সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শাশ্বতী নন্দী (অন্তিম পর্ব)

নিশিভোর

পর্ব – ১৩

(১৮)

-তুমি কেন বলছ না গৌরী, আই হ্যাভ দা রাইট টু নো। বলো বাবার কী হয়েছে? সে আছে নাকি …
গৌরী কান্না চেপে শুধু মাথা নাড়ে, নেই। তারপর ধীরে ধীরে সবটাই বলে যায়।
-বাবা নেই? –অনুভবের শরীরটা এবার থরথর কাঁপছে।
গৌরী ওকে জাপটে ধরে রইল ‘এরকম কোর না। প্লিজ শান্ত হও’।
-তুমি কী বুঝতে পারছ গৌরী, বাবা নেই! বাড়ি ফিরে কাকে  বাবা বলে ডাকব আমি? হ্যাঁ, অনেক ক্ষোভ, রাগ, অভিমান, জমেছিল ঠিকই । কিন্তু তাই বলে এভাবে বাবা চলে যাবে! তুমি ঠিক শুনেছ, বাবা নেই?
প্রলাপের মতো বকে চলেছে ও, গৌরী বাধা দেয় না।  অনুভবের ভেতরের যন্ত্রণাগুলো যদি এভাবেই বেরিয়ে আসতে চায়, আসুক না। তবে জ্যোতিপ্রিয়র এভাবে চলে যাওয়াটা সেও যেন মেনে নিতে পারছে না। ডিজি সাহেব বললেন, অনেকগুলো স্লিপিং পিলস খেয়েই নাকি …
অনুভব একসময় শিশুর মতো কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে যায় কথা, তবু ও বলে চলে, ‘আমি জানতাম এরকম একটা কিছু হতে যাচ্ছে। কাল এমন একটা স্বপ্ন দেখলাম …
-স্বপ্ন! কী স্বপ্ন?
-একটা তীক্ষ্ণ হুইসিলের শব্দ বার বার আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছিল। অথচ সামনে কোনও ট্রেন লাইন নেই। ভাবলাম মনের ভুল। একসময় চোখটা সামান্য লেগে এসেছে, হঠাৎ দেখি একটা অদ্ভুত ট্রেন, ঠিক রথের মতো দেখতে, ফুলমালায় সাজানো, ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে আমার পাশ দিয়ে। গেটের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে বাবা, আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে হাত নাড়ছে। যতক্ষণ দেখা যায়, হাত নেড়েই চলেছে। স্বপ্নটা ভাঙতেই  বিছানা থেকে উঠে পড়লাম, আর ঘুম এল না।
গৌরী অবাক, ঠিক এরকমই একটা ঝমঝম শব্দে ট্রেন চলে যাওয়ার আওয়াজ তার ঘুমও ভাঙিয়ে দিয়েছিল গত রাতে।
-কাল বাবা অনেকবার ফোন করেছিল। আমি ধরি নি। ভুল করেছি, না গৌরী? চলে যাওয়ার আগে হয়তো কিছু বলে যেতে চেয়েছিল। স্বীকারোক্তি, কনফেশন।
স্বগতোক্তির মতো বলে চলেছে অনুভব।
-আসলে তীব্র আত্মগ্লানি, বুঝলে গৌরী। হ্যাঁ, ওতেই মানুষটা চলে গেল। নিশ্চয়ই আমার ওপর খুব অভিমান নিয়ে গেছে। কিন্তু অভিমান কি শুধু বাবার একার, আমার হতে নেই? ঠিক কিনা বলো? – অনুভব হাঁপাচ্ছে। -আমি তো বাবার মধ্যে দিয়েই পৃথিবীটাকে দেখতে চাইতাম। কিন্তু বাবা, সেই পৃথিবীটাকে এমন ওলোট পালোট করে দিতে চাইছিল কেন? কেন বুঝতে চাইত না, আমি তোমাকেও ছেড়ে থাকতে পারি না।
গৌরীর চোখেও এবার টলটলে জল। অবাক হয়ে দেখে চলে অনুভবকে। আজ মানুষটা সব পরিচয়ের উর্ধ্বে। সে শুধু এখন এক অসহায়, সদ্য পিতৃহারা  সন্তান।
হঠাৎ অনুভবের ফোন বেজে উঠল। গৌরীই ধরল কলটা।
-আন্টি। – সেই কচি গলা। ওপাশে ঊষা।
– হ্যাঁ বলো।
-আঙ্কেলকে ডাকো তো। বল, আমি ছবি আঁকতে শিখে গেছি। একটাও রঙ নষ্ট করি নি।
গৌরী এত কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেলে, ‘আচ্ছা বলে দেব। তুমি এখন ফোন রাখো, আঙ্কেল তোমার সঙ্গে পরে কথা বলবে।
-এক মিনিটের জন্য ডাকো না।
-না বাবু, এখন আঙ্কেল কথা বলবে না।
-কেন কথা বলবে না? আঙ্কেল কি রাগ করেছে? বলো না, আমি ভাল ছবি আঁকা শিখে গেছি।
-আচ্ছা, বলে দেব। তুমি এখন লাইন ছেড়ে দাও।
