সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শিল্পী নাজনীন (পর্ব – ১০)

বেনু মশলাঘর

রু‌মে ঢু‌কে ব‌্যাগটা বিছানায় ছু‌ড়ে ফে‌লেই ধপ ক‌রে ব‌সে পড়ে কেয়া। রা‌গে গজগজ কর‌তে কর‌তে কণার দি‌কে তা‌কি‌য়ে বলে, তুই এখনও এখা‌নেই ব‌সে ব‌সে ঝিমা‌চ্ছিস? শরীর ঠিক হয় নাই তোর?
কণা হাসে মৃদু। ঠোঁ‌টের কো‌ণে দুষ্টু‌মি ঝু‌লি‌য়ে বলে, মেজাজ খারাপ ক‌্যান তোর? ডে‌টিং কেমন হল?
ধুস! -‌বির‌ক্তি‌তে কপাল কুঁচ‌লে ফেলে কেয়া। কণার দুষ্টু‌মিভরা হা‌সি‌তে পি‌ত্তি জ্ব‌লে তার। ধম‌কের সু‌রে বলে, ফাজলা‌মি ক‌রবি না তো! বা‌লের ডে‌টিং! হারামজাদার ব‌্যাটারি নষ্ট!
মা‌নে? -‌বেকু‌বের ম‌তো কেয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে প্রশ্ন করে কণা।
কেয়া তে‌লে‌বেগু‌নে জ্ব‌লে ওঠে অারও। কণার দি‌কে বিষদৃ‌ষ্টি‌তে তা‌কি‌য়ে বলে, বো‌ঝো না, না? ক‌চি খু‌কি? ফিডার খাও? হারামজা‌দি! ন‌্যাকা‌মি ক‌রিস অামার সা‌থে? ঐ হারামজাদার মে‌শিন নষ্ট, খাওয়ার অা‌গেই ব‌মি ক‌রে, বু‌ঝিস নাই এখনও?
খা‌নিকক্ষণ কেয়ার দি‌কে ফ‌্যাল‌ফে‌লি‌য়ে তা‌কি‌য়ে থে‌কে হি‌হি হা‌সি‌তে ভে‌ঙে পড়ে কণা। তাসনূভা নি‌জের টে‌বি‌লে ব‌সে কণা অার কেয়ার কথা কান পে‌তে শুন‌ছিল এতক্ষণ, বই‌য়ে চোখ রে‌খে কান খাড়া রে‌খে‌ছিল এ‌দি‌কে, কণার হা‌সির সা‌থে সে-ও হা‌সির তুব‌ড়ি ফোটায় এবার। কেয়া রে‌গে যায় অারও। ধম‌কে ব‌লে, একদম হাস‌বি না বল‌ছি। গা ঘিন ঘিন কর‌ছে অামার। এই শী‌তে অামা‌কে এখন গোস‌ল কর‌তে হ‌বে। হারামজাদা ব‌মি ক‌রে‌ছে গা‌য়ে!
ঠিকই ক‌রে‌ছে! ক জ‌নের সা‌থে ডে‌টিং কর‌তে হয় তোর? এই তো সকা‌লে বোধ‌নের সা‌থে ডে‌টিং কর‌লি, বি‌কে‌লে অাবার কি‌সের ডে‌টিং তোর? অার ঐ হারামজাদা রেজার সা‌থে ডে‌টিং কী অাবার? মানুষ অার পাস না খুঁ‌জে? ড্রাইভারের সা‌থে ডে‌টিং, ছি! -ফুট কা‌টে তাসনূভা।
তোরা সব ব‌্যাক‌ডে‌টেড একেকটা, এখনও বা‌লের শ্রেণি‌বৈষম‌্য নি‌য়ে প‌ড়ে অা‌ছিস! ড্রাইভার হ‌লে কী জাত চ‌লে যায় মানু‌ষের? যত্তসব! -‌ফোঁস ক‌রে ও‌ঠে কেয়া। ‘‌শ্রেণি‌বৈষম‌্য’ শব্দটা ঠোঁট সরু ক‌রে এমন ভ‌ঙ্গি‌তে উচ্চারণ ক‌রে সে যে, কণা অার তাসনূভা অারও এক‌চোট হা‌সে। দে‌খে রে‌গে‌মে‌গে তোয়া‌লে হা‌তে গোস‌লের জন‌্য রুম থে‌কে বের হ‌য়ে যায় কেয়া। কণা অার তাসনূভা‌কে শু‌নি‌য়ে শু‌নি‌য়ে ব‌লে, ঘ‌রের শত্রু বিভীষণ!
