে। তাই আমাকে চেষ্টা করেও মারতে পারবি না। দেখবি?’
এই বলে সে ছুড়িটা নিজের পেটে ঢোকাতে গেল,আমি চিৎকার করে উঠে থামাতে গেলাম। কিন্তু পারলাম না। তারপর যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ছুড়িটা ওর শরীরে ঢুকছেই না। আমি বললাম,’এটা কীকরে সম্ভব?’
-‘হ্যাঁ সম্ভব,কারণ তুই স্বপ্ন দেখিসনি।’
-‘কিন্তু এমনি তো হওয়ার কথা নয়। এটা তো তাহলে কোনো পৃথিবীই নয়।’
-‘নয় তো। এটা কোনো স্বপ্নও না,কোনো নাটকও না। এই পৃথিবীর গঠন বোঝাতে আগে প্যারালাল ইউনিভার্স বোঝাতে হতো। তবে এটা সত্যিই কোনো ইউনিভার্স না। একে বলা হয় ট্যানজেন্ট ইউনিভার্স(Tangent Universe)। এর অস্তিত্ব কয়েক সপ্তাহ,বড়জোর এক মাস।’
-‘সেটা কী আবার?কেনই বা হয়?মানে আমরা আসল মানুষ না?’
-‘দেখ। একটা প্রাইমারি ইউনিভার্স হয়। যেটা আসল। এই ট্যানজেন্ট ইউনিভার্স তৈরি হয় যখন ফোর্থ ডাইমেনশন করাপ্ট হয়ে যায়। এরফলে প্রাইমারি অর্থাৎ আসল ইউনিভার্সে সাংঘাতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এই জন্যই তৈরি হয় ট্যানজেন্ট ইউনিভার্সের। আর এই ইউনিভার্সের একজন রক্ষাকর্তা হয়। যাকে একরকম নায়ক করা হয়ে থাকে যেটা হলি তুই।’
-‘সেটা কী আমি স্বপ্ন দেখছি তার জন্যই?’
-‘ঠিক। এই ইউনিভার্সের হিরোর কাছে অনেক শক্তি থাকে। আর এই স্বপ্নগুলো মোটেও স্বপ্ন নয়। এগুলো এক একটা সংকেত। এগুলো তোর টাস্ক যেগুলো সম্পূর্ণ করতে হয়। আর এটা আসে প্যারালাল ইউনিভার্স থেকে। যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই।’
-‘আর সেই টাস্কগুলো খুন করা? কিন্তু কেন করতে হবে এগুলো?’
-‘এই কাজগুলো করলেই বিশৃঙ্খলা কমবে। আর নাহলে এই ট্যানজেন্ট ইউনিভার্স শেষ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে সৃষ্টি করবে একটা ব্ল্যাক হোলের। যার ফলে আসল পৃথিবী,যে পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব আছে সেটা ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্ল্যাকহোল পুরো পৃথিবীকে নিজের দিকে টেনে গ্রাস করবে।’
-‘কিন্তু খুন তো আমি করিনি।’
-‘হুমম। তুই স্বপ্ন দেখেছিস,এইজন্য তুই হিরো। বাকি কাজটা আমি করেছি। কারণ এই ইউনিভার্স সম্পর্কে আমি জানি। তোর কাছে ক্ষমতা আছে স্বপ্ন দেখার, এই শক্তি তোকে দিয়েছে। তবে তুই দুর্বল,ইমোশনাল যার জন্য খুনগুলো আমাকেই করতে হয়েছে।’
-‘আসতে আসতে বুঝতে পারছি। এই ইউনিভার্স সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের রিইউনিয়নের সময় থেকে। পনেরো দিন হয়ে গেছে। হাতে কদিন আছে জানি না।’
-‘আর একটা কথা। যেটা বলতেই হবে তোকে। যার জন্য অনেকক্ষণ ধরে তোকে উত্তেজিত করছিলাম আমাকে খুন করার জন্যে।’
-‘ কী জিনিস বল?’
-‘ট্যানজেন্ট ইউনিভার্সের হিরোকে একটা Sacrifice করতে হয়। বিশাল বড়ো বলিদান দিতে হয়।’
-‘মানে সুইসাইড?’
-‘হয় ওটা নাহলে নিজের সবচেয়ে কাছের কাউকে মারতে হবে। নাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।’
-‘ঠিক আছে,এই পৃথিবীতেই তো মরব, একটু নয় কষ্ট হবে,সহ্য করে নেবো।’
-‘না। যে বলিদান দেবে সে আর আসল পৃথিবীতে ফিরবে না। আর তাকে সেই ফোর্থ ডাইমেনশনাল অবজেক্টের মাধ্যমেই মরতে হবে যার জন্য এতসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। আর তাই আমাকে মারতে হলে ওটা দিয়েই মারতে হবে,তবে স্বপ্ন দেখার পর। আমি জানি আমি তোর সবচেয়ে কাছের মানুষ। তাই আমাকে বলি দিলে এই পৃথিবীও বেঁচে যাবে।’
-‘কীসব বলছিস। না এ হতেই পারে না। মরলে আমি মরব।’
-‘এই জিনিসটাও আমাদের হাতে নেই। স্বপ্নে যা দেখবি তাইই হবে।’
-‘এই তো বললি হিরোকে….’
-‘তাই হয় সাধারণত। কিন্তু এক্ষেত্রে স্বপ্নটা বিশাল বড়ো ফ্যাক্টর। ওগুলোই তোর টাস্ক,ওটাই মানতে হবে। এতদিন নয় নিজে খুন করছিলাম। কিন্তু এরপর বাকি কাজটা তোকেই করতে হবে। কারণ তুইই এই ইউনিভার্সের হিরো।’
-‘আর আমি ভাবছিলাম স্বপ্ন দেখলে বুঝি খুন হবে। এইজন্য গতকাল জেগে থাকছিলাম। তবে গতকাল আমি কোনো স্বপ্ন দেখিনি।’
-‘তার মানে সময় এখনো আছে। তবে…’
-‘আবার কী?’
-‘ফোর্থ ডাইমেনশনাল অবজেক্টটা কোথায় আছে জানি না। ওটা খুঁজতে হবে। ওটা কী জিনিস তাও জানি না। হয়তো তোর স্বপ্নে এর সংকেত পাবি।’
-‘এখন তবে শুধু আমার ঘুমের অপেক্ষা?’
-‘একেবারেই তাই।’
-‘আচ্ছা সেই অবজেক্টটা খুঁজলে হয় না?’
-‘কীভাবে সম্ভব সেটা?’
-‘নিশ্চয়ই বিশৃঙ্খলা যতটা জায়গা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ততটাই এই ইউনিভার্সের পরিধি।’
-‘তা ঠিকই বলেছিস। কিন্তু এভাবে খুঁজে পাওয়া কী সম্ভব?বিষয়টা মোটেও অতটা সহজ নয়। তুই অপেক্ষা কর স্বপ্ন দেখার। তারপরেই ভাবা যাবে কী করা যায়।’
-‘সেই ভালো। বেকার চিন্তা করছি হয়তো।’