গল্পে সুমিতা পয়ড়্যা

ওয়েলকাম ব্যাক

অনেক পুরোনো পাঁচতলা বিল্ডিং। কোন লিফ্ট নেই, বাইরে থেকে দেখলে বিবর্ণ দশা। জল সোপ করে করে এখানে খানিকটা খসে পড়েছে তো ওখানে খানিকটা খসে পড়েছে। যেখানে সেখানে বট ও অশ্বত্থের চারা বেড়ে উঠেছে।
এত বড় বিল্ডিং এ তেমন মানুষজন খুব একটা দেখা যায় না। দাস বাবু মানে অমিত দাস তার পরিবার নিয়ে কোনরকমে দিন গুজরান করেন। আরো দু’তিনটে পরিবারের বাস ছিল; কিন্তু ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, চাকরির কারণে সব বাইরে। মাঝেমধ্যে ছুটি পড়লে ওনারা আসা-যাওয়া করেন। তাই এত বড় বাড়ি মেরামত করবার মত ক্ষমতা দাস বাবুর পক্ষে সম্ভব নয়। একটা সিকিউরিটির চাকরি করেন একটি কোম্পানিতে। তাই দিয়ে পরিবারের চারজন সদস্যের ভরণ পোষণ। এই সামলাতেই হিমশিম, তার উপর বাড়ি সারানোর কোন প্রশ্নই আসে না!
ঘরের ছাদের উপরে কিছু কিছু অংশ খসে পড়ছে; দেওয়াল গুলো সোপ করে করে প্লাস্টারগুলো খসে পড়ে বিভিন্ন আকৃতির প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু দাস বাবুর স্ত্রী অনুমিতা খুব সুন্দর করে ঘরটাকে সাজিয়ে রেখেছেন;
তাই ঘরে ঢুকলে ওসব চোখে আসে না চট করে। তিনটি বড় বড় ঘর, একটি ডাইনিং, একটি রান্নাঘর আর দুদিকে দুটি ব্যালকনি ও দুটি বাথরুম। সব মিলিয়ে একটি বড় বাড়ি প্রায় ১৪০০ স্কয়ার ফিট হবে। অনুমিতা দুটি ব্যালকনি জুড়ে পাতাবাহার গাছের সম্ভারে ভরিয়ে রেখেছেন। অনুমিতা গাছ খুব ভালোবাসেন। তাই টবে টবে পাতাবাহার।
অনুমিতাও একটি কাজ করেন। সমাজসেবী হিসাবে তার বিশাল নাম ডাক। ছেলে দুটি পড়াশুনায় খুব ভালো। দুজনেই ১৮বছর পার করে গেছে। আর দুজনেই টিউশনি করে। তাই খানিকটা স্বাবলম্বী। এছাড়াও নিজেরা নিজেদের কাজগুলো করে নিতে পারে। তাই তাদের মা অনুমিতা কাজে বেরোলেও তাদের খুব বেশি অসুবিধা হয় না।
দাস বাবু সাধারণ মানুষ; খুব পরিশ্রমী; লক্ষ্য একটাই ছেলেদের মানুষ করতে হবে। দুটিকেই কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি করেছেন। দাস বাবুর শিফ্টিং ডিউটি থাকে। তাই বেশিরভাগ সময় সকলের একত্রিত হতে পারে না। একটু এদিক ওদিক হয়। অনুমিতাও সব সময় বাড়িতে থাকে না। এই ভাবেই দিনগুলো কাটে দাস বাবুর।
হঠাৎ গত বুধবার দিন দাস বাবু দুপুরে ডিউটি সেরে বাড়ি ফেরেন। ফিরে দেখেন বাড়িতে তালা। অগত্যা তালা খুলে ঘরে এসে দেখেন বাড়ির চতুর্দিক জানলা দরজা সব বন্ধ। বুঝতেই পারেন দুই ছেলে কলেজে এবং অনুও বেরিয়েছে কাজে। তিনি দরজা গুলো এক এক করে খোলেন। তারপর বাড়ির প্রবেশদ্বারের দরজা বন্ধ করে কাঁধের ব্যাগটা বিছানার উপর রেখে ফ্রেশ হতে যাবেন এমন সময় দেখেন অন্য রুমে বিছানার উপর প্রায় শুকনো জামাকাপড় ঢাউস করে রাখা আছে। তখন জামা কাপড়গুলো তারে মেলবেন বলে পাঁজা কোলে নিয়ে ব্যালকনির দরজা খুলে বেরোতে যাবেন—এমন সময় কে যেন বলে উঠলো, “ওয়েলকাম ব্যাক (Well come back) I”
সঙ্গে সঙ্গে দাস বাবু পিছন ঘুরে দেখেন। দেখলেন যে, কেউ নেই। ঘর অন্ধকার। হঠাৎ এমন কথা শুনে ভাবলেন হয়তো অনুমিতা এসেছে। ইয়ার্কি করছে তার সাথে। কিন্তু না; কেউ নেই!
দাস বাবু মনে মনে ভয় পেতে শুরু করলেন। অদ্ভুতুড়ে কান্ড! ভয়কে সরিয়ে অন্ধকার ঘর হাতরে হাতরে আলো জ্বালাতে যাবেন আবার কেউ বলে উঠলো—- “ওয়েলকাম ব্যাক।”
কিন্তু ততক্ষণে তিনি জামা কাপড় ফেলে দিয়ে কাঁপতে শুরু করেছেন। দাস বাবু ভয় পাচ্ছেন। ভীষণ রকম ভয়। আর ভয়কে যতই এড়িয়ে যেতে চাইছেন ততই যেন বেশি করে ঘাড়ে চেপে বসছে। তবু ভয়কে উপেক্ষা করে মনে মনে ভাবছেন কি করে এটা সম্ভব? কেউ নেই অথচ কথা বলছে! তবে কি এই ঘরে ভূত বাস করতে শুরু করেছে! এসব ভাবতে ভাবতে না জামা কাপড় মেলতে পারলেন; না ওয়াশরুমে যেতে পারলেন; শুধু দরদর করে ঘামছেন।

