ছোটগল্পে সায়ন পালিত

স্বপ্ন ?

কলকাতা শহরে নিজের একটা ফ্ল্যাট বাড়ি কেনাটা বড়ো ঝক্কির ব্যাপার।গত পনেরো বছর ধরে আমরা হাতিবাগানে একটি দ্বিতল বাড়িতে ভাড়া থাকি।বাড়িটি হলো সুধীন মুখার্জীর।এলাকার বেশ গণ্য-মান্য ব্যক্তি।তবে কয়েক বছর ধরে তার বাড়ি থেকে আমাদের উঠিয়ে দিতে চাইছেন।
একদিন বাবাকে ডেকে বললেন,” বলছি আমিত বাবু অনেকদিন তো হলো এবার কিছু একটা ব্যবস্থা করুন।তা না হলে তো আমাকে ব্যবস্থা করতে হবে।”
বাবা কিছুক্ষন ভেবে বলল ” হ্যাঁ দাদা একটু সময় দিন আমি একটা ভাড়াবাড়ি খুঁজছি ।পেলেই ছেড়ে দেব।”
সুধীন বাবু একটু তীক্ষ সুরে বললেন ” তা দাদা আর কত সময় দেব এই করে তো পনেরটা বছর কাটিয়ে ফেললেন , সারা জীবীনটাই কি এখানে কাটানোর কথা ভাবছেন।”
বাবা মাথাটা নামিয়ে বলল,” আপনি তো সবটাই জানেন দাদা আমার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না।আমাকে কটা মাস সময় দিন আমরা চলে যাব।”
মা চায়ের কাপটা নিয়ে ঘরের ভিতরে এলেন,”দাদা চা টা।”
“আবার এসবের কি দরকার ছিল !” হাসতে হাসতে সুধীন বাবু চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিলেন।বেশ কিছুক্ষণ অলস ভাবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,”আচ্ছা কটা মাস সময় দিলাম।”
কাপটা রেখে তিনি ধীরে সুস্থে চলে গেলেন।বাবা মা দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে স্থির ভাবে বসে রইল । ভিতর ভিতর যেন একটা ঝড় বয়ে চলেছে কিন্তু কেউ কোনো কথা বললো না।
মাস দুয়েকের মধ্যেই জোড়া বাগানের ভিতরে একটা বাড়ির সন্ধান পেয়েছি।পরিবেশ ভালোই আর ভাড়াও খুব একটা বেশি নয় তাই বাবা ঠিক করলেন সেইখানেই আমরা যাব।তবে আমার এখনও সেই বাড়ি দেখা হয়নি।কারণ বেশ কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন কোম্পানিতে দৌড়াচ্ছি একটা চাকরি পাওয়ার জন্য।কোনোদিনই
পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিলাম না।তাই কোনো রকমে বিএ পাস করেছি।আজকালের বাজারে বিএ পাসের কোনো মূল্য নেই।তাই চাকরি এখনো পাইনি।
আমাদের নতুন ভাড়াবাড়িটার এডভান্স-এর টাকা জমা দেওয়ার লাস্ট ডেট পরশু।তাই বাবা মা গ্রামের বাড়িতে। সেখানে ব্যাঙ্কে কিছু টাকা জমানো আছে সেটাই তুলতে হবে।আমাদের প্রায় সমস্ত সঞ্চয় এই ভাড়াবাড়িটার জন্য শেষ হতে চলেছে।
আজ ১টা নাগাদ সেক্টর ফাইভের একটা অফিসে ইন্টারভিউ আছে।কোনো আশা নেই তাই মনে মনে ঠিক করলাম একটু দেরি করেই যাব। মা মাসিকে ফোনে বলছে শুনলাম, ” হ্যালো প্রীতি আজ একটু আমাদের বাড়িতে আসতে পারবি? ছেলেটার আজ ইন্টারভিউ আছে আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি তুই একটু রান্নাটা করে দিবি? ছেলেটা তাহলে কিছু খেয়ে যেতে পারে।আর বাবা মাকেও সঙ্গে নিয়ে আসিস।অনেকদিন দেখা হয়নি।”
