ছোটগল্পে স্বপন পাল

রাজ্যসরকার অধিগৃহীত একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা থেকে ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণ। প্রায় ছেচল্লিশ বছর সাহিত্যক্ষেত্রে যুক্ত। কবিতা ও গল্প রচনা করে থাকি। অন্যান্য বহু বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ অনুভব করি।

একটি ভাইরাস ঘটিত সমস্যা 

তাই বলে তুমি পালিয়ে যাবে ? ফোনে ফেটে পড়লো অদ্রিজা। চারদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সন্দীপ আর ওর পাঁচজন কলিগ খবর পেয়েছিল ফোনে। ওরা সবাই একই কোম্পানীতে কাজ করে, অদ্রিজাও। তফাৎ, ওরা কোম্পানীর দেওয়া একটা ভাড়া বাড়িতে মেস বানিয়ে থাকে, কুক আছে রান্না করে দেয়। নিজেরা পালা করে বাজার করে। আর অদ্রিজা থাকে ওর দাদা-বৌদির সাথে। দাদা চাকরী করে একটা বিদেশী কোম্পানীর সেলসে। মাঝে মধ্যে বাইরে ট্যুর থাকলে অদ্রিজা থাকায় বৌদিকে একা থাকতে হয় না। দাদা-বৌদি এখনও বাচ্চা নেওয়ার প্ল্যানিং করেনি, বাড়িতেই একটা বুটিক চালায় বৌদি। অদ্রিজারা যেখানে থাকে সেখান থেকে সন্দীপদের মেস স্কুটিতে যেতে আধঘন্টার মতো লাগে। করোনার কারণে সারা দেশ-দুনিয়া লকডাউনে। অফিস বন্ধ, কিছু কাজ ঘরে বসে হচ্ছিল, তবে ক্লায়েন্টমিট করা যাবেনা। কারো সাথে হয়তো ভিডিও কন্ফারেন্সিং করা হল, কিন্তু পার্টি যেখানে লোক-লস্কর নিয়ে সাইটে কাজ করবে সেটা তো বন্ধ। তাই পার্টি ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছে না। ফলে কোম্পানীর লোকসান যাচ্ছে এই অজুহাতে গত সপ্তাহে কোম্পানী সমস্ত কর্মীদের মেল করে জানিয়ে দিয়েছে যে, আপাতত  সবার মাইনে অর্ধেক করে দেওয়া হলো। মাথায় বাজ পড়ার মতোই ব্যাপার। যা মাইনে পেতো তাতে চলে যেতো ওদের। কিন্তু ফিফটি পারসেন্ট মাইনে, মাই গড, তাহলে তো বাড়ি থেকে টাকা এনে এখানে থাকতে হবে। অভিষেক লাফিয়ে ওঠে। বিতান, প্রীতম ওরা খরবটা পেয়ে বাড়িতে কথা বলেছিল, সবার বাবা-মা বলে দিয়েছে, বাড়ি চলে আয়। একমাত্র সন্দীপ ছেড়ে চলে যাবার পক্ষে নয়। যদিও ওর বাবাও চাইছেন সন্দীপ ফিরে আসুক কিন্তু সন্দীপের অন্য একটা দায়িত্ব তাকে দোটানায় রেখেছে। অদ্রিজার ওই ব্যাপারটা না হলে সন্দীপ এতোটা অপরাধবোধে ভুগতো না। কি যে ঘটে গিয়েছিল সেদিন। অদ্রিজার দাদা-বৌদি গিয়েছিল একটু দূরে এক বন্ধুর ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে। ফিরতে রাত হবে বলাই ছিল। এদিকে দাদা-বৌদি থাকবেনা বলেই অদ্রিজা সন্দীপকে জোর করলো তার সাথে তাদের ফ্ল্যাটে যেতে। যদিও তাদের মেলামেশায় অদ্রিজার দাদা-বৌদির কোন আপত্তি ছিলনা কখনই, আবার অন্যদিকে সন্দীপের বাবা-মাও চেয়েছেন ওদের বিয়ে দিয়ে সংসার গড়ে দিতে। অপেক্ষা শুধু সময়ের। সে রাতে কি যে হলো, বাইরে আচমকা তুমুল বৃষ্টি আর অদ্রিজার দাদার সেলারে থাকা ভাল হুইস্কি, নাকি অদ্রিজার মোমের মতো আঙুল আর নরম ঠোঁট কোনটা যে দায়ী সন্দীপ এখনও বুঝতে পারে না। সে রাতে এতটা লাগাম ছাড়া হওয়ার জন্য সে পরদিন বার বার অদ্রিজার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল, কিন্তু কি অদ্ভুত চোখে