কলকাতায় যখন পৌঁছল ওরা, রাত তখন অনেক। জ্যোতিপ্রিয়র বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়ি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। অনুভব নিজেকে এখন অনেকখানি সামলে নিয়েছে। শান্ত ভাবে বাবার ঘরে গিয়ে দাঁড়াল খানিকক্ষণ। তারপর বেরিয়ে এসে কর্তব্যরত পুলিশের সঙ্গে কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নেয়। এসময় একজন এসে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। জ্যোতিপ্রিয়র সুইসাইড নোট।
পাশের ঘরে চলে আসে অনুভব। পিছু পিছু গৌরীও আসে।   দেখে চোখের সামনে চিঠিটা খুলে রাখলেও, এক বিন্দু সেটা পড়তে পারছে না অনুভব। ওর চোখে অঝোর ধারা।
গৌরী নিজেই ওটা হাতে তুলে নেয়। বেশ লম্বা একটা চিঠি। গোটা গোটা অক্ষরে, ধীরে সুস্থে লেখা। নীল কালি। চিঠির প্রথমেই অনুভবের নাম।
-এই চিঠিখানি যখন তোমার হাতে পড়বে, আমি তখন বহু দূরে। হয়তো দু ফোঁটা জল জমতে পারে চোখের কোলে, কিংবা নাও পারে। চিরকালই যে তুমি চাপা স্বভাবের। তাছাড়া এখন তো আমার প্রতি তোমার এক বুক ঘৃণা।
হয়তো ভাবছ, এই চিঠি লিখছি নিজের কোনও দোষ স্খলনের উদ্দেশ্যে। মোটেই তা নয়। আসলে দু চারটে কথা তোমার জানা জরুরি। পারলে এ চিঠি গৌরীকেও পড়িয়ো। ও খুব ভাল মেয়ে। আমি ওর বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারি নি। পারলে আমায় যেন ক্ষমা করে।
গৌরী চিঠি পড়তে পড়তে একটু থামে। অনুভব চেয়ারে ঘাড়টা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে আছে। কাছে গিয়ে একটু ঝাঁকুনি দেয় সে, ‘অ্যাই, কী হয়েছে, শরীর খারাপ লাগছে তোমার?’
-না, তুমি পড়ে যাও, আমি শুনছি।
…অনু, আমার আর হারাবার কিছু নেই, তাই যা বলব, সব সত্য। হ্যাঁ, স্বীকার করছি, শিব শম্ভুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গৌরীকে খুনের চক্রান্ত করেছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, কাজটা করতে বাধ্য হয়েছি। নইলে নিজের সন্তানকে বলি দিতে হত। হ্যাঁ, সেরকমই একটা শর্ত রেখেছিল শিবু।
পিতা মাতার কাছে সন্তানের চাইতে বড় যে আর কিছু হয় না। আমিও তাই স্বার্থপরের মতো … ইয়েস তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছি অ্যাট দা কস্ট অফ গৌরী’জ লাইফ।
তবে বিশ্বাস কর, আমি জানতাম, গৌরী ঠিক বেরিয়ে আসবে এই চক্র ব্যুহ থেকে। ওর মধ্যে সে শক্তি আছে।
শিবু আমার অনেক কালের বন্ধু। একসময় দুজনে মিলে একটা ব্যবসায় নেমেছিলাম। কিন্তু সে ব্যবসা সৎ পথে হয় নি। একটা মেয়ে পাচার চক্রের সঙ্গে ব্যবসায় নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। তুমি ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলে। আমি তোমায় কথা দিয়েছিলাম ওই কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেব, নিয়েওছিলাম। দুই বন্ধুর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল তখন থেকে। ও-ও শহর থেকে কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। হঠাৎ আবার তার উদয়। তখন ওর ভোল পুরোপুরি পাল্টে গেছে। দেশে লাখ লাখ ভক্ত। সকলের শিবশম্ভু বাবাজী। ও-ই আবার আমায় খুঁজে নিল। ঘনিষ্ঠতা আবার বাড়ল। একদিন সে সরাসরি প্রস্তাব দেয়, গৌরীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। কারণ তার কাজের জগতে গৌরী নাকি প্রতিবন্ধক। শিবু কোনও সূত্র থেকে জানতে পেরেছিল বৌমার প্রতি আমার চরম বিদ্বেষ। তাই হয়তো ভেবেছিল প্রস্তাবটা আমি লুফে নেব।
