গল্পেরা জোনাকি তে স্মার্ত পরিয়াল (ধারাবাহিক)

আই ফিল দ্য এন্ডিং, বিফোর ইট ইভেন স্টার্টস
১|
‘বাকি রইলাম শুধু আমি আর তুই’ বলল অংশুমান।
‘কী বলছিস?মানে চয়নও?’ বললাম আমি।
‘হ্যাঁ,যেমন বলেছিলিস ঠিক তেমনভাবেই মারা গেছে।’
‘হা ঈশ্বর। একটা কথা বল,দোষটা কি শুধু আমারই?মানে আমিই এসব স্বপ্ন দেখছি বলেই কি?’
‘জানি না। তবে স্বপ্ন দেখা বন্ধ হলে হয়তো আমিও বেঁচে থাকব।’
‘সেটা কীকরে সম্ভব?মানে স্বপ্ন দেখা কীকরে বন্ধ করব?এটা তো আমার হাতে নেই।’
‘তোর হাতে না থাকুক,আমার হাতে আছে।’
‘তার মানে?’
এরপর অংশুমান একটা ধারালো ছুড়ি বার করল।তার চোখে আগুন জ্বলছে। মনে হচ্ছে এবার ও আমাকে মারতে চলেছে….
এক সপ্তাহ আগে…
গল্পটা শুরু থেকেই বলি। আমি অনিন্দ্য। দুই সপ্তাহ আগে কলেজের বন্ধুরা মিলে একটা রিইউনিয়ন করি। প্রায় ছয় বছর পর সবাই একসাথে, এক শহরে। পুরনো গল্প, আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া সবই হচ্ছিল। কিন্তু আমার মাথা ছিল অন্যদিকে। কিছুই না, একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছিলাম সেদিন সকালে। বেশি কথা বলছিলাম না। হাসি,ঠাট্টা,ইয়ার্কিগুলো যেন কানেই ঢুকছিল না আমার।
‘…..অনিন্দ্য…এই অনিন্দ্য’ বলল কৃষ্ণা।
থতমত খেয়ে উত্তর দিলাম,’হ্যাঁ,বল রে।’
‘আজ তোর এমন অবস্থা কেন?এতদিন পর সবাই একসাথে,তুই এমন মনমরা কেন?’
কৃষ্ণা। আমার এক্স। কলেজে চুটিয়ে প্রেম করেছিলাম আমরা। লাস্ট ইয়ারেই আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়। সেসব এই গল্পে অপ্রয়োজনীয়। বন্ধুত্বটা টিকে গেছিল শুধু। আর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগটাও। কৃষ্ণা অত্যন্ত স্মার্ট,পড়াশোনায় ভালো ছিল,তবে শর্ট টেম্পার।
আমি বললাম,’কিছুই না।’
রীতেশ বলল,’কিছুই না বললেই হল?তখন থেকে দেখছি কী আকাশ পাতাল ভাবছিস।’
রীতেশ। বড়লোক বাপের ছেলে। আমার সাথে কোনোদিন সেরকম কথা হতো না।ওই ওপর ওপর যেটুকু হয়। টাকার অহংকার ছিল বরাবরই। যাই হোক। এই কথাটা আমাকে একটু খোঁচা মেরেই জিজ্ঞেস করল। আমি তেমন পাত্তা না দিয়ে শুধু মাথা নাড়ালাম।
চয়ন এবার একটু ইয়ার্কি মেরে বলল,’আমার মনে হচ্ছে অনিন্দ্য প্রেমে পড়েছে।’
আমি এবার একটু নড়েচড়ে বসলাম,বললাম,’আরে না। আসলে একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছিলাম আজ সকালে।’
এতক্ষণে অংশুমান আশ্বাস দেওয়ার সুরে বলল,’এতে এতো ভাবার কী আছে?স্বপ্নই তো। বল তো কী দেখেছিস!’
অংশুমান। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। কলেজেই আলাপ। আমি বরাবরই introvert টাইপের ছিলাম। অংশুমান আবার আমার উল্টো। কীকরে আমার সাথে ওর জমে গেল কে জানে! প্রথম সিগারেট,নেশা,ক্লাস বাঙ্ক মেরে সিনেমা দেখতে যাওয়া সব ওর সাথেই। বলতে গেলে আমার পার্টনার ইন ক্রাইম ছিল। আজকের রিইউনিয়নটা ওরই আয়োজন করা। অংশুমান আমাকে এমন করে জিজ্ঞেস করল কথাটা,যে বলতে একটু সাহস পেলাম। মাথা নীচু করে বললাম,
‘খুব বাজে স্বপ্ন।এতদিন পর তোদের সাথে আবার দেখা হবে বলে খুব এক্সাইটেড ছিলাম।কিন্তু এমন একটা জিনিস দেখলাম আর কী বলি। সকাল থেকেই সেটা মাথায় ঘুরছে। আমি দেখলাম….’
রীতেশ বলল,’হ্যাঁ বল না’
আমি বললাম,’আমি তোকেই দেখেছি’
রীতেশ,’বাবা!আজকাল স্বপ্নে আমাকে দেখছিস নাকি?’
‘প্লিজ,এটা ইয়ার্কি না। আমি…আমি তোকে মরতে দেখেছি। কীভাবে জানি না। শুধু দেখলাম মাথাটা পুরো থেঁতলে গেছে। চেনা যাচ্ছে না।’
রীতেশ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল,’হা হা,আরে তুই যদি বুঝতেই না পারিস ওটা কার মুখ তাহলে সিওর কীকরে হচ্ছিস যে ওটা আমি?’