হেসেছিল অদ্রিজা, দেখে মনেই হয়নি গতরাতে এতবড় দুর্ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। সেদিন রাতে বৃষ্টি থেমে যাবার পর অদ্রিজা খুব শান্ত মেজাজে স্কুটিতে করে সন্দীপকে তার মেসের দরজায় নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। তার দিনকয়েক পরেই শুরু হয়ে গেল কোভিড-১৯ ভাইরাসের কারণে লকডাউন। মেসের ছেলেরা একটা বাস ঠিক করেছে। কোম্পানীর এক ক্লায়েন্টের জানাশোনা। কিন্তু মুশকিল হলো পুলিশের পারমিশান। প্রত্যেকের কোভিড-১৯ এর টেস্ট করাতে হবে। টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ হলে তবেই পাবে রাজ্য ছাড়ার অনুমতি। অগত্যা সবাই মিলে আবেদন করা হলো আর সেই আবেদনের ভিত্তিতে ওরা সবাই ভর্তি হলো হাসপাতালে। আরো দু’টো কোম্পানীর পনেরো জন জুটে গেলো খবর পেয়ে। সবাই ওরা বাড়ি ফিরতে চায়। চারদিন হাসপাতালে থাকা কম যন্ত্রণার নয়। সেই সাথে আছে হাসপাতালের বিল মেটানোর ধাক্কা। তারপর না বাড়ির পথে রওনা হওয়া। বাসের ভাড়াই পড়বে সব মিলিয়ে লাখতিনেক টাকা। এতসব করে প্রায় না খেয়ে বাড়ি পৌঁছানো। রাস্তায় দাঁড় করিয়ে পুলিশ চেকিংয়ের যন্ত্রণা সে তো আর এক এপিসোড। নিজে থেকে ফোন করেছিল সন্দীপ যখন হাসপাতালে টেস্ট করার জন্য ভর্তি হয়েছিল। অদ্রিজাও খবর নিচ্ছিলো। এদিকে হাসপাতালে সব সময় ফোন চার্জ দেওয়া যায় না। তারই মধ্যে বাড়ির মানুষগুলো থেকে থেকেই ফোন করছে। ফোনে না পেয়ে অদ্রিজা টেক্সট করলো সন্দীপকে। মেসেজে লিখলো, এক সপ্তাহ হয়ে গেল আমি  পিরিয়ড মিস করছি। ভাল লাগছে না। ব্যস এটুকুই। সন্দীপ বাসে উঠে একজনের থেকে পাওয়ার-ব্যাঙ্ক নিয়ে নিজের ফোনটা চালু করে তবে পড়তে পাড়লো সেই মেসেজ। মাথাটা ঘুরে গেল তার। এখন এই সময়ে তার চলে যাওয়া যে ঠিক হচ্ছেনা সেটা সে বুঝতে পারছিল খুব ভাল করেই। একবার গাঁইগুঁই করে ফেলেছিল কিন্তু কেউ তাকে গুরুত্বই দিলো না। মেসেজে অদ্রিজাকে লিখলো, ভাল করে পরীক্ষা  করাতে। আর সম্ভব হলে ডাক্তারের একটা পরামর্শ নিতে। ব্যস এইটুকুই, আর তাতেই ক্ষেপে গিয়ে অদ্রিজা ফোনের সুইচ অফ করে দিলো। অফ তো অফ, সারাটা পথ মারাত্মক উদ্বেগ নিয়ে রোদ গরম আর প্রায় কিছু না খেয়ে আড়াই দিন পর পৌঁছালো বাড়ি। স্ট্যান্ডে নিতে এসেছিল পাশের বাড়ির রায়কাকু, তিনি তো চিনতেই পারেননি প্রথমে। বাড়িতে পৌঁছে জামা-কাপড় কাচা, স্নান সারা, খাবার খাওয়া ও সবার সাথে কথা বলার পর সময় পেলো রাতের দিকে অদ্রিজাকে ফোন করার। এইদিকে ভাইরাসের সংক্রমণ নেই। তবু মানুষ লকডাউনের নিয়ম সাধ্যমতো মেনে চলছে। এখন তো চৌদ্দদিন তাকে ঘরবন্দী থাকতে হবে। যেহেতু সে বাইরের রাজ্য থেকে এসেছে। যদিও তার কাছে সেখানকার হাসপাতালের নেগেটিভ লেখা টেস্ট রিপোর্ট রয়েছে, তবু এটাই নিয়ম। ততক্ষণে মোবাইল পুরো চার্জ হয়ে গেছে। অদ্রিজার ফোন সুইচ অফ। কি জানি সন্দীপের নম্বরটা ব্লক করে দিলো নাকি ? বেগতিক দেখে অদ্রিজার বৌদিকেই ফোন করে বসলো সন্দীপ। বৌদি তো সন্দীপের পৌঁছানোর খবর, বাড়ির সবার খবর নিলো। অদ্রিজাকে ফোন দিতে বলায় অবাক হলো। অদ্রিজা বোধহয় বৌদিকে বলে থাকবে যে সে পরে ফোন করছে। বৌদি