কথাটা কিঞ্চিৎ সত্য, গৌরীকে প্রথম দিকে আমি মেনে নিতে পারি নি। আসলে ভয় হত, ওর ভালবাসায় তুমি ধীরে ধীরে আমার থেকে দূরে সরে যাবে। তাছাড়াও ওকে দেখলে আমার  পৌরুষে লাগত, একটি মেয়ের এত ক্ষমতা আমি সহ্য করতে পারতাম না। কিন্তু পরে বুঝলাম, ওর মধ্যে যে শক্তি আছে, ওকে থামানো যাবে না। সব চেয়ে বড় কথা ও সেই শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে সমাজের মঙ্গলার্থে।
এদিকে শিবুর হাত থেকে আমার ফেরার পথ বন্ধ। তাই ওর কথামত কাজ করে চললাম। তবে আবারও বলছি, জানতাম, গৌরী সিনহাকে এত সহজে কেউ কাবু করতে পারবে না। ও কুসুমপুরে আসছে, সমস্ত আটঘাট বেঁধেই।
তবে আমি জানতাম, বাবাজীর প্রথম টার্গেট গৌরী সিনহা, তারপর অনুভব সিনহা, শেষে আমি। কারণ বাবাজী কোনও সাক্ষী রেখে কাজ করায় বিশ্বাসী নয়। তাই গৌরীকে সামনে রেখেই এই পথের কাঁটা ওপড়াতে চেয়েছিলাম।
ব্যস, যা জানাবার, সব জানিয়ে দিলাম। আজ না হয় কাল, আমার মৃত্যু নিশ্চিতই ছিল। কারণ এক্সপায়ারি ডেট অনেকদিন ওভার। একেটেনশনে কাটিয়ে যাচ্ছি। এবার ছুটি চাই।  তাই নিজের হাতেই নিজের মৃত্যুটাকে বেছে নিলাম। তবে বড় নির্ভার হয়ে পৃথিবী ছাড়ছি। তোমরা ভাল থেকো, আমায় ক্ষমা কর।
এবার শুধু অনুভব নয়, গৌরীর ফোঁটা ফোঁটা চোখের জলে  চিঠির নীল কালির অক্ষর যেন নীল নদী হয়ে বইতে থাকল।
(১৯)
বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে। অনুভব কিন্তু এখনও বাবার মৃত্যুটাকে মেনে নিতে পারে নি। সমস্ত কাজ গতানুগতিক চলছে যদিও, কিন্তু মাঝে মাঝেই কোথ থেকে এক ধূ ধূ শূন্যতা, অনুভবকে গ্রাস করে চলে। গৌরী সে সময় ওকে একা হতে দেয় না। নিজের সবটুকু দিয়ে ওকে আগলে রাখে।  আজকাল প্রায়ই মনে হয়, তাদের দাম্পত্যের শুরুই বোধহয় জীবনের এই বিন্দু থেকে।
রাজ্য পুলিশ থেকে গৌরীকে সংবর্ধনা দেওয়ার খবর আগেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল। আজ সেই দিন। বিরাট আয়োজন। দেশের সমস্ত হেভি ওয়েটরা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। এর মধ্যে দুটো খবর কানে পৌঁছে যায় তার। ঝিলমিলপুর আশ্রম এখন পুলিশ কবলিত। আশ্রম খালি করার সময়,  শিব শম্ভুর মতো তার আরও কিছু চ্যালা চামুন্ডাদের ধরে গারদের ওপারে চালান করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে নতুন কোনও ভন্ড বাবাজীর জন্ম না হয়, রাজ্য পুলিশ সে ব্যাপারে এখন তৎপর।
দ্বিতীয় খবরে গৌরী রীতিমত চমকে ওঠে। অরিন্দম পাল, চাকরি থেকে সাসপেন্ডেড।
প্রতিবারের মতো এ খবরেরও পরিবেশক গৌরীর দুই বিশ্বস্ত মানুষ, রোহিত আর হরিবাবু।
রোহিত তো রীতিমত উত্তেজিত। বলে, ‘বাজি ধরে বলছি ম্যাডাম, অরিন্দম পালের চাকরিটা এবার শুধু যাবেই না, সঙ্গে কয়েক বছর জেলের ঘানিও টানতে হবে। ডিজি সাহেব ওর সমস্ত পুরনো কেস আবার রি ওপেন করার অর্ডার দিয়েছেন’।
হরিবাবুও বড় একখানা স্যালুট ঠুকে বলে, ‘বলেছিলাম ম্যাডাম, পাশা ওল্টাবেই। জয়ের মুকুট আপনার মাথায় উঠবেই’।
-ইয়েস, আমার মনে আছে ক্যাপ্টেন। – গৌরী হাসে। -চাকরি আর কতদিন আপনার?
-এই তো হয়ে গেল ম্যাডাম। আর কয়েকটা মাস।
-এইসব মিটে যাক, আমার বাড়িতে আপনার আর রোহিতের একদিন নিমন্ত্রণ রইল।
-উঁহু ম্যাডাম, দুজনে যেতে পারব না। – হরিবাবু একটু গম্ভীর।
গৌরী অবাক, ‘কেন?’
