প্রাককথন
কত ইতিহাস আমাদের শহর কলকাতাকে ঘিরে। দু’শ বছরের ব্রিটিশ রাজ এক বিশেষ সময়ের জন্ম দিয়ে গেছে। যে সময়ে শোষণ আর শাসন সমানভাবে বিরাজমান। কলকাতা শহরের কথাই কেন বলছি? কারণ অষ্টাদশ শতক থেকে বিশ শতক অবধি কলকাতা ছিল ব্রিটিশ রাজধানী। তার বুকে ব্রিটিশ এঁকে দিয়ে গেছে তাদের অস্তিত্ব।ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শেষে পর সে সমস্ত অস্তিত্ব কতক বা রয়ে গেল কতক বা উধাও হল স্বাধীনতার দাপটে। তবু বিলীন হয়েও কি সব কিছু বিলীন হয়? এই যেমন ধরুন না কেন আজকের পার্ক স্ট্রীট, বড়দিনে কেমন ঝলমল করে। আলোকজ্জ্বল এই স্ট্রীট কিন্তু ব্রিটিশ আমলে এমন ঝলমলে ছিল না! রাস্তাটি ছিল আলো আঁধারি, নাম ছিল ‘গোরস্হান কা রাস্তা’! রাস্তার আশপাশ ছিল আরো রহস্যময়! কি ভাবছেন? কোন মিল নেই? না নামের !না পরিবেশের! ঠিক তাই!তখন এই রাস্তার শেষে সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি তো এখন “হন্টেড” বলেই চিহ্নীত! তবে যে গল্প শুরু করতে চলেছি তা সাউথ পার্ক সিমেট্রি নিয়ে নয়। তবে কি নিয়ে? অনেক ভণিতা হল, পরের পর্বে আসছি সেই ঘটনা নিয়ে!
১
“যাবেন নাকি? ”
এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রায়’ই আসে রণ। যাদবপুর বিশ্ব’বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। তাই সেমিনারে প্রায়ই আসতে হয় তাকে। আজো এসেছিল। তবে সত্যি বলতে পার্ক স্ট্রীট দেখার লোভ তার বহুদিনের, দেখা হয়ে ওঠেনি। তমলুক থেকে কলকাতা পড়তে এসেছে সে দু বছর হল। কলকাতা তার ভালো লাগে। পার্ক স্ট্রীট যে এক “ওয়ান্ডারল্যান্ড” তা সে শুনেছে, দেখেছে টি. ভি তে কখনো কখনো। বড়দিনে মানুষ ভিড় করে এখানে চারিদিক আলোকজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাই কেন জানিনা দেখার লোভ সামলাতে পারে না সে।
আজো এসেছিল সে এশিয়াটিক সোসাইটি একটা সেমিনারে। এই বিল্ডিংটা এলেই মনে হয় সে যেন আর এক জগতে এসেছে।। ঘুরে ঘুরে সিড়ি নেমে গেছে নিচে। আর উচু উচু পিলার- সিলিং সব’ই কেমন সেকেলে। এমনকি সেমিনার হলটার উচু কাঠের স্টেজ,উচু ছাদ সব মিলিয়ে আধুনিক বাইরের পরিবেশের সাথে ভিতরের বিল্ডিংটার মিল নেই একটুও। লম্বা লম্বা কড়িডোরগুলো আর ফুরোয় না। এমন বিল্ডিং আজকালকার সদ্য গজিয়ে ওঠা হাল ফ্যাশনের অফিসগুলোর থেকে আলাদা। এক্কেবারে আলাদা। ঐতিহ্য আর আধুনিকতা এখানে দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে। কেন জানিনা রণর মনে হয়, পাক স্ট্রীটে এশিয়াটিক সোসাইটি না হলেও পারত। রাইটার্স বিল্ডিং এর পাশে হলেই বা কি মন্দ হত। এসব ভাবতে ভাবতে প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে নামছিল সে।
“কি রে হোস্টেল যাবি তো? ” চমকে ফিরল রণ! এমনটা হয় অনেক সময়, এক মনে একলা হেটে যাওয়া কেউ চিন্তা মগ্ন থাকলে আর ধুমকেতুর মত পিছন থেকে কেউ এসে এমন ধাক্কা মারলে চমকে উঠতে হয় বৈকি।