অন্তত সেই কথাই বললো। উৎকণ্ঠায় বিছানায় এপাশ ওপাশ করে যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখনই ফোনটা এলো। আর এলো বলে এলো। ঝড়ের প্রথম দমকের মতো, বড় বড় গাছ উপড়ে ফেলার মতো সন্দীপকে পরপর ঝাপটাতে লাগলো অদ্রিজার গলা। সন্দীপ কোনমতে বললো, বিশ্বাস করো আমি পালিয়ে আসিনি। উপায় ছিল না তাই এতগুলো ছেলেদের সাথে বাধ্য হয়েছি চলে আসতে। বাড়িরও প্রেশার ছিলো। ব্যস, আর যায় কোথা, বাড়ির প্রেশারের কথা বলতেই অদ্রিজা আবার ফাটলো। বাড়ি দেখাচ্ছো ? আমি প্রেগন্যান্ট কনফার্মড। টেস্ট কিট দিয়ে টেস্ট করে দেখেছি। এখনো কাউকে বলতে পারিনি। ভেবে দেখেছো, কি হবে সবাই জানলে ? সন্দীপ মিন মিন করে বললো, কি আবার হবে, আমি তো অস্বীকার করিনি বা পালিয়ে যাইনি। আমি ফিরে গিয়ে বা তোমাকে এখানে এনে বিয়ে করবো। বিয়ে যে হবে সে তো তোমার বাড়ির, আমার বাড়ির সবাই জানে, এখানে ফেরার পর বাবা-মা তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছে। বিয়ের কথাও বলছিলো। তবে ওই চাকরীটা বোধহয় গেলো। আবার একটা চাকরী খুঁজতে হবে। অদ্রিজা একটু বুঝি নরম হয়েছে, বললো, এই লকডাউনের পর চাকরী কোথায় পাবে ? দেশের অর্থনীতির অবস্থা দেখছো না ? আর তুমি একটা ভাল চাকরী জোগাড় করে যখন বিয়ে করতে আসবে ততদিনে আমাদের বাচ্চাটা না বড় হয়ে যায়। বাচ্চা কোলে বিয়ে করবো নাকি ? সামনের সপ্তাহে যদি এয়ারলাইন খুলে যায় তো চলে আসবে, আমি ম্যারেজ রেজিস্ট্রার বলে রাখবো। আমার এক বান্ধবীর বর। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। শুধু তুমি তোমার বাবা-মা আর যাদের বলতে হয় বলে ফেলো। দেরী কোরো না। আমি একদম অপেক্ষা করতে পারবো না। কিছুটা হলেও সমাধানের রাস্তা পাওয়া গেল ভেবেই সন্দীপের মন একটু হাল্কা হলো। এখন বাকী থাকলো বাবা-মাকে এই বাজারে কি করে রাজী করানো যায় রেজিস্ট্রি বিয়েতে। সম্ভব করতেই হবে। না হলে যা মেজাজ অদ্রিজার কি করে বসবে তার ঠিক কি ? আরও একটা বড় সমস্যা চাকরী। যদিও তারা কেউই চাকরী ছেড়ে আসেনি, কিন্তু কোম্পানী শেষ পর্যন্ত কি বলবে সে তো জানা নেই। আর যদি চাকরী থাকেও সেটা করা কতখানি সম্মানের হবে কে জানে ? চাকরী আর বাবা-মা এই দু’টো বিষয় মাথায় পাক খেতে খেতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে সন্দীপ। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখলো, তার বিয়ে হচ্ছে। পিঁড়িতে বসিয়ে মালা-বদল হবে, অবাক হয়ে সন্দীপ দেখে অদ্রিজার কোলে ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ে, মালাটা কিছুতেই অদ্রিজার গলায় পরাতে দেবে না সে। এদিকে দাঁড়িয়ে আছে সন্দীপের বাবা আর সন্দীপের কোম্পানীর বস মালিয়া স্যার। ঘুম ভেঙ্গে গেল, মোবাইলে দেখলো সকাল আটটা। এতক্ষণ ঘুম বাবা পছন্দ করেননা। হয়তো এতদূর থেকে আসার ধকল বুঝে আর ডাকাডাকি করেননি। কিন্তু সন্দীপকে উঠতে হবে। বাবাকে মাকে বিয়ের ব্যাপারটা বোঝাতে হবে। মা-বাবা কি খুব শক্ড হবে ? ওঁরা কি নির্লজ্জ ভাববে তাকে ? উপায় নেই। অদ্রিজারও তো একই সমস্যা।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।