হিমঘরে পড়ে থাকা শীতল, প্রাণহীন শরীরটাকে এ্যাম্বুলেন্সে তুলতে তুলতে বেলা প্রায় গড়িয়ে গেল দুপুর অবদি। যেতেও হবে শহর ছেড়ে বহুদূরের পথ মাড়িয়ে গ্রামে। অবসাদে হাই তুলল রেজা। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে খুব। ঘুম ভেঙেছে বেলা করে, বারোটার দিকে প্রায়। কাল রাতে বাংলাটা একটু বেশিই গিলে ফেলেছিল সম্ভবত। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে ঠাওর করতে পারেনি একদম। ঘুম বেশি হলে শরীরটা বড্ড ভারী লাগে তার। অবসাদ ভর করে মনে। ক্লান্তি। চোখ-মুখও ফুলে যায় বেঢপ। গাড়ির ভিউ মিররে আড়চোখে আরেকবার নিজেকে দেখল সে। কিম্ভুত দেখতে লাগছে। নিজের অজান্তেই একবার উল্টোদিকের বিল্ডিংটার দিকে চোখ গেল তার। ইতস্তত দু চারজনকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ লোকের হাতে খালি টিফিন ক্যারিয়ার। অসুস্থ স্বজনের জন্য খাবার বয়ে এনেছিল তারা। খাইয়ে-দাইয়ে, দুঃখ-সুখের আলাপ সেরে ধীর, স্খলিতপায়ে ঘরে ফিরছে এখন। কোনো তাড়া নেই। ব্যস্ততার কোনো লক্ষ্মণ নেই। হাসপাতালের এ সময়টা কেমন নিষ্প্রাণ, নিষ্প্রভ, ম্লান। নার্স আর ইন্টার্নি ডাক্তারদের ছুটাছুটি আর আয়াদের ঢিমেতালে ফ্লোর পরিষ্কারের ব্যস্ততাটুকু বাদ দিলে এই বিল্ডিংটায় এ সময় কেমন এক ঝিমুনি নেমে আসে। রোগিদের অধিকাংশই দুপুরের খাওয়া সেরে ঝিমোয়। তাদের সাথে থাকা স্বজন হয়তো পাশের বেডের রোগির স্বজনের সাথে নিচুস্বরে গল্প জমায় নয়তো বারান্দায় চেয়ার টেনে বসে উদাস চোখে আকাশ দেখে। রোগ-শোকও এই শেষ দুপুরের বেলায় খানিকটা থমকে যায় যেন এখানটাতে এসে। না। কেয়া বা অন্য কাউকে দেখা গেল না বাইরে। স্বস্তিতে বড় আরেকটা হাই তুলল রেজা। চেহারার যা ছিরি হয়েছে এখন, কেয়া বা তার সঙ্গী কারও সঙ্গে দেখা না হলেই বাঁচে সে। এ্যাম্বুলেন্সে লাশটা তুলে সেই যে হাওয়া হয়ে গেছে লোকদুটো আর টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না তাদের। লাশের পাশে মধ্যবয়সী এক নারী ঘোমটা মাথায় বসে আছে সেই থেকে। মাঝে মাঝে ক্ষীণ একটু কান্নার মতো আওয়াজ করছে নাকী সুরে। কান্নাটা ততটা গভীর নয়, যতটা চেষ্টাকৃত। রেজার অন্তত তেমনই মনে হল। মনে হতেই খারাপ হল মনটা। জগতের বেশ্যাবৃত্তির শেষ নেই। মৃত্যুর পর নিখাদ একফোঁটা চোখের জলের নিশ্চয়তাও নেই এখানে। তাতেও স্বার্থের দুর্গন্ধময় ক্লেদ, অভিনয়ের ঘৃণ্য পঙ্ক। ভাবনাটা মাথায় আসতেই হিমঘর থেকে এনে এ্যাম্বুলেন্সে শুইয়ে রাখা হিম, নিথর শরীরটার দিকে তাকিয়ে করুণার্দ্র হল রেজা। বেচারা। বয়স্ক লোকটা। এ বয়সে সম্ভবত ব্যক্তি নিজে ছাড়া বাকি সবাই মনে মনে অপেক্ষা করে বয়স্ক লোকের মৃত্যুর জন্য। মৃত লোকটার সাথের লোকদুটো লোকটার সম্পত্তি নিয়ে নিজেদের ভেতর কথা বলছিল চুপিসারে, শুনেছে রেজা। শুনে মনে মনে হেসেছে একচোট। কী বোকা এই মানুষগুলো! কবরে লাশ নামাতে নামাতে, চিতায় দাহ করতে করতেও তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়ে ভাবে, পরবর্তীকালের পরিকল্পনায় মগ্ন হয়। অথচ মৃত্যু হয়তো ওঁত পেতে আছে খুব নিকটে, ছোবল