হঠাৎ এমন ভাবে রাহুলকে আশা করেনি সে। বিকেল চারটে বাজে। আজ সময় অনেকটা আর একা ঘুরবে বলেই মনস্থির করেছে রণ। মুখে খুব সংক্ষেপে বলল ” নারে কাজ আছে। তুই যা…! ”
রাহুল একটু সন্দেহের চোখেই বলল “কি রে প্রেম করছিস নাকি!?চল চল আমিও আলাপ করি। ডাক অলি পাবে। ”
বিরক্ত লাগছিল রণর। বিরক্তি নিয়েই বলল ” বললাম যে কাজ আছে। ”
কথা বলতে বলতে তারা মেন রোডে এসে দাঁড়িয়েছে। রাহুল আর ঘাটালো না। নিজের মত এগিয়ে গেল । রণ একটা শ্বাস ফেলল ছোট। আশা করা যায় এখন সে একলা সময় কাটাবে কিছুক্ষণ।
এগোতেই যাবে ডান দিক ধরে, হঠাৎ কেউ একটা পেছন থেকে ডাকল “যাবেন নাকি সাহেব? ”
গলার স্বরটা কেমন কর্কশ, রুক্ষ। পিছনে না ফিরেও রণ বুঝতে পারছে , ব্যক্তিটি খুব সুশ্রী নয়। সে শুনেও না শোনার ভান করে এগোচ্ছিল সামনের দিকে। আবার সেই ডাক ” যাবেন সাহেব…. চলেন। আমিও ওদিকেই যাবো।”
এবারে ঘুরতেই হল রণ’কে। সে কোন দিকে যাবে কি করে জানল পিছনের ব্যক্তি?ঘুরেই আশ্চর্য হয়ে গেল সে। বাস ,ট্রাম, ট্যাক্সি, মেট্রো চড়া শহরে এ কোন অদ্ভুত জীব? ইতিহাসের ছাত্র রণ , না হলেও বলে দিতে হয়না একে টোঙ্গা বলে কিংবা জুড়ি গাড়ি।। ঘোড়ার গাড়ি সে দেখেছে। কিন্তু এমন দরজা আটা , মাথার ওপর ছাউনি দাওয়া গাড়ি এখনকার দিনে বিরল।
তার চেয়েও অদ্ভুত যে পিছু ডাকল, সেই ব্যক্তি। মাথায় পাগড়ি বাঁধা , গায়ে সাদা শার্ট তাও আবার ট্রাউসারে গোজা, হাতা আটকানো,গলাও বন্ধ।চেহারা দেখে মনে হয় সাদা কালো চলচ্চিত্র জগতের চরিত্র কোন।সব কিছুর মধ্যে শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে। টানটান মধ্যবয়েসী চেহারা হলেও মুখ খানা ক্ষতবিক্ষত। পক্সের দাগে ভরতি। চোখ দুটো কুতকুতে, সুরমা লাগানো। এত ভাষা হীন চাহনি, গা টা কেমন করে উঠল রণর। গাড়ি আর ব্যক্তি উভয়কেই মনে হয় কেউ আর এক জগত থেকে তুলে এনেছে এখানে। বিকেলের দিকে নরম রোদের আলোয় রণর চারিদিকে ব্যস্ত’তা আর কোলাহল আর তার ঠিক সামনেই মানে মুখোমুখি থমকে থাকা এক সময়।
সে ঘোর কাটিয়ে বলল ” কোথায় যাবে…. ? ”
লোকটা তার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে শুধু হাত সামনের দিকে দেখিয়ে বলল “এই তো সামনেই যতটা যেতে পারি। ” বলেই রহস্য করে হাসল।
আশ্চর্য। গন্তব্য’হীন রণ আজ। গন্তব্য’হীন এই লোকটাও। ভালোই হবে, অন্য রকম অভিজ্ঞ’তা।
চোখে চোখ রেখে লোকটা আবার কর্কশ স্বর’এ বলল ” চলেন সাহেব! উঠে বসেন!
২
“আর ইউ নিউ হিয়ার? ”
দরজা ঠেলে ঢুকতেই একটু রণ অদ্ভুত বিমর্ষ হয়ে পড়ল। সে একা নেই। একজন মহিলা বসে। বেশভূষা ভারি রকমের অদ্ভুত। মনে হয় বিদেশিনী। চুল টপ নট করে বাঁধা। একটু লালচে বলেই মনে হল। এলিযাবেথ আমলের কালো গাউন। হাতে গ্লাভস। গায়ের রঙ বোঝা যাচ্ছে না একদম।কেমন অন্ধ’কার চারিদিক। তার’ই মাঝে পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে ছোট ছোট জানালা দিয়ে।মহিলা উল বুনে যাচ্ছে। রণর দিকে তাকানোর প্র’য়োজন মনে করছে না। রণর কেমন দম বন্ধ লাগছে গাড়ির মধ্যে। একরকম মাথা ঘোরাচ্ছে তার। বাইরের দিকে তাকালো সে।