-আমরা এখন দলে তিন। সামনের মাসে রোহিতের বিয়ে। জুঁই যেতে না পারলে বড্ড দুঃখ পাবে যে।
-তাই নাকি রোহিত! কনগ্র্যাচুলেশন।
-দেখুন আজ ছোকরা একেবারে রেডি হয়েই এসেছে। ব্যাগ ভর্তি নেমন্তন্নর কার্ড।
 অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল যথা সময়ে। সম্মানীয় অতিথিদের ভাষণ শেষে  গৌরীকে মঞ্চ ডাকা হয়। ডিজি সাহেব তো মাইক ধরেই গৌরীর ভূয়সী প্রশংসা শুরু করে দিলেন।  এরপর সংবর্ধনা। ওর গলায় পরিয়ে দেওয়া হল সোনার মেডেল। চারিদিকে হাততালির ঝড়। গৌরী আড়াল করে চোখের জল লুকোতে চাইছে। এমন একটা দিনের স্বপ্ন তো সে কতবার দেখেছে।
ডিজি সাহেব সাহেব হেসে বলেন, ‘নাও, এবার কিছু শোনাও তোমার কথা’।
কিন্তু কী আশ্চর্য! সেই দুঁদে আই পি এস, গৌরী সিনহার আজ যেন সব ভাষা ফুরিয়ে গেছে। ক্ষণিকের জন্য সে বেবাক স্তব্ধ। তবে নিজেকে সামলেও নিল একসময়। বলে, ‘আপনাদের দেওয়া এই সম্মানে আমি আপ্লুত। বিশ্বাস করুন, এই পরিস্থিতিতে কী বলব, কীভাবে বলব, সব যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। তবু প্রথমেই যাঁর নাম নিতেই হবে, তিনি আমাদের শ্রদ্ধেয় ডিজি স্যার, যিনি আমার ওপর ভরসা করে ব্লু হেভেনের দায়িত্ব সঁপে দিয়েছিলেন। দায়িত্বটা পেয়ে সে দিনই মনে মনে শপথ নিয়েছিলাম, যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, লড়াই থামাব না। আমার প্রতি স্যারের এই ভরসার পূর্ণ মর্যাদা দেব। – কথা শেষে গৌরী বড় করে শ্বাস নেয়।
-তবে এই শপথও একসময় টলে যায়। এমন ভাবে প্রতিকূলতা আসতে শুরু করল চলার পথে। সে সময়ের দুটো মানুষের নাম আমায় করতেই হবে … … –বলেই সে হরিবাবু আর রোহিতের কথা উল্লেখ করে। আবার হাততালি।
ওরা দুজন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সকলের উদ্দেশে নমস্কার জানাল।
গৌরীর দৃষ্টি এবার ঘুরে যায় অনুভবের দিকে।
-আরও যারা আছেন, আমার এই যুদ্ধ জয়ের পেছনে,  তাদের মধ্যে একজন হলেন আমার স্বামী, আই পি এস, অনুভব সিনহা। বলা যায়, ব্যাক স্টেজ থেকে সে এমন ভাবে যুদ্ধক্ষেত্রটা সাজিয়ে রেখেছিল, … যদিও প্রথমে তার কিছুই আমি জানতে পারি নি। – বলেই খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে কিছু কথা সে বলে যায় অনুভবের ব্যাপারে।
চারিদিকে আবার হাততালি। ডিজি সাহেব নিজে দাঁড়িয়ে অনুভবকে মঞ্চে আসতে অনুরোধ করলেন। ভীষণ লজ্জিত মুখে অনুভব উঠে এল। জড়িয়ে ধরলেন ডিজি, ‘বোথ অফ ইউ মেইড আওয়ার ডিপার্টমেন্ট প্রাউড’।
গৌরী এতক্ষণে যেন কথায় সাবলীলতা ফিরে পেয়েছে। বলে, ‘এই ব্লু হেভেন মিশন ছিল আমার কাছে যেন এক পর্বতশৃঙ্গ জয়। ওই পর্বত আরোহণে কত যে ক্ষত বিক্ষত হয়েছি, রক্তাত্ব হয়েছি। কখনও আঘাতগুলো এতটাই দগদগে হয়ে উঠত, মনোবল ভেঙে যেত, আমি থেমে যেতে চাইতাম। কিন্তু থামতে দেয় নি আর একটি মানুষ। আমার সাংবাদিক বন্ধু সুমনা। এই কেসে কত যে নথিপত্র জোগাড় করে ও আমায় সাহায্য করেছে।
অনুভব মঞ্চ থেকে নেমে আবার নিজের সিটে গিয়ে বসেছে। একটা ফোন এসেছে বোধহয়। গৌরী ওপর থেকেই দেখল, মোবাইলে হাত চাপা দিয়ে কথা বলতে বলতে অনুভব উঠে চলে যাচ্ছে হলের বাইরে।
গৌরী বলে চলে, ‘সুমনা ছিল আমার লাঠি। যখনই থেমে যেতে চেয়েছি, ও হাত ধরে পথ হাঁটিয়েছে, বলেছে, ওই তো দেখা যাচ্ছে, তোমার সেই পর্বত শৃঙ্গ। আর একটু এগোও, আর একটু, এখুনি ছুঁয়ে দিতে পারবে শৃঙ্গটাকে …
বলতে বলতে তার গলা বুজে আসে। -কিন্তু সুমনা আমার এই শৃঙ্গ জয়ের দিন দেখে যেতে পারল না। বাবাজীর হাতেই সে খুন হয় দার্জিলিংয়ে। কিন্তু আজও ওকে আমি ভুলি নি। ওকে ভোলা যায় না।
গৌরী থেমে যায়। চোখের কোণ দিয়ে বেরিয়ে আসা তপ্ত অশ্রু। আবেগকে সে রুখতে চাইলেও, পারে না।
ঠিক তখনই অনুভব আবার হলে ঢুকল। কারোকে কিছু বলল বোধহয়। সে এসে গুটিগুটি মঞ্চে উঠে ডিজি সাহেবের কানে কানে কিছু জানায়। উনি হাত তুলে যেন অনুমতি দিলেন।
গৌরীর কথা শেষ, সে মাইক রেখে দিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে আসে। ডিজি সাহেব এবার অনুভবের নাম করে মঞ্চে ডাকলেন। গৌরী অবাক, আবার অনুভবকে কেন?
