গারো পাহাড়ের গদ্যে এস এম শাহনূর (পর্ব – ১)

কসবার অখিলচন্দ্র দত্ত ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক
অবিভক্ত ভারতবর্ষে কুমিল্লার খ্যাতনামা রাজনীতিক কংগ্রেস নেতা অখিলচন্দ্র দত্ত। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলাধীন চারগাছ গ্রামে তাঁর জন্ম।তিনি এক সময় ভারতীয় বিধান সভার স্পিকার ছিলেন।
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি পরিবারের সাথে অখিলচন্দ্র দত্তের ছিল এক রসালো বন্ধন।কবি ও কবি পরিবারের সাথে অখিলচন্দ্র দত্তের এ সম্পর্ক একজন সাহিত্যপ্রেমী হিসাবে আমাকে আবেগতাড়িত করে।ব্রাহ্মণবাড়িয়া তথা কসবাবাসীকে গৌরবান্বিত করে।শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও সমগ্র বিশ্বের রবীন্দ্র গবেষকদের কাছে ‘অখিলচন্দ্র দত্ত’ নামটির মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক অনন্য পরিচয় ফুটে উঠে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তির পর তিনি হয়ে উঠেন বিশ্বকবি। পৃথিবীর নানা প্রান্তে তাঁর ডাক পড়ে।তাঁর মুখের কথা ও বক্তৃতা শোনার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ পত্র আসতে শুরু করে। বছরের পর বছর ঘুরেঘুরে শুনিয়েছেন অমিয় বানী। বিশ্বভ্রমণের অংশ হিসাবে ১৯২৬ সালে ঢাকাবাসী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রনে তিনি বাংলাদেশে আসেন।
১৯ ফেব্রুয়ারি কবি কুমিল্লায় আসেন। কুমিল্লা ‘অভয় আশ্রমে’ র প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি (পরে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী) সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৮৭-১৯৬১) কবিকে কুমিল্লায় আসার আমন্ত্রণ জানান।
কবিগুরু কুমিল্লায় আসার পূর্বে কবির কুমিল্লা সফরের ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্ভবত কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ অখিল দত্তকে তার (টেলিগ্রাম) করেছিলেন। অখিলবাবু তখন কুমিল্লায় ছিলেন না। তবে টেলিগ্রাম পেয়েই মিসেস দত্ত অভয় আশ্রমের সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে খবর দিয়ে সব জানিয়েছিলেন। অখিলবাবু কুমিল্লায় প্রত্যাবর্তন করে কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথের তারবার্তা প্রেরণের জবাবে ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬-এ কুমিল্লা থেকে একটি চিঠি লেখেন।
এই চিঠিতে জানান যে, ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাউন্সিলের সভা চলবে। তাই কবি ও তাঁর সফরসঙ্গীদের কুমিল্লায় ‘শুভাগমনের সময়’ অখিলবাবু কুমিল্লায় থাকতে পারবেন না। তবে কলকাতায় যাওয়ার আগে অখিলবাবু কুমিল্লায় কবির অনুষ্ঠানসূচি ঠিক করে যাবেন।
কুমিল্লায় রবীন্দ্রনাথের অবস্থানকালে ২১ ফেব্রুয়ারী অভয় আশ্রমে সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রী গৌরাঙ্গ মঞ্চস্থ হয়েছিল। কবি অভিনয় উপভোগ করেন। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সফর-সঙ্গীদের অখিল বাবুর দত্তবাড়িতে আপ্যায়ন করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ ও রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরেও অখিলচন্দ্রের যোগাযোগের কথা জানা যায়। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর মহাফেজখানায় (রেকর্ড রুম) ৮ জানুয়ারি ১৯৪০ তারিখে অখিলচন্দ্রকে লেখা কবির একটি চিঠির সচিবকৃত অনুলিপি, ১৯৩৭-এর ১৪ সেপ্টেম্বর সিমলা থেকে শান্তিনিকেতনে প্রেরিত একটি এবং ১৯৪১-এর ৯ মে কুমিল্লা থেকে বোলপুরে প্রেরিত আরেকটি টেলিগ্রাম রক্ষিত আছে।
প্রথম তারে অখিল দত্ত রথীবাবুকে বার্তা পাঠালেন, ‘Anxious poet’s health. Praying recovery.’
দ্বিতীয় তারে কবির নিকট মিসেস দত্ত ও অখিলবাবুর বার্তা, ‘Our fervent prayer for many more birthdays. India needs inspiration from you in all spheres.’
পত্র :
Legislative Council কুমিল্লা
Bengal ১০/২/২৬
প্রিয় রথীন্দ্রবাবু,
আমি আজ ৫ দিন পর এখানে আসিয়া আপনার টেলিগ্রাম পাইলাম। কিন্তু আমার স্ত্রী আপনার টেলিগ্রাম পাইয়াই অভয়াশ্রমের শ্রীযুক্ত সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে খবর দিয়া সব কথা জানাইয়াছেন। সুরেশ বাবু ইতিমধ্যে অবশ্য পত্র লিখিয়াছেন। আশা করি তাঁদের অনুরোধ রক্ষা করা অসম্ভব হইবে না।
১৬ই ফেব্র“য়ারি কাউন্সিলের মিটিং আরম্ভ হইবে। ২০শে ফেব্র“য়ারি হইতে Bengal Tenancy Amendment Bill-এর Select committee-এর মিটিং আরম্ভ হইয়া ২৭শে তারিখ পর্যন্ত চলিবে। কাজেই কুমিল্লায় আপনাদের শুভাগমনের সময় আমি কুমিল্লায় থাকিতে পারিব না। ইহা আমার পক্ষে নিতান্ত ক্ষোভের বিষয়। একথা বলাই বাহুল্য। আশা করি আপনারা আমার এই অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি মার্জ্জনা করিবেন।
আমি কলিকাতায় যাওয়ার পূর্ব্বে এখানকার প্রোগ্রাম ঠিক করিয়া যাইব এবং আপনাকে পুনরায় পত্র লিখিব।
ইতি
ভবদীয়
শ্রী অখিলচন্দ্র দত্ত
➤তথ্য ঋণ:
[১] অপ্রকাশিত পত্রগুচ্ছ: ভূঁইয়া ইকবাল
কালি ও কলম এ প্রকাশিত।
☆কৃতজ্ঞতা স্বীকার :
রবীন্দ্রভবন, ড. শ্যামল চন্দ ও অর্জুন দত্ত।
লেখক: এস এম শাহনূর
কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।