কথা শুনে মনে হলো তারা কিছুক্ষনের মধ্যেই আসছে।বাবা-মা সাতটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।আমি একভাবে বিছানায় শুয়ে রইলাম।হঠাৎ আকাশটা অন্ধকার হয়ে এলো ।বাইরের শোঁ শোঁ শব্দে বুঝলাম ঝড় শুরু হয়েছে।প্রায় ১১টা নাগাদ দরজায় কড়া পড়লো।বুঝতে অসুবিধা হল না যে মাসিরা এসে গেছে। তবে একটু দেরি করে ফেলেছে।তাড়াতাড়ি দরজাটা গিয়ে খুললাম ।আমার অনুমান বিফলে গেল না,মাসি দিদিমা আর দাদু এসে হাজির।ভিতরে এসে সোফাতে বসে মাসি বলল ,”হঠাৎ ঝড় চলে এলো না হলে আমরা ১০টার মধ্যেই চলে আসতাম।”
একটু বিরক্ত হয়েই বললাম,”আচ্ছা আচ্ছা থাক।”
দিদিমা একটা মিষ্টির প্যাকেট এগিয়ে বললো “এটা টেবিলে রেখে দে।তোর বাবা কিছু বাজার করে রেখেছে নাকি দাদুকে পাঠাব।”
টেবিলের ওপর প্যাকেটটা রেখে বললাম, “কি জানি ।দেখ রান্নাঘরে সব রাখা আছে মনে হয়।”
মাসি রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখে বললাম ,”অনেক দেরি হয়ে গেছে তোমরা খেয়ে নিও আমি এসে খাবো।”
দিদিমা বকে ওঠে,” বাবু! শুভ কাজে যাচ্ছিস একটু হলেও ভাত খেয়ে যা।” মাসি সায় দিয়ে বলল ,”মা ঠিকই বলেছে,একটু ভাত খেয়ে যা।”মনে মনে ভাবলাম,”সে যে কি ইন্টারভিউ হবে তা আমার জানা আছে।”
কোনোরকমে দুটো রুটি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বাসে উঠে হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ছোট কাঁটাটা ১২ টা ছুঁই ছুঁই।আজ রাস্তাটা যেন অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা।মনে মনে ভাবলাম আবহাওয়ার উন্মত্ততার জন্য বোধহয়।বেশিক্ষন সময় লাগলো না পৌঁছতে।দশতলা অফিস প্রায় পুরোটাই কাঁচ দিয়ে ঢাকা।দেখে হলো কোনো একটা বৃহৎ রাক্ষস আকাশটাকে গিলে খেয়েছে । অফিসে ঢুকে অবাক কারণ এত বড় অফিস কিন্তু মানুষ প্রায় নেই বললেই চলে আর এপ্লিকেন্ট আমাকে নিয়ে ৫ জন।আমার ডাক পড়লো।প্রায় ১ ঘন্টা চললো ইন্টারভিউ পর্ব।বেরিয়ে মনে হলো এই বার বোধহয় চাকরিটা হয়ে যাবে।
মনটা ভালো নেই তাই অফিস থেকে বেরিয়ে ঠিক করলাম আহিরীটোলা ঘাটে যাব।বাস থেকে নেমে একটা সিগারেটের প্যাকেট কিনে বসলাম ঘাটের একটা সিঁড়িতে।একটা মিষ্টি পারফিউমের গন্ধ নাকে এল।গন্ধটা খুব চেনা চেনা।ঘুরে দেখি আমরা থেকে কিছুটা দূরে বসে আছে আমরাই এক চেনা মুখ। দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।উঠে এসে বসলো পাশে।কিছুক্ষন চুপচাপই বসে রইলাম।প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,”কেমন আছিস?”
দীর্ঘ নিঃশাস ফেলে বলল ,”ভালো,তুই ?”
