“নীল সুনীলে দিন যাপন” গল্পে স্বাতীর আলোয় শুভঙ্কর পাল
by
TechTouchTalk Admin
·
Published
· Updated
হাঁসুয়া ও চাঁদের গল্প
বাঁশঝার থেকে ঝিঁ ঝিঁ পোকা বিরামহীন ডেকে চলেছে । সারাদিনের শেষে সন্ধ্যায় একটু বৃষ্টি ধরে আসে । আশঙ্কা তবুও কাটে নাই । এসময় নদীর ভরা যৌবন । নদীরা বছরে অন্তত একবার পোয়াতি হয় । তবে নদীর এই ডাকের গরজ দেখে মনে হচ্ছে ওই মাটি চাপা দেয়া বাঁধ আজ রাতে ভারী বৃষ্টি হলে টেকা দায় । খগেন এসে বড়ো বাড়িতে খবর দিয়ে যায় , বাবু লদির গতিক ভালো লয় । বাঁধ ভাঙিলে হামারগুলাক মাটির ঘর সব ভাসিয়ে লিয়ে যাবেক । ঘুণ পোকায় খাইয়ে লিয়েছে বটে বাঁশের খুটিটো । দমকা দিলেই সব নদীর জলে ভাসান হয়ে যাবে ।
খগেন তু হামার জমিন দেখভাল করিস । তুহার বউ বেটিক হামার ঘরে লিয়ে আয় । হামি আছি , তু চিন্তা লা করবে । নদীর মতোই ওর বউ এর ভরা যৌবন । কালো শুধু ওর গায়ের রঙ । গতরের নিটোল সুঠাম গড়ন যে নারী মাংস লোলুপ পঞ্চাশোর্ধ বাবুর শরীরে বহুবার জ্বালা ধরিয়েছে এ কথা খগেন কখনো কল্পনাও করতে পারে না ।
বাবুর আশ্বাসে আহ্লাদে আটখানা হয়ে লাচিতে লাচিতে খগেন ঘরে যায় । বেটিকে কোলে লিয়ে বউকে তাড়া দেয় , এ ফুলু ঘরের জামা কাপড় আওর দু চার টাকা যা আছে ওসব বোঁচকা বাঁধি লে । বাবু হামার বহুত ভালো মানসি আছে । ওয়ার ঘরের বাইরে একঠো পাকা ঘরে হামার থাকার ব্যবস্থাটু হইছে । কথা শুনে ফুলু মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায় । সে বহুবার ওই মনিবের কুনজর লক্ষ্য করেছে । বাবুর চোখ গিলান যেনো ওয়ার শরীরটো গিলিয়া খাবার চায় । ফুলু কিছুতেই রাজি হয় না । খগেন অনেক বলেও রাজি করাতে না পেরে ফুলুকে রেখেই বেটিকে নিয়ে মনিবের বাড়ি চলে যায় । আর ভাবে , ফুলু একটুবাদেই চলে আসবে ।
খগেন এলেই বাবু কাজের মাসিকে বলে খগেনের বেটিকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে বলে । এ খগেন , তুহার ফুলু আসেক লাই ।
আর বলিস লা বাবু ওতো এইসান কহিছে , কী ও অসিবেক লাই । হাতের পানপাত্রটা খগেনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে , তু চিন্তা লা করিস , একটু গোঁসা থামিলেই চলিয়া আসিবেক । লে ইয়ে ফরেন মদিরা পি লে । বাবু , হামার তুহার সামনে পিনে সে বহুত সরম লাগে । ছোর ইয়ে সরম , হাম তুহার ঘরে কিতনে বার হাড়িয়া পিঁয়া , তু ভি পিঁ তব । পিঁ লে মু ফিরকে । খগেন গলার গামছাটা দিয়ে আড়াল করে ঝটপট গলায় ঢেলে দেয় ।
আহা ! বড্ড তেজী আছে বাবু , কারেন্ট লাগ গায়া । অওর থোরাসা …
হা হা এ পুরা বোতল তু পিঁ লে হামি দুসরা মাঙাবে ।খগেন বোতলটা হামলে নিয়ে ঘাটাঘট জল না মিশিয়ে খেতে শুরু করে ।
এ থোরা তো সামালকে পিঁ । পানি তো মিলা লে ।
লা বাবুয়া , এ তেজী আছে । থোরা দিমাক লা ঘুরাইলে পিঁ কে মজা নেহি আবে । পুরো বোতল শেষ করে একসময় বেহুশ হয়ে মেঝের উপরই ঘুমিয়ে পড়ে সে ।
ঘড়িতে তখন এগারোটা বেজে গেছে । বাইরে জোর বৃষ্টি । প্ল্যান উৎরে গেছে । বাবু খুশিতে ডগমগ হয়ে ধুতির কাঁচা তুলে ছাতা নিয়ে কাদা জল পেরিয়েই খগেনের বাড়ির দিকে রওনা দেয় । দরজায় এসে টোকা দেয় ।
ফুলু ঘর থেকেই বলে ওঠে – হামি জানে তু হামার ঘরে ফিরি আসিবি ও বাবুর লজরটু ভালো লয় , এ কথাটু তু বুঝিস লা ক্যানে । দরজাটু খোলা আছে , আ কে বেটিক খাটিয়া পে শুলা দে । অর তু জমিন পে মেরে পাস আকে শো যা । বাবু ঘরে ঢুকে দরজা এঁটে , মাটির পাতা মাদুরে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ে । ফুলুও আজ রাগে একটু বেশি হাড়িয়া খেয়ে নিয়েছিল । কিন্তু বাবু তার গতরে স্পর্শ করতেই সে লাফিয়ে ওঠে বুকের কাপড় সামলে নেয় । তু , তো হামার মরদ লয় । এদিকে বৃষ্টি আরো ঝুমঝুমিয়ে শুরু হয় । বৃষ্টির এমন অঝোর শব্দে কেউ ফুলুর ডাক শুনতে পায়না । এক রাখুসে ক্ষুধার কাছে ফুলু কিছুতেই হার মানে না । ঘরের হাঁসুয়াটা নিয়েই সজোরে এক কোপে বাবুর মাথাটা ফালা করে দেয় । রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে । দু বার একটু শরীরটা কেঁপে ওঠেই বাবুর নিথর দেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে । ফুলু পাথর হয়ে যায় । হাঁসুয়াটা হাতে নিয়েই মেঝেতে বসে থাকে । একটু বাদে বৃষ্টি ধরে এলে মেঘের আড়াল থেকে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ফুলুর নিটোল বুক আলো করে তোলে ।