ও উপরে উঠে আসল ধীর পায়ে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে সকলকে নমস্কার জানাল প্রথমে। তারপর বলে, ‘গৌরী সিনহার এই সাফাল্য অনুষ্ঠানে, আজ অনেক দূর থেকে একজন এসেছেন ওকে অভিনন্দন জানাতে, স্যার, যদি আপনি অনুমিত দেন, আমরা তাকে ডেকে নেব স্টেজে’।
-হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ডাকবে।
গৌরী অবাক, কে? কে এসেছে ওকে অভিনন্দন জানাতে? খুব তীক্ষ্ণ চোখে সে তাকিয়ে রইল সামনে বসা অডিয়েন্সের দিকে। একজন মহিলা এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। আরও খানিকটা নিরীক্ষণ করতেই, গৌরী চমকে ওঠে। সুমনা!
অনুভব হাসল, ‘হ্যাঁ সুমনা। তোমার হারিয়ে যাওয়া বন্ধু, সুমনা। ওর মৃত্যুর খবরটা পুরোটাই রটনা’।
গৌরী উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সুমনা কাছাকাছি আসতেই ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল, ‘তুমি, তুমি,  সুমনা তুমি ফিরে এসেছ!’
হলঘর নিস্তব্ধ।
অনুভব মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘স্যার, আজ এ  অনুষ্ঠানে সুমনার ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলা বোধহয় উচিত হবে না। কারণ এটা গৌরী সিনহার সংবর্ধনা অনুষ্ঠান’।
-হোয়াই নট? ব্লু হেভেন মিশনে সুমনার যদি কোনও রোল থাকে, আমি সেটা জানতে আগ্রহী।
অনুভব হাসে, ‘সেটা বোধহয় ওর মুখ থেকে কিছু কথা শুনলেই বোঝা যাবে’।
সুমনা ধীরে ধীরে এবার মঞ্চের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। আজ ভারি শ্রীময়ী দেখাচ্ছে ওকে। ঠিক প্রথম পরিচয়ের দিনের মতো, চমৎকার সেজে এসেছে সুমনা। মাইক হাতে নিয়ে বলে, ‘আমি আমার বন্ধু গৌরীর জন্য কতটা কী করতে পেরেছি জানি না। তবে হ্যাঁ, এটা বিশেষ ভাবে চাইতাম, এই মিশনে ও জয়ী হোক। ভন্ড বাবাজীর নিধন আমাদের গৌরীর হাতেই হোক। তবে আজ যে আমার বেঁচে থাকা, সেটা সম্পূর্ণই কিন্তু গৌরী আর ওর হাজব্যান্ড অনুভব স্যারের জন্য। ওরা আমার পুনর্জন্ম ঘটিয়েছে’।
ডিজি সাহেব অবাক, ‘ইজ ইট?’
-হ্যাঁ। দার্জিলিং হোটেলে উঠেছিলাম। বাবাজীর আশ্রম থেকে একটি মেয়েকে বার করে নিয়ে পৌঁছে দিয়ে এসেছিলাম ওর প্রেমিকের কাছে। তারপর থেকেই বুঝতে পারি আমাকে সর্বক্ষণ কারা যেন শ্যাডো করছে। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। যতই ডাকাবুকো হই, বাঁচার আকুলতা যে সবারই থাকে। তা, মোবাইল বন্ধ রেখে হোটেলের ল্যান্ড লাইন থেকেই এদিক ওদিক যোগাযোগ শুরু করলাম। বাইরে বেরোনোটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল। কিন্তু এভাবে কতদিন? বসে বসে হোটেলের মিটার বেড়ে চলেছে। পয়সাও প্রায় শেষ। বাধ্য হয়ে তখন এক গাড়িওলাকে ফিট করলাম। সে রাজি হল, রাতের অন্ধকারে  আমাকে পাহাড় পার করে দেবে। তার জন্য যদিও ডবল ফেয়ার হেঁকে বসল। ভেবেছিলাম কোনক্রমে শিলিগুড়ি পালিয়ে আসতে পারলেই রাতের বাস ধরে কলকাতায় আসাটা কোনও প্রবলেম হবে না।
একটু দম নেয় সুমনা। -বেরোবার দিন, ঠিক ঘন্টা কয়েক আগে মোবাইলটা খুললাম। যদি গাড়িওলা আমায় যোগাযোগ করতে চায় … তখনই দেখি একটা মেসেজ।
অনুভব হাসল, ‘এবার বাকিটা কি আমি বলতে পারি?’
