রম্য রচনায় সুস্মিতা পাল

 

মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই আদ্যিকালের মাস্টারমশাইদের দিন কালই দিব্যি ভালো ছিল।কড়া শাসনের বজ্রআঁটুনি, বেগড়বাই করেছো কি সপাসপ বেতের বাড়ি। মানসিক স্বাস্থ্যটাস্থ্য নিয়ে ভাবনার বালাই ছিল না বিন্দুমাত্র।এখন তো কড়া কথা টুকুও বলা বারণ, যতই থাক না কেন কারণ। তবে,কোন্ পদ্ধতি ভালো -সেটা তো তর্কসাপেক্ষ। সময় পাল্টেছে, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ব্যবহারের ধরনধারনও বদলেছে বিস্তর। যুগের দাবী মেনে টিচাররাও এখন ‘কুল’ , ফুলের মতোই নরমসরম আর সুদৃশ্য।
তবে খাস কোলকাতা থেকে একটু দূরে যেখানে টিচাররা বিশেষ করে প্রাইভেট টিউটররা এখনও প্রফেশনালিজমের হাওয়া ততটা গায়ে মাখেননি, সেসব অঞ্চলে সম্পর্কটা কিছুটা অন্য স্বাদের । সবাই হয়তো নয়, তবু কেউ কেউ পড়াশোনার পরিধির বাইরে সীমারেখা টপকে ঢুকে পড়েন স্টুডেন্টদের ব্যক্তিগত পরিসরে। অনধিকার প্রবেশ নয়, সাদর আমন্ত্রণ জুটে যায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রে।
বিশেষ পরিচিত এমন একজনের কথা শোনাই তাহলে। খাস কোলকাতায় আসতে গেলে ছাত্রজীবনে তিনি অহরহ এই গানটাই মনে করতেন-“ও গঙ্গা তুমি, ও গঙ্গা বইছ কেন?” বসত ছিল নদীর ওপারে আর হায়ার এডুকেশনটা যেহেতু কোলকাতায় সেরেছিলেন, বেশ কিছুসময় প্রতিদিন হাওড়া ব্রিজ পারাপার করতেন। রবীন্দ্র সেতু দায়িত্ব নিয়ে ঈশ্বরী পাটনীর মতো পারাপারের কাজটি সেরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে পৌঁছে দিত রবীন্দ্রনাথ ও তার সাহিত্য বিষয়ে পাঠ নিতে।তা, হলো কি,দশটা পাঁচটার বাঁধাধরা চাকরির জীবন না বেছে তিনি স্বাধীন ব্যবসাটাই পছন্দ করলেন। প্রাইভেট টিউশনের পাশাপাশি জমিয়ে ট্রাভেল এজেন্সীও চালাতেন। অসম্ভব ভালো পাবলিক রিলেশন দক্ষতার কারণে দুটি ক্ষেত্রেই সাফল্য অধরা থাকে নি।
বহুবার স্টুডেন্ট ও তাদের অভিভাবকদের নানা সমস্যায় স্যর ছিলেন সাক্ষাৎ মুশকিল আসান।বাবা-মার দাম্পত্য কলহে পড়ার ক্ষতি হচ্ছে , জানতে পেরে তাদের বাড়িতে ডেকে কথা বলতে বলতে বুঝতে পারলেন, তেমন কোনো গুরুতর সমস্যা নেই, সংসারে সময় দিতে পারেন না বলে অভিযোগ জমতে জমতে মাঝেমধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটে যায়। তারপর একপ্রস্ত কাউন্সেলিং, বুঝিয়ে সুঝিয়ে বছরে একবার সপরিবার আউটিং। সুনামের সঙ্গে বাড়তি লাভ, নিজের এজেন্সীর মাধ্যমে বুকিংটাও হয়ে গেল।জয় গুরু, বাবা ও ছেলে – দুজনেরই গুরু।
হঠাৎ একদিন ছুটির দুপুরে ভাতঘুম ভাঙিয়ে কানের কাছে – দূরভাষের সুরেলা ডাক।
– “থানা থেকে বলছি”
– “অ্যাঁ, সে কি? কি হয়েছে? ”
– “ছানা ডানা নাড়াতে পারছে না। কি করি বলুন তো!”