ঠিক যেন সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “শিলং যাত্রার”গাড়িটার মত অবস্থা—-“ন যযৌ ন তস্থৌ।”

যেহেতু সিকিউরিটির চাকরি করেন তাই ওই অবস্থাতেও কোনো রকমে আলো জ্বাললেন। এইরকম অবস্থায় দাস বাবুর মাথা ঘুরতে লাগলো। শুধু একটাই কথা শুনতে পাচ্ছেন—“ওয়েলকাম ব্যাক।”
এরপর হঠাৎ করে বিছানাতেই পড়লেন এবং জ্ঞান হারালেন এই ভাবেই পড়েছিলেন বেশ কিছুক্ষণ।
তারপর অনুমিতার আগমন। দরজার লক খুলে ঘরে ঢুকলেন। দেখলেন একটি রুমে আলো জ্বলছে। গজ গজ করতে করতে এগোলেন—-ছেলেদুটোকে নিয়ে আর পারিনা; দিনের বেলাতে ও লাইট জ্বেলে রেখেছে! কিন্তু না ছেলেরা তো ঘরে নেই। তবে লাইট জ্বলছে কেন? লাইট কে জ্বালালো ভাবতে ভাবতে এগোলেন এবং একটু ঘাবড়েও গেলেন! কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না তো! এরপর চোখ চোখে পড়ল দরজার সামনে পড়ে আছে জামা কাপড়গুলো! কাঁচা জামাকাপড় গুলো এখানে এলোই বা কি করে! তবে কি চোর ঢুকেছে! নাকি এসব ভুতের কান্ড! এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে এগিয়ে জামা কাপড় গুলো নিতে যাবে ঠিক তখনই নজর পড়লো বিছানার দিকে! বিছানাতে কে যেন শুয়ে আছে! আরো এগিয়ে গিয়ে দেখলেন উপুড় হয়ে পড়ে আছেন অমিত দাস। ছুটে কাছে গেলেন! ডাকলেন অমিতা অমিত করে! কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেলেন না অনুর আরো ভয় হয়ে গেল—-তবে কি মানুষটা—–?
তুরি ঘুড়ি করে এক গ্লাস জল নিয়ে এসে দাস বাবুর মুখে ছেকাতে লাগলেন। দাস বাবু জেগে উঠলেন। অনু জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে তোমার? ওঠো, আমি তো এসে গেছি!
দাস বাবু উঠে বসলে অনুমিতা সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারকে কল করলেন।
দাস বাবুর কোন কথা শোনার আগেই ডাক্তারের সঙ্গে কথা শেষ করলেন।