ডিজি হাত দেখালেন, ‘ক্যারি অন। রিয়েলি ইন্টারেস্টিং’।
-মেসেজটা আমিই পাঠিয়েছিলাম সুমনার ফোনে। সরাসরি নিজের পরিচয় দিয়ে লিখি, ইওর লাইফ ইজ ইন ডেঞ্জার। যে গাড়িটা চড়ে তুমি পালাতে চাইছ, সেটা আসলে বাবাজীর এজেন্টের গাড়ি। আমায় বিশ্বাস করতে পারলে ভাল, নয়তো তোমার ভাগ্য তোমার হাতে। আমি গৌরী সিনহার স্বামী। সুতরাং গৌরীর বন্ধুর প্রতি সামান্য দায়িত্ব আমারও থাকে। তাছাড়া এই জোনের দায়িত্বে আমি আছি। তাই তোমার কোনও বিপর্যয় ঘটে গেলে, নিজেকে অপরাধী লাগবে।
মেসেজটার কোনও রিপ্লাই দিল না সুমনা। এদিকে আমি ওর হিল কুইন হোটেলের নম্বর ট্যাপ করে জানতে পারি, সুমনার গাড়ি চলে আসছে ঠিক বিকেল পাঁচটায়।
আবার মেসেজ পাঠাই সুমনাকে। -আমার সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ থাকলে, থানার নম্বরে ফোন করে আমার সঙ্গে কথা বলে নাও। তোমার হাতে কিন্তু সময় বেশি নেই।
অনুভবকে থামিয়ে সুমনা হাসতে হাসতে এবার বলে, ‘হ্যাঁ, প্রথমে অনুভব স্যারের ওই মেসেজ আমি বিশ্বাস করতে পারি নি। তারপর ভাবলাম, দু পথেই যখন বিপদের গন্ধ, তাহলে যে রাস্তার দিকে মন ঝুঁকছে, সেদিকেই হাঁটি।
গৌরী হতবাক, শুনছে দুজনের কথা। অনেকগুলো ঘটনা সে এবার মেলাতে মেলাতে চলেছে। সুমনার মৃত্যু সংবাদ পেয়েও অনুভবের মধ্যে অদ্ভুত এক শীতলতা লক্ষ করেছিল।  তাহলে আসল কারণ কি এটাই? আর কুসুমপুর যাওয়ার পথে বার বার যে একটা নম্বর বেজে উঠছিল, ধরতেই একটা মহিলা কন্ঠস্বর, সেটাও তাহলে সুমনারই ছিল। কিছু যেন ও বলতে চাইছিল।
সুমনা আবার বলতে শুরু করে, ‘তবে হোটেল ছাড়াটা খুব সহজ কাজ ছিল না। কারণ তখন আমি বুঝে গেছি, আমার ওপর নজর রাখছে হোটেলেরই লোকজন। অনুভব স্যার গাড়ি পাঠালেন বেলা ঠিক তিনটেয়। আমি বেরিয়ে এলাম একটু অন্যরকম সাজ পোশাক করে যাতে চট করে আমায় কেউ চিনতে না পারে। ঘরে রেখে গেলাম সমস্ত লাগেজ। শুধু টাকা আর প্রয়োজনীয় কিছু কাগজ পত্র ট্যাঁকে বেঁধে নিয়েছি’।
অনুভব হাসে, ‘হ্যাঁ স্যার, সুমনাকে তো আমি চিনতেই পারি নি প্রথমে। ফেসবুকে ওর প্রোফাইল দেখেছিলাম। কিন্তু গাড়ি থেকে যখন নামল ও, আমি নিজেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। ও ছেলে না মেয়ে, চট করে চেনাই যাচ্ছিল না।
-এটা এমন কোনও ইস্যু নয় আমার কাছে।  ছদ্মবেশে হুটহাট এদিক ওদিক ঢুকে পড়ায় আমি অভ্যস্ত। – সুমনা হাসতে হাসতে বলে। – পত্রিকার কাজে এধরনের কত রিস্কি অ্যাসাইনমেন্ট হ্যান্ডেল করতে হয়েছে’।
হলঘরের সবার কান শুধু ওদের কথায়।
অনুভব বলে চলে, ‘গাড়ির ড্রাইভারকে আমার আগে থেকেই বলা ছিল, সুমনাকে তুলে নিয়ে সে যেন দার্জিলিংয়ের অলি গলির ভেতর দিয়ে গাড়ি ছোটায়। অর্থাৎ এমন জায়গা দিয়ে, যেখানে সি সি ক্যামেরা থাকার সম্ভাবনা নেই। যাতে বাবাজী বাহিনী সেই গাড়িকে ট্র্যাক করতে না পারে। কিন্তু কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই হোটেল থেকে ফোন চলে আসে  সুমনার কাছে। বলে, বেশ কিছু বিল পেমেন্টস ডিউ রেখে আপনি চলে গেছেন। ওগুলো এখুনি করে যান’।
সুমনা বলে, ‘সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম, আমার লাগেজ রেখে যাওয়ার পরও ওরা ধরতে পেরেছে, পাখি হাওয়া।