উত্তর দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও গলা থেকে স্বর বেরোলো না।আবার কিছুটা নিস্তব্ধতা।
মুখের ওপর পরে থাকা চুলগুলোকে আলতো ভাবে সরিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,” তারপর কি করছিস এখন? লেখালিখি এখনো করিস নাকি সেটার পাঠ চুকিয়েছিস।”
বললাম ,”একটা চাকরি খুঁজছি।”লেখালিখির কথা আর কিছু বললাম না।
প্রায় তিন বছর পর দেখা।অনেক কিছু বলার ছিল।বৃষ্টির পর যেভাবে পাতায় জল জমে থাকে ঠিক সেই ভাবে জমেছিল অনেক অভিমান।কিন্তু বুঝলাম পাশে বসে থাকা মানুষটা লক্ষ যোজন দূরে চলে গেছে।মাঝে অনেক দুরত্ব তাই আর কিছু বললাম না।
হঠাৎ আধ পোড়া সিগারেটটা হাত থেকে একরকম ভাবে ছিনিয়ে নিলো।”এখনও ছাড়তে পারলি না।”
মৃদুহেঁসে বলল,”তুই পেরেছিস?” কথাটা যে কি কারণে বলল সেটা বেশ টের পেলাম।ছাই ফেলে জিজ্ঞাসা করলো ,”এত দুপুরে এখানে?”
আমি বললাম,”একটা ইন্টারভিউ ছিল।আশা করি এবার চাকরিটা পাবো।অনেকদিন ধরেই মনটা ভালো নেই।তাই আর কি।তুই?”আমার কথা শুনতে শুনতে দেখলাম একভাবে ওই পাড়ের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছে।আমার কথাগুলো বোধহয় কানেই গেল না।
“তুই এখনো বললি না তুই এখন এখানে..” আমার কথা শেষ হতে না হতেই গম্ভীর ভাবে বলল,”এমনি।”
সিগারেটটা শেষ করে হঠাৎ চোখের কোনে অজস্র কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,”সময়টা মিস করিস?” অনেক কথা মনে পড়লো কিন্তু নিজেকে সংযম করে বললাম ,”না! কেন মনে পড়বে?ভুলে বেশ আছি!”আর কিছু বললাম না হয়তো বলতে চাইনি।
ঘড়িতে তখন প্রায় তিনটে বাজতে যায়।অল্প অল্প বৃষ্টি শুরু হয়েছে ,আমরা অল্প ভিজেও গেছি। একটা ছাতায় দুজনে কোন রকমে এলাম আহিরীটোলা মোড় অবদি।আমি যাব হাতি বাগান আর ও যাবে উল্টোদিকে।যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করলাম,”তোর বিয়েটা যেন কবে?”
ফিরে তাকালো কিন্তু কিছু বলল না শুধু মৃদুহেঁসে চলে গেল।এই প্রথম হয়তো বুঝলাম ওর নিস্তব্ধতার কারণ।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে তিনটে বেজে গেল।বাড়ি ঢুকে দেখি মাসি আর দিদিমা সোফাতে বসে টিভি দেখছিল আর দাদু পেপারটা নেড়ে ঘেঁটে দেখছে।আমাকে দেখে মাসি জিজ্ঞাসা করলো,”কেমন হলো?”বললাম ,”ওই যেমন হয়।” অনুভব করলাম মনটা বেশ ভারী হয়েছে। আর কথা না বাড়িয়ে খেয়ে উঠে পড়লাম।বাইরে মুসলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।বেশ ঘুম ঘুম পাচ্ছে তাই চাদরটা চাপা দিয়ে বিছানার এককোনে শুয়ে পড়লাম।ঘুমটা যেই চোখে এসেছে।হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গা হাত পা শিউরে উঠল।মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে,চোখের সামনে সব কিছু যেন অন্ধকার হয়ে গেল।বুকের ওপরে যেন কিছু একটা চেপে বসেছে।মনে মনে বললাম একিছুতেই সত্যি হতে পারে না।কারণ যারা আমার পাশে বসে আছে তারা কেউই আর বেঁচে নেই।আমার মাসি দিদিমা দাদু আজ প্রায় ১৫ বছর হতে চলল মারা গেছেন। তাহলে এঁরা কারা।ভাবতে ভাবতে আমার রক্ত জল হয়ে এসেছে।গলা শুকিয়ে গেছে।”জল একটু জল”
হঠাৎ মায়ের ফোনটা বেজে উঠতে ঘুমটা ভেঙে গেল।হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।বুঝলাম বাজে স্বপ্ন ছিল আর কিছু না।গলাটা শুকিয়ে গেছে তাই উঠে বসে জলের গ্লাসটা হাতে নিয়ে শুনলাম মা ফোনটা ধরে বলছে,”হ্যালো প্রীতি আজ একটু আমাদের বাড়িতে আসতে পারবি?”…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।