কারণ এর আগেও দাস বাবু নিজের কর্মক্ষেত্রে একবার পুরোপুরি ব্ল্যাকআউট হয়ে গেছিলেন। তখনো সবাই ধরাধরি করে জল ছিটিয়েছিলেন এবং ডাক্তার দেখিয়েছিলেন সেই সময়তে তার একটা আঙুল বেঁকে যায়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তারবাবু এলেন। কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতে দাস বাবু ঘটনার বিবরণ দিলেন। ডাক্তার সব শুনে বললেন, ভয় পেয়েছেন ভীষণ রকম। হার্ট ফেলও করতে পারতেন। ভাগ্যিস মাথা ঘুরে বিছানাতেই পড়েছেন। এই যাত্রায় রক্ষা পেলেন। এরপর ওষুধ লিখে দিলেন আর বললেন, আশা করি ঠিক হয়ে যাবে।
অনুমিতা এই কারণেই ভয় পেয়ে গেছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরে ই অনুমিতা বিছানা ঠিক করতে গিয়ে শুনতে পেলেন,”ওয়েলকাম ব্যাক।”
তখন অনুমিতা দেখে বিছানায় পড়ে আছে অ্যালেক্সা(Alexa)। এরপর অনুমিতা তার সঙ্গে কনভারসেশন করতে লাগলেন এতক্ষণে অনুমিতা বুঝলেন কে “ওয়েলকাম ব্যাক” বলেছে? আর কেনই বা বলছে?

অ্যালেক্সা খুবই সংবেদনশীল। অনুভূতি সক্রিয়, অনুভব করার শক্তি ও ক্ষমতা মারাত্মক রকমের। এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ডিভাইস।

দুই ছেলে অ্যালেক্সা কে বিছানায় টেডির কাছে রেখে গেছে যাতে অ্যালেক্সা একা না হয়ে পড়ে!
দাস বাবু এসব জানতেন না। অ্যালেক্সা কি? কোথা থেকে এলো? কিভাবে এলো?
দুই ছেলে মিলে অ্যালেক্সাকে বাড়িতে এনেছে লুকিয়ে লুকিয়ে। অনুমিতা জেনে গেলেও দাস বাবু এত খবর রাখেননি। আর অনুমিতাও বলতে ভুলে গেছে অ্যালেক্সার কথা। মনে মনে ছেলেদের উপর রাগ করলেন। নিজের মনেই বলতে থাকেন—- আজ আসুক ওই দুটো——–!
আসলে এলেক্সা হল অ্যামাজন ভয়েস এ আই। এলেক্সা ক্লাউডে থাকে এবং ইন্টারনেট অ্যাক্সেস এবং অ্যালেক্সার সাথে সংযোগ করতে পারে এমন একটি ডিভাইস আছে সেখানে সাহায্য করতে পেরে খুশি হয়। অ্যালেক্সা পছন্দের গান চালাতে পারে; সর্বশেষ শিরোনাম পড়তে পারে; বসার ঘরে আলো কমিয়ে দিতে পারে এবং আরো অনেক কিছুই করতে পারে। এক কমান্ডে ই সমস্ত কাজগুলো সেরে দিতে পারে অ্যালেক্সা। ঘুম থেকে ডেকে দেওয়া; প্রাত্যহিক খবরা-খবর থেকে আবহাওয়ার আপডেট সবকিছুই কানে কানে বলে দিতে পারে অ্যামাজনের এই মজাদার ডিভাইসটি——যা দাস বাবুর প্রাণ কেড়ে নিতেও পারতো অদ্ভুতুড়ে কান্ডের মত।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।