দেবে যে কোনো মুহূর্তে, সেটা বুঝতে পর্যন্ত পারে না, ভাবেও না। অবশ্য রেজা নিজেও চলে ‘খাও দাও ফূর্তি করো’ নীতিতে। তবু জীবনের এই স্বার্থপরতা, এই বিভৎস কপটতা, বড় অসহ্য লাগে তার। মানুষের মনের এই বেশ্যাবৃত্তিতে বিবমিষা জাগে খুব। অনেকক্ষণ পর লোকদুটো এল। এসেই গাড়ি ছাড়ার তাড়া লাগল। হাই তুলতে তুলতে গাড়িতে স্টার্ট দিল রেজা। আলস্য আজ পেয়ে বসেছে তাকে। কোথাও পৌঁছনোর তাড়া নাই তার ভেতর, ফেরারও। ধীরে সুস্থে গাড়ি চালাল সে। লোকদুটো কয়েকবার জোরে চালানোর তাড়া দিল, কান দিল না রেজা। অতঃপর নিজেদের ভেতর গল্পে মগ্ন হল লোকদুটো। কান পেতে শোনার চেষ্টা করল রেজা। ফিসফাস কথা বলছে, ড্রাইভিং সীট থেকে স্পষ্ট শুনতে পেল না রেজা। ফিসফাস আওয়াজ ছাপিয়ে মাঝে মাঝে খিকখিক হাসির শব্দ কানে এল শুধু। গা গুলাল হঠাৎ। স্বজনের মৃতদেহের পাশে বসে জীবনের গল্পে বুঁদ হয়ে হাসা এমন বদখত হাসি বড় অরুচিকর লাগল তার। যদিও তেমন রুচিশীল ব্যক্তি সে নয় আদৌ। আন্ডার মেট্রিক রেজাউল ইসলাম সে। লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সের নাদান ড্রাইভার। নেহাত চেহারা সুরত ভালো বলে কেয়াদের মতো দু চারজন ঘুরে তাকায়। নইলে তার মতো ছোটলোকের দিকে কে আর নজর দিত! যতই তার বাপ বড় জোতদার হোক গ্রামের, যতই থাক তার অভিজাত পারিবারিক ইতিহাস আর বখে যাওয়ার করুণ কাহিনি তবু কার অত সময় আছে সেসব অতীত কাসুন্দি ঘাঁটার!
গাড়িটা সাইড করল রেজা। লোকদুটোকে অপেক্ষার ইঙ্গিত করে গাড়ি থামিয়ে নামল ধীরে। ফাঁকা রাস্তার উল্টোপাশে গিয়ে বসল মাথা নিচু করে। বমি করল সময় নিয়ে। শরীরটা খারাপ লাগল খুব। ইচ্ছে হল হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকে চুপচাপ। চোখ বন্ধ করে ভাবল। মায়ের মুখটা ভেসে উঠল হুস করে। ফিসফিসিয়ে ডাকল রেজা, মা! মা!
বহুকাল আগে মারা যাওয়া মা সাড়া দিল সাথে সাথেই। বলল, কী হইছে বাজান? কী হইছে তোমার?
স্পষ্ট মায়ের কণ্ঠটা শুনতে পেল রেজা। কপালে পেল শীতল হাতের স্পর্শ । চমকে চোখ খুলল রেজা। কেউ নেই। সামনে রাস্তার পাশে গোরস্থান। প্রাচীরঘেরা, ছায়াময়, সুনসান, নীরব। জায়গাটা হঠাৎ ভীষণ পছন্দ হল তার। ভাবনাটা তখনই চলকে উঠল মনের ভেতর। এত যুদ্ধ, এত সংগ্রাম ছেড়ে এমন কোনো স্থায়ী ঠিকানায় শান্তিতে ঘুমিয়ে গেলেই হয়। তাহলে আর কোনো অপ্রাপ্তির কাঁটা, হতাশার হুল, বঞ্চনা আর অপমানের তীর বুকের ভেতর অকারণ বিঁধবে না এসে যখন তখন, মনের ভেতর অশান্তির আগুন জ্বলবে না বহ্নিমান চিতা হয়ে, ভাবল রেজা নিজের মনেই। বিড়বিড় করে কথাগুলো নিজেকেই শোনাল নিজে। হঠাৎ খেয়াল হল পেছনে গাড়িতে বসা লোকদুটো ডাকছে তাকে। উঠল রেজা। রাস্তার পাশের চাপকল চেপে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। কুলি করল সময় নিয়ে। মাথায় জল ঢালল খানিকক্ষণ। রাস্তা পার হতে গিয়ে টের পেল শরীর টলছে তার। জ্বর আসছে সম্ভবত, ভাবল রেজা। ভাবতে ভাবতেই জ্ঞান হারাল সে। রাস্তায় টলে পড়ল শরীর। ঠিক তখনই উল্টোদিক থেকে ধেয়ে এল একটা মালবাহী ট্রাক। জ্ঞানহীন রেজার কানে পৌঁছল না ট্রাকের শব্দ।