কণা বা তাসনূভা, কেউই পাত্তা দেয় না সেস‌ব। তারা হা‌সে। তাসনূভা হাস‌তে হাস‌তে কেয়ার মত ঠোঁট সরু ক‌রে ব‌লে ‘শ্রে‌ণি‌বৈষম‌্য’, ব‌লে অাবার হি‌হি হা‌সে। হা‌সি থা‌মি‌য়ে তাসনূভা ব‌লে, ওর মাথায় সমস‌্যা অা‌ছে, বুঝ‌লি?
কচু অা‌ছে। -‌ঠোঁট উ‌ল্টে তাসনূভা‌কে নাকচ ক‌রে কণা। ব‌লে, ও একশজ‌নের সা‌থে ডে‌টিং কর‌বে, প্রেম কর‌বে, শো‌বে, তারপর দে‌খে-শুনে একটা ভদ্রগো‌ছের ক‌্যা‌রিয়া‌রিস্ট ছে‌লে‌কে বি‌য়ে কর‌বে, সু‌খেও থাক‌বে দে‌খিস। অামা‌দের ম‌তো বোকা‌-সোকা যারা তারা-ই পস্তাব প‌রে। অামরা অা‌বে‌গের কা‌ছে পরা‌জিত হই প্রতি‌নিয়ত, কেয়া হয় না। ও হি‌সেব ক‌ষে চ‌লে, অা‌বেগ‌কে পাত্তা না দি‌য়ে অানন্দ কুড়ায় প্রতি‌দিন।
হু। ঠিক ব‌লে‌ছিস। -ব‌লে থম ধ‌রে ব‌সে থা‌কে তাসনূভা। ভা‌বে। দু হা‌তের তালু‌তে থুত‌নি রে‌খে ব‌সে থাকা তার পানপাতা মু‌খের দি‌কে মুগ্ধ চো‌খে তা‌কি‌য়ে থা‌কে কণা, পলক প‌ড়ে না চো‌খে। অাচমকা ঝট ক‌রে কণার দি‌কে চোখ পড়‌তেই ফিক ক‌রে হা‌সে একগাল। ভ্রু না‌চি‌য়ে ব‌লে, কী রে?
কিছু না। -‌চোখ স‌রি‌য়ে নেয় কণা। অনুচ্চ, স্পষ্ট স্ব‌রে ব‌লে, তো‌কে দে‌খি!
তাসনূভা হা‌সে। ব‌লে, বিপু অা‌সছিল বি‌কে‌লে? দেখা ক‌রছিস?
না রে। বের হ‌তে ই‌চ্ছে করতে‌ছিল না একদম। বিপু‌কে ফােন ক‌রে অাস‌তে নি‌ষেধ ক‌রে দিলাম সেজন‌্য।
বিপু কিছু বলল না?
জান‌তে চাই‌ছিল বারবার। বল‌ছি শরীর খারাপ, বের হব না অাজ।
হু। বেচারা। কেন যে ওর সা‌থে এমন কর‌তে‌ছিস অাজকাল!
অামার বিপুর সা‌থে দেখা কর‌তে ই‌চ্ছে ক‌রে না অাজকাল। কেমন যেন অস্ব‌স্তি হয়, বিরক্ত লা‌গে খুব। -ক্লান্ত, হতাশ ক‌ণ্ঠে উত্তর দেয় কণা।
তাসনূভা কাঁধ ঝাঁ‌কি‌য়ে বই‌য়ে ম‌নো‌যোগ দেয় অাবার। কণা প্রসঙ্গ চাপা দি‌তে ব‌লে, তোর কী খবর? অাজ এত তাড়াতা‌ড়ি ফি‌রে এ‌লি যে?
অার ব‌লিস না! গেলাম বড় মামার বাসায় অাজ সারা‌দিন থাকব ভে‌বে। গি‌য়ে দে‌খি মামার বাসায় এত্ত গেস্ট। বিরক্ত লাগ‌তে‌ছিল খুব। অামার ভীড়ভাট্টা সহ‌্য হয় না, জা‌নিস তো। তাই দুপু‌রে খে‌য়েই চম্পট দিলাম। এ‌সে অবশ‌্য ভালোই হল, এসাইন‌মে‌ন্টের কাজটা গু‌ছি‌য়ে নিলাম অ‌নেকটা। তোর এসাইন‌মে‌ন্টের কদ্দুর?