‘হ্যাঁ আমি সিওর,লাশটা একটা ছেলের ছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই কারণ…’
কৃষ্ণা আমাকে থামিয়ে বলল,’এই ছাড় তো। যাই দেখে থাকিস সেসব নিয়ে ভেবে কি কোনো লাভ আছে?’
চয়ন বলল,’আরে হ্যাঁ ঠিকই তো।তুই আবার কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হলি নাকি?বাবা কাকারা তো বলেই থাকেন ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়।’
আমি বললাম,’না রে ওসব কিছুই নয়।’
অংশুমান বলল,’এতদিন পর দেখা হল,মজা করবি তা না।’
আমি বললাম,’হ্যাঁ,ঠিকই বলেছিস। সত্যিই ভুলভাল ভাবছি।’
রাত দশটা। খাওয়া দাওয়া করে বেরবো সবাই। সত্যিই সবাই মিলে আমাকে আশ্বাস না দিলে আজকের এত ভালো দিনটাই মাটি করে দিচ্ছিলাম আমি। যত্তসব!
কৃষ্ণার বাড়ি একটু দূরে। তাই চয়ন ওকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছিল। ক্যাবে তুলে দেবে হয়তো। আমরা ছেলেরা একটু পরেই বেরোতাম। হঠাৎই আমার চোখ গেল রীতেশের দিকে। সে তখন নেশায় বুঁদ। বললাম,
‘এই রীতেশ। তোর জ্যাকেটটা কোথায়?’
রীতেশ বলল,’আছে হয়তো কোথাউ এখানে।’
আমি বললাম,’না না বল কোথায়?’
তখন আমরা তিনজন ছিলাম। আমি,অংশুমান আর রীতেশ। অংশুমান বলল,’কী ব্যাপার বল তো?’
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম,’ওই জ্যাকেট,ওই জ্যাকেটটাই….বল কোথায় ওটা?’
রীতেশ বলল,’জ্যাকেটটা… এই হ্যাঁ। দেখেছিস ভুলেই গেছি। চয়নকে দিয়েছিলাম। খুব ভালো লেগেছে নাকি,ওই তো গায়ে দিয়ে বসেছিল।’
শুনেই সঙ্গে সঙ্গে আমি চিৎকার করলাম,’চয়ন,চয়ন দাঁড়া’
দৌড়তে থাকলাম আমি গেটের দিকে। তার মানে চয়ন! হ্যাঁ তাই তো। আমি দেখেছিলাম টকটকে লাল রং এর জ্যাকেট পরে আছে একটা লাশ। মুখ দেখে চেনার উপায় নেই। ইশ!আমি কেন তখন বললাম না পুরো কথাটা! হঠাৎ দেখি চয়ন দাঁড়িয়ে গেটের সামনে। আমাকে দেখে বলল,’কীরে হাঁপাচ্ছিস কেন?’
‘তুই…তুই ঠিক আছিস?জ্যাকেট…ওই জ্যাকেট?’
‘কীসের জ্যাকেট?’ চয়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
আমি বললাম,’রীতেশের জ্যাকেট। লাল রঙের জ্যাকেটটা!’
-‘সেটা তো কৃষ্ণার কাছে।’
-‘মানে?ও যে বলল তোর জ্যাকেটটা ভালো লেগেছিল?’
-‘নেশায় বুঁদ হয়ে ভুলভাল বকছে। আমি না ওটা কৃষ্ণার পছন্দ হয়েছিল।’
আমি বললাম,’ও কোথায়? গাড়িতে তুলে দিয়েছিস?’
চয়ন বলল,’হ্যাঁ। আরে তুই খামখা টেনশন করছিস।’
আমি সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে বাইকে করে বেড়িয়ে গেলাম কৃষ্ণার বাড়ির দিকে। কতবার করে ফোন করছি ধরছে না। খুব চিন্তা হচ্ছে। হয়তো অন্যমনস্ক ছিলাম,একটা ট্রাক যাচ্ছিল সামনে দিয়ে। প্রায় মুখোমুখি,কোনোরকমে পাশ কাটিয়ে গেছি আর তারপর….সব অন্ধকার। জ্ঞান ফিরল প্রায় তিন ঘণ্টা পর। মাথায় তেমন লাগেনি,সামান্য রক্ত লেগে আছে দেখছি। একটা ফোন এল। অংশুমানের ফোন,বলল,
‘তুই কোথায়?কখন থেকে ফোন করছি,ঠিক আছিস তো?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ,ঠিক আছি। কৃষ্ণার কোনো খবর আছে?’
অংশুমান কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,’যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুলিশ স্টেশনে আয়। কৃষ্ণা মারা গেছে। লাশ শনাক্ত করতে হবে।’
পুলিশ স্টেশনে যেভাবে হোক পৌঁছলাম। অংশুমানকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম,’বাকিরা কোথায়?’
‘ওরা মদ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আর ডাকিনি। পুলিশ স্টেশন থেকে ফোন করতে নিজেই চলে এলাম।’
‘কীভাবে হল?’
‘খুন। পাথর দিয়ে মুখে বারবার আঘাত করা হয়েছে। তুই যা বলেছিলিস তার সাথে পুরোপুরিই মিলে গেল।’
এসব শুনে আরও একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না,’ওর গায়ে কী?’
‘হুমম রীতেশের লাল জ্যাকেট।’