-তারপর? সুমনা কি আবার ফিরে গিয়েছিলে? – গৌরীই প্রশ্নটা করে বসে।
-সারটেইনলি নট। – অনুভব এবার উত্তর দেয়। – ও তখন আমাদের আওতায় ঢুকে পড়েছে। তবু ফোনটা পেয়ে সুমনা বলে, হ্যাঁ আসছি এখুনি।
তবে এমনই ভাগ্য সে সময় হোটেলে রুম খুঁজতে, সুমনার বয়সীই একটি মেয়ে হিল কুইনে আসে। রুম নেই শুনে তড়িঘড়ি সে বেরিয়েও যায়। যাকে সুমনা খুনের বরাত দেওয়া ছিল, সে বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছিল হোটেলের বাইরে। তার বোধহয় একটু বেশিই তাড়া ছিল। মেয়েটিকে রিসেপশন থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেই বন্দুক ফুটিয়ে দিল। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল ওর শরীর। রটে গেল, সাংবাদিক সুমনা মৃত, আততায়ীর হাতে। তবে ওই অচেনা মেয়েটির জন্য কিন্তু আমার আজও খারাপ লাগে। কে জানে, কার ঘরের মেয়ে এমন বেঘোরে প্রাণ হারাল।
নিঃশ্বাস চেপে সবাই শুনে চলেছে অনুভবের কথা।
– ব্যস, এই হল আমাদের সুমনা কাহিনী। তবে স্যার, আজ একটা সত্যি কথা অকপটে স্বীকার করছি, সুমনাকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে আমারও একটা স্বার্থ ছিল। আমি জানতাম, ওর থেকেই পাওয়া যাবে বাবাজীর ভেতরকার অনেক কথা। যেগুলো পদ্মা মারফৎ সুমনার কাছে চলে এসেছিল। বাবাজী যে প্রসথেটিক মেক আপ করে ঘুরে বেরায়, এটাও ওর কাছ থেকেই জানা। তবে মোস্ট ইমপর্টেন্ট ইনফরমেশন ছিল, গৌরীর খোঁজে যে বাবাজী এবার কলকাতায় ছুটে আসছে, এটা আমায় সুমনাই জানায়। সো, – অনুভব আবার হাসে, -গৌরীর একটা কথা আমি সংশোধন করে দিতে চাই, ব্যাক স্টেজ থেকে শুধু আমি নই, গৌরীর এই জয়ের পেছনে সুমনার অবদানও যথেষ্ট’।
ডিজি সাহেব দাঁড়িয়ে পড়লেন চেয়ার ছেড়ে, ‘ইট’স আন বিলিভেবল’।
ঠিক এই সময় বাইরের কোনও কোলাহলের টুকরো টাকরা শব্দ ভেতরে ঢুকে আসে। গেটের সিকিউরিটির সঙ্গে কারোর বুঝি বচসা বেঁধেছে।
ডিজি সাহেব বিরক্ত, ইশারায় তাঁর এক অফিসারকে পাঠালেন ব্যাপার দেখতে। হন্তদন্ত হয়ে নাদুস নুদুস অফিসারটি ছুটল বাইরে, পিছু পিছু আরও অনেকে। একটু পরেই হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে আসে সেই স্থূলকায় লোকটি।    ডিজি সাহেবকে ফিসফিস করে বলে, ‘একজন স্বামী স্ত্রী সঙ্গে দুটি ছোট ছোট মেয়ে, ভেতরে ঢোকার জন্য পীড়াপীড়ি করছে।  সিকিউরিটিও নাছোড়, কিছুতেই ওদের ঢুকতে দেওয়া হবে না।  এই নিয়েই গন্ডগোল, স্যার। মেয়ে দুটো এখন কান্নাকাটি জুড়েছে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে।
কথাটা আস্তে বললেও পাশে বসা গৌরীর কানে পৌঁছে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘স্যার, ওদের প্লিজ অ্যালাউ করা যাবে? আমার চেনা পরিবার, ওরা আমার কাছেই এসেছে’।
গ্রিন সিগনাল পেয়ে বাবা মায়ের হাত ধরে গুটি গুটি এগিয়ে এল আশা ঊষা। দূর থেকেই ঊষা একটা কাগজ তুলে  হাত নাড়াচ্ছে, ‘সুন্দর ছবি এঁকে এনেছি, আন্টি। ওটা তোমার প্রাইজ। মা বলেছে, দিদির থেকেও আমারটা সুন্দর’।
ডিজি সাহেব হাসছেন, ‘হু আর দে?’