অামারও শে‌ষের দি‌কে। অাস‌লে এসাইন‌মেন্ট যতই প‌রিপা‌টি ক‌রে তৈ‌রি ক‌রি, তা‌তে তো লাভ নাই তেমন। একা একা তো ঐ ব‌্যাটা লুচুর চেম্বা‌রে যে‌তে পারব না, গতবা‌রের ম‌তো এবারও কুড়ির ভেতর অাট দি‌য়ে রাখ‌বে, দে‌খিস।
সে অার বল‌তে! অামারও তোর ম‌তোই দশা। অথচ কেয়া কেমন তরত‌রি‌য়ে পাশ ক‌রে যা‌চ্ছে দেখ! ও যে কী ‌চি‌কিৎসা সেবা দে‌বে মানুষ‌কে, অাল্লা মালুম!
দে‌বে দে‌বে। চি‌কিৎসা না দিক প্রেম দি‌য়ে ভা‌লো ক‌রে তুল‌বে, দে‌খিস! মানবসেবায় জান দি‌য়ে দে‌বে কেয়া, মাদার তে‌রেসা হ‌য়ে যা‌বে একসময়!
হি‌হি হা‌সি‌তে গ‌ড়ি‌য়ে প‌ড়ে তাসনূভা। মাদার তে‌রেসা! হি‌হি‌হি! ভালো ব‌লে‌ছিস তো! হি‌হি‌হি! মাদার তে‌রেসা! বেচারা মাদার! তুই কেয়া‌কে তার সা‌থে তুলনা ক‌রে‌ছিস জান‌লে বেঁ‌চে থাক‌লে বেচারা শো‌কে সুইসাইড করত নির্ঘাত! -হাস‌তে হাস‌তে চো‌খে জল এ‌সে যায় তাসনূভার। হা‌তের তালু‌ত জল মো‌ছে সে। ততক্ষ‌ণে কেয়া ফি‌রে‌ছে গোসল সে‌রে। তাসনূভা‌কে তখনও হাস‌তে দে‌খে কূট চো‌খে তাকায়, চোখ পা‌কি‌য়ে ব‌লে, ঐ ছেম‌ড়ি, তুই এখনও কেলা‌চ্ছিস! পড়া‌শোনা নাই তোর!
কেয়ার খবরদা‌রি‌তে হা‌সি বা‌ড়ে তাসনূভার। হাস‌তে হাস‌তে ব‌লে, জি মাদার! এই তো পড়‌তে বসব এখন।
কপাল কুঁচ‌কে কেয়া ব‌লে, মাদার মা‌নে কী রে হারা‌মি? অা‌মি তোর কোন জ‌ন্মের মাদার?
হি‌হি। কণা বল‌তে‌ছে তুই না‌কি চি‌কিৎসাসেবা দি‌য়ে না পার‌লেও প্রেম‌সেবা দি‌য়ে রো‌গি‌দের সা‌রি‌য়ে তুল‌বি, চি‌কিৎসা‌বিজ্ঞা‌নে তোর নাম না‌কি স্বর্ণাক্ষ‌রে লেখা থাক‌বে! তুই হ‌বি অামা‌দের ডাক্তার সমা‌জের মাদার তেরেসা! হি‌হি‌হি!
ব‌দের বদগুলা সব! সারাক্ষণ অামার পেছ‌নে না লাগ‌লে শা‌ন্তি নাই তো‌দের, না? কাল শওকত স‌্যা‌রের এসাইন‌মে‌ন্ট পেপার জমা দি‌তে হ‌বে হুঁশ অা‌ছে তো‌দের? রে‌ডি ক‌রে‌ছিস সব? -‌কেয়ার ক‌ণ্ঠে শাসন।
ই‌য়েস মাদার! উই অার রে‌ডি ফর হিম! প্লিজ ট্রাই টু ডু সাম‌থিং ফর অাস!
ফাজলা‌মি ক‌রিস না তো! -‌বিরক্ত হয় কেয়া। সারা‌দি‌নের সব‌কিছু মি‌লি‌য়ে মেজাজ এম‌নি‌তেই সপ্ত‌মে চ‌ড়ে অা‌ছে তার।
ফাজলা‌মি না রে দোস্ত, স‌ত্যি বল‌ছি, অামা‌দের একটু হেল্প কর না, প্লিজ! -কণা ব‌লে এবার। ক‌ণ্ঠে অসহায়ত্ব।
কেয়া পাতলা একটা শাল জ‌ড়ি‌য়ে নেয় গা‌য়ে, লম্বা, কা‌লো চুল অাঁচ‌ড়ে, তা‌তে তোয়া‌লে পেঁচি‌য়ে চু‌ড়ো ক‌রে বাঁ‌ধে, অদূ‌রে নি‌জের বিছানায় উ‌ঠে অারাম ক‌রে বস‌তে বস‌তে ব‌লে, কী ব‌লিস তোরা মাথামুণ্ডু বু‌ঝি না। অা‌মি কেম‌নে হেল্প করব তো‌দের? অামার নি‌জের এসাইন‌মে‌ন্টেরই তো খবর নাই কো‌নো! কিছুই ক‌রি‌নি এখনও!