বিস্তর খাবি খেয়ে বহুকষ্টে শেষপর্যন্ত মর্মোদ্ধার করা গেল, স্টুডেন্টের বাবা থানার বড়বাবু, ছেলের পোষা পাখি ডানায় চোট পেয়ে কাবু। ছেলের কথায় স্যরকে ফোন করেছেন পরামর্শের জন্য। স্যরের কাছে এ তো তুশ্চু ব্যাপার, দিয়ে দিলেন ভেটেরিনারী ডাক্তারের সুলুকসন্ধান। দুদিনেই পাখি ডানা মেলে উড়ল, আর চারদিকে স্যরের জয়জয়কার।
কৈশোর আর তারুণ্যের সবুজ প্রাণেদের সঙ্গে ওঠাবসা, তাই সবার আগে তাদের মনটাকে পড়ে ফেলার বিশেষ দক্ষতা স্যরকে অন্যদের থেকে এগিয়ে দিয়েছে বেশ খানিকটা। এক ছাত্রীর মা ক্রমাগত বুঝিয়ে কাজ না হওয়ায় স্যরের শরণাপন্ন হলেন। ‌স্যর নিজেও নোটিশ করেছিলেন বিষয়টা, বিগত বেশ কিছুদিন মেয়ে আনমনা, ফোনে অত্যধিক আসক্তি। ছোট জায়গায় সব খবরই কানে এসে পৌঁছয়, তাই সমস্যার উৎস আন্দাজ করে নিলেন। কথা বলে বুঝলেন, ফেরানো কঠিন -” মন উড়েছে মেলে দিয়ে রঙিন পাখনা” , এদিকে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা , মোবাইলের সাহচর্যে শানু-র ( ‘শ’ র স্থানে ‘প’ পড়ুন ও প্রাপ্তবয়স্করা নিজ দায়িত্বে বুঝে নিন ) চক্করেও পড়েছে। পড়াশোনার আশা আর নেই, বিয়ে হলে যদি মন শান্ত হয় তবে ক্ষীণ ভরসা । প্রেমিকপুঙ্গবটিকেও চেনেন, অবশেষে দু বাড়ির অভিভাবককে ডেকে ঘটকালি অন্তে বিবাহ সুসম্পন্ন হলো। আশ্চর্যের ব্যাপার, সেই মেয়ে ভালভাবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে এখন গ্রাজুয়েশন করছে।
তবে ফাঁকির ঘরও ফাঁকা যায় নাে। এক ছাত্র মাসের পর মাস টাকা আর দেয় না, মাঝে মাঝে দু এক বার দিয়ে কাঁচুমাচু মুখে জানিয়েছিল যে বাবা দেখেন না ঠিকমতো, বাড়ি ফেরেন মাঝরাতে, আবার ভোরেই পগারপার। দেখা করাও তাই সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু সিক্সথ সেন্স বলছিল কোথাও একটা গন্ডগোল চলছে। একদিন জয় মা বলে রাত দেড়টায় পা বাড়ালেন ছাত্রর বাড়ির দিকে। একটু দূরে সেই পাড়া, রাতের টহলদার পুলিশ তেড়ে এলেন- “যাচ্ছেন কোথায়? ব্যাপারটা কি? ” যেই শুনলেন -“টাকা আদায় করতে” অবাক হলেও হেসে পথ ছেড়ে দিলেন। অতএব নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে একটানা কলিং বেল চেপে ধরে থাকায় শুধুমাত্র ছাত্রর বাড়ির লোক নয়, প্রতিবেশীদের উঁকিঝুঁকি ও কৌতূহলী চোখও জেগে উঠতে বাধ্য হলো। দরজা খুললেন স্বয়ং ছাত্রর বাবা।
” আপনি কি পাগল, মশাই? রাতদুপুরে ঘুম ভাঙিয়ে টাকা চাইতে এসেছেন! ”
” তা কি করব বলুন? আপনিও তো রাতদুপুরেই বাড়ি ফেরেন।”
“কি ই ই? কে বলেছে? আমি বলে সারাজীবন বিকেল চারটের মধ্যে বাড়ি ঢুকি । আর হাজিরার কড়াকড়ি হওয়ার পর এখন অবশ্য ছটা বেজে যায়। শত্তুরেও কোনো অপবাদ দিতে পারবে না, জানেন আপনি?”
( বলাবাহুল্য, ভদ্রলোক সরকারী কর্মচারী )
অতঃপর, ঘুমন্ত পুত্রের কানটি ধরে নিয়ে এসে উত্তমমধ্যম শুরু হলে স্যরকে আবার ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। তবে ভদ্রলোক অতি সজ্জন, ক্ষমা প্রার্থনা করে জোর করে আবার সব টাকা মিটিয়ে দিয়েছিলেন।
দীনদরিদ্র কিন্তু দাপুটে থেকে “মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছু দেখেননি” পার হয়ে আজকের টেকস্যাভি মাস্টারদের অনেকটা বদল ঘটে গেছে। তবু, স্টুডেন্টদের জন্য ভালো কিছ করার ইচ্ছাটুকু নিয়ে রয়ে গেছেন তারা, মাস্টারমশাইরা , সুধাবিষে মিশে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।