অনুভব হাসি মুখে বলে, ‘আমাদের মেয়ে। আশা ঊষা। ওদের কি স্টেজে ডাকতে পারি?’
ফ্রিল দেওয়া ফ্রক ওদের পরনে, টুকটুক করে উঠে এল  স্টেজে। এত আলোর ঝলকানিতে আশা একটু থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেও,  ঊষা স্মার্ট ভঙ্গীতে ছুটে এসে হাত বাড়িয়ে ছবি দিল গৌরীর হাতে।
দর্শক মহল থেকে আবার এক প্রস্ত হাততালি উঠল।
****
অনুষ্ঠান যখন শেষ হল, ঘড়িতে অনেক বেজে গেছে।   অনুভব আশা, ঊষা আর ওর মা বাবাকে গাড়িতে তুলে নেয়। সুমনাকে লিফট দেওয়ার কথা বলতেই, ও বলে, ‘আমার বাড়ি নর্থ, তোমরা যাবে সাউথ। একেবারে উল্টো রাস্তা। আমি বরং একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিচ্ছি’।
যাওয়ার আগে গৌরীর হাতটা অনেকক্ষণ ছুঁয়ে রইল ও। একসময় ফিসফিস করে বলে, ‘একটা কান্ড হয়েছে জানো। ভিকি আমেরিকা থেকে আসছে সামনের মাসে’।
-ওমা, তাই! ভালো তো। তা এতে কান্ডের কী হল?
-ও নাকি, বরাবরের মতো এখানেই এবার সেটেলড করবে, বোঝ কেমন পাগল। আর ওই বিয়েটাও ক্যানসেল করে দিয়েছে। বলে, এই ভাল, কেমন পাখি পাখি জীবন। বাঁধন ছাড়া। – বলতে বলতে সুমনা হেসে চলে।
গৌরী ভাল করে নজর করে সুমনাকে। হাসির ছটা যেন ওর সমস্ত শরীর দিয়ে বেয়ে নামছে। আহা, বেশ, বেশ।
ওদের গাড়ি ছেড়ে দেয়। আশা, ঊষার মা তাদের বাড়ির সামনে এসে একেবারে নাছোড়বান্দা, একবার ওদের নতুন ভাড়া বাড়িটা দেখে যেতে হবে। বহু বুঝিয়ে সুজিয়ে তবে ছাড় পাওয়া গেল।
গাড়ি এবার তাদের বাড়ির পথে চলতে শুরু করে। হঠাৎ এক অদ্ভুত আবদার অনুভবের গলায়, ‘যাবে একবার গঙ্গার ঘাটে? রাতের নদীর ছপছপ শব্দ কতদিন শোনা হয়নি। চল না’।
-চল। – গৌরী রাজি হতেই গাড়ি দিক পরিবর্তন করল। গঙ্গার পার তখন নিস্তব্ধ, নিঝুম। দূরে দাঁড়িয়ে একটা জাহাজ। অনুভব হেসে বলে, ‘ওই জাহাজটা কার জন্য অমন অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকে, বলো দেখি?’
গৌরী হেসে বলে, ‘চলো, জল সাঁতরে ওর কাছে গিয়ে জেনে আসি বরং’।
কতগুলো নোঙর বাঁধা নৌকা সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে পারে। একটা নৌকোয় শুধু টিমটিমে বাতি দেখা যায়। ভেতরে বসে মাঝি একমনে গান গেয়ে চলেছে। মাঝির গানে এত কেন মন কেমন করা সুর থাকে?
অনুভব হাসল, ‘আজ, এখানে বসে বসেই রাত কাবার করে দিলে কেমন হয়?’
গৌরী হাসে, ‘বোস, রাত শেষ হতে তো বেশি বাকিও নেই’।
একসময় সত্যি রাত ফুরিয়ে এল। পাখিরা জেগে ওঠে একে একে উড়াল দিচ্ছে আকাশে। দু একটা নৌকো দুলে উঠে জলে ভেসে গেল। জাহাজের ভোঁ পড়ল। জলে সেই ভোঁ এর কম্পন ছড়িয়ে পড়ল।
গৌরীর হাতের ওপর অনুভবের হাত। ও বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেকদিন পর এত কাছ থেকে গৌরী ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনল। গৌরী আলতো চাপ দেয় ওর হাতে, ‘চলো, এবার উঠি। রাত শেষ, নতুন ভোরটাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাই’।
অনুভব ঘুম চোখে চারিদিক তাকায়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘হ্যাঁ চল, এবার বাড়ি ফেরা যাক’।

সমাপ্ত

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।