দোস্ত, অামা‌দের এসাইন‌মেন্টটাই তুই ফ‌টোক‌পি ক‌রে নে, কো‌নো সমস‌্যা নাই, কিন্তু অামা‌দের তুই হেল্প কর, প্লিজ!
সে না হয় নিলাম, কিন্তু হেল্পটা কেম‌নে করব সেইটা ‌তো বলবি! -‌কেয়ার ক‌ণ্ঠে অ‌ধৈর্য।
শওকত স‌্যা‌রের সা‌থে তো তোর খা‌তির অা‌ছে বেশ, তুই একটু ম‌্যা‌নেজ ক‌রার চেষ্টা নে না দোস্ত, গতবার এসাইন‌মে‌ন্টে অামা‌দের দুজন‌কে কু‌ড়ি‌তে অাট দি‌য়ে‌ছে জা‌নিস তো!
ও ব‌্যাটা লুচু‌কে কেম‌নে ম‌্যা‌নেজ করতাম অামি?ব্যাটা বদ। গতবার এসাইন‌মে‌ন্টের সময় অামা‌রে একা চেম্বা‌রে ডে‌কে বু‌কে হাত দি‌ছিল, বল‌ছি না তো‌দের?
এবারও ডা‌কবে, না গে‌লে ফেল ক‌রি‌য়ে দে‌বে, কী কর‌বি তখন? -এক‌যো‌গে ব‌লে কণা অার তাসনূভা।
কেয়া ভা‌বে গা‌লে হাত দি‌য়ে। ব‌লে, কাউ‌কে না‌লিশ ক‌রে লাভ হ‌বে না, উ‌ল্টো বিপ‌দে পড়ব অারও, কা‌কে কা‌কের মাংস খায় না এখা‌নে। কী করা যায় দে‌খি! ভাব‌তে দে!
ভাব দোস্ত! ভা‌লো ক‌রে ভাব! অামা‌দের কথাও একটু ভা‌বিস প্লিজ!
কেয়া কখনও শুধু নি‌জের জন‌্য ভা‌বে না, বুঝ‌লি? ভাব‌লে সবার জন‌্য ভাবব, চিন্তা ক‌রিস না!
সে অার বল‌তে! তুই হ‌চ্ছিস অামা‌দের মাদার তে‌রেসা, তুই সবার কথা না ভাব‌লে অার কে ভাব‌বে বল!
অাবার ফাজলা‌মি! -‌চোখ পাকায় কেয়া, ক‌ণ্ঠে শাসন।
হি‌হি হা‌সে কণা অার তাসনূভা, কেয়াও যোগ দেয় তা‌তে। বড্ড সরল মে‌য়েটা, ভা‌লোও। তবু কেন যে এমন সব বোকা‌মি ক‌রে বেড়ায়! -ভা‌বে কণা অার তাসনূভা। অাড্ডায় মে‌তে ও‌ঠে তিনজ‌নে। অাড্ডা শেষে পড়‌তে ব‌সে‌ যে যার মত। পড়ায় মন ব‌সে না কেয়ার। সন্ধ‌্যা থে‌কে মনটা অ‌স্থির। মার শরীর খারাপ, মে‌হেরবানু বা‌ড়ি থে‌কে পা‌লি‌য়ে‌ছে, বিপু দেখা কর‌তে না পে‌রে রে‌গে টং হ‌য়ে অা‌ছে, অার রিফা‌তের জন‌্য সে নি‌জে ম‌নে ম‌নে অধীর হ‌য়ে উঠ‌ছে ক্রমশ, একসা‌থে এই এতগুলো ধাক্কা সামাল দি‌তে হাঁ‌পি‌য়ে উঠ‌ছে মন, পড়ায় স্থির হ‌তে পার‌ছে না কিছু‌তেই। অানম‌নে বই‌য়ের পাতা উল্টায় কণা, অাজ কিছুই পড়া হ‌বে না তার, বু‌ঝে হতাশ মাথা না‌ড়ে।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।