গারো পাহাড়ের গদ্যে এস এম শাহনূর (পর্ব – ৪)

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য শিলাইদহের শেষ অধ্যায়
নওগাঁয় নাগর নদীর তীরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কালিগ্রাম পরগনায় ১৮৯১ সালে প্রথম এলেও সিরাজগঞ্জে করতোয়া নদীর সংযোগ খালের পাড়ে দাদা প্রিন্স দারকানাথ ঠাকুরের ১৩ টাকা ১০ আনায় কেনা শাহাজাহাদপুর কাছারি বাড়িতে যান ১৮৯০ সালে৷ প্রজাপ্রিয় রবীন্দ্রনাথ শাহজাহাদপুর কাচারি বাড়িতে শেষবারের মতো আসেন ১৮৯৬ সালে। পতিসরে কাচারি বাড়ি থেকে তিনি অসুস্থ অবস্থায় শেষ বিদায় নেন ১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাই৷
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এখানকার জমিদারির হাত বদল ঘটে। পরে ঢাকার ভাগ্যকুল জমিদার শিলাইদহের এস্টেট কিনে নেন। এরপর ১৯৫২ সালে জমিদারি প্রথা বাতিল হওয়ার পর কুঠিবাড়িসহ অন্যান্য সম্পত্তি সরকারের মালিকানায় আসে।
কুঠিবাড়ির চারিদিকে শুধু গাছ আর গাছ কিন্তু তারপরেও অনেক দূর থেকেই নজরে আসে ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত এই বাড়িটি৷ পাকা পুকুর পাড়ে বকুল ফুলের গাছ তলায় খানিকটা বসলে পদ্মার শীতল বাতাসে নিমেষেই জুড়িয়ে যাবে মন-প্রাণ-শরীর৷
সৌন্দর্যপিপাসু কবি এখানে নতুন নতুন কাব্য ও সাহিত্য চিন্তায় বিভোর থেকেছেন। পাশাপাশি সমাজ উন্নয়ন ও জনহিতকর কাজেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন।
এক জায়গায় কবির স্বীকারোক্তি— ‘বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড় ভালবাসি। … এখন পদ্মার জল অনেক কমে গেছে, বেশ কৃশকায় হয়ে এসেছে, একটি পাণ্ডুবর্ণ ছিপছিপে মেয়ের মতো নরম শাড়ী গায়ের সংগে বেশ সংলগ্ন। সুন্দর ভংগীতে চলে যাচ্ছে আর শাড়ীটি বেশ গায়ের গতির সংগে সংগে বেঁকে যাচ্ছে। আমি যখন শিলাইদহে বোটে থাকি তখন পদ্মা আমার পক্ষে সত্যিকার একটি স্বতন্ত্র মানুষের মতো, অতএব তাঁর কথা যদি কিছু বাহুল্য করে লিখি তবে সে কথাগুলো চিঠিতে লিখবার অযোগ্য মনে করা উচিৎ হবে না। ’ শিলাইদহের গ্রাম সম্পর্কে এক জায়গায় লিখেছেন— ‘এতদিন সামনে ঐ দূর গ্রামের গাছপালার মাথাটা সবুজ পল্লবের মেঘের মতো দেখা যেত, আজ সমস্ত বনটা আগাগোড়া আমার সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়েছে। ডাঙ্গা এবং জল দুই লাজুক প্রণয়ীর মত অল্প অল্প করে পরস্পরের কাছে অগ্রসর হচ্ছে। লজ্জার সীমা উপচে এলো বলে প্রায় গলাগলি হয়ে এসেছে। ’
বাংলার গ্রামের গরিব-দুঃখী, সুখ-দুঃখ কাতর মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালোবাসা ও সমবেদনা, যদিও তারা শিক্ষিত, সুসভ্য, ধনী এবং মার্জিত ছিলেন তা’ নয়। তাঁর লেখাতে এর প্রকাশ পাওয়া যায়— ‘আমার কাছে এই সব সরল বিশ্বাসপরায়ণ অনুরক্ত প্রজাদের মুখে বড়ো একটা কোমল মাধুর্য প্রকাশ পায়। বাস্তবিক এরা যেন আমার দেশজোড়া এক বৃহৎ পরিবারের লোক। এই সমস্ত নিঃসহায়, নিরুপায় নিতান্ত নির্ভরপর, সরল চাষাভূষোদের আপন লোক মনে করতে একটা সুখ আছে—এরা অনেক দুঃখ অনেক ধৈর্য সহকারে সয়েছে তবু তাদের ভালবাসা কিছুতে ম্লান হয়নি। এদের উপর যে আমার কতখানি শ্রদ্ধা হয়, আপনার চেয়ে যে এদের কতখানি ভাল মনে হয় তা এরা জানে না।
তিনি লিখেছেন —‘এখানকার প্রজাদের ওপর বাস্তবিক মনের স্নেহ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে, এদের সরল ছেলেমানুষের মতো আবদার শুনলে মনটা আর্দ্র হয়ে উঠে, যখন তুমি বলতে তুই বলে, যখন আমাকে ধমকায় ভারী মিষ্টি লাগে। ’
‘ছেলেবেলা’-য়, যেখানে তিনি শিলাইদহের উজ্জ্বল হৃদয়স্পর্শী বর্ণনার মাধ্যমে তাঁর মনের উত্তাপ সবার মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের অনেক ছোট গল্পের বিষয়বস্তু শিলাইদহ অঞ্চলের সংঘটিত ঘটনার থেকে নেওয়া হয়েছে।
তাঁর ছোটগল্প ‘জীবিত ও মৃত’-র ভিত্তি শিলাইদহের একটি ঘটনা। ‘বৈষ্টমী’ গল্পের আখ্যানবস্তু সর্বক্ষেপী নামের এক স্থানীয় বৈষ্ণবীর জীবন থেকে নেওয়া। তাঁর সোনার তরী, মনসা সুন্দরী, উর্বশী, চিত্রা, ক্ষণিকা, গীতাঞ্জলি ও গীতিমাল্যের কবিতা ও গান শিলাইদহে রচিত হয়েছিল। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমার ধারণা বাবার গদ্য ও পদ্য দু’রকম লেখার উৎসই যেন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে। এমন কোথাও আর হয়নি। এই সময় তিনি অনর্গল কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প লিখে গেছেন, একদিনের জন্যও কলম বন্ধ করেননি। ’
১৮৯১ সাল (বাংলা ১২৯৮) থেকে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প রচনার সূত্রপাত এবং তা সাময়িক ছেদ পড়লেও প্রবহমান ছিল ১৯৪০ সাল পর্যন্ত।
কথা ও কাহিনী কাব্যের গানভঙ্গ, পুরাতন ভৃত্য ও দুই বিঘার বক্তব্যে শিলাইদহের প্রভাব অত্যন্ত পরিষ্কার। প্রমথনাথ বিশীর গবেষণায় তিনি লক্ষ্য করেছেন ১৮৯২ (বাংলা ১২৯৮) থেকে রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প লেখার সূত্রপাত ঘটে। ‘ভিখারীনি’ গল্পটি বাদ দিলে তার আগে তিনটি মাত্র গল্প তিনি লিখেছেন, ঘাটের কথা ও রাজপথের কথা ১৮৮৪ সালে, আর মুকুট গল্পটি ১৮৮৫ সালে। তিনি আরও বলেছেন ১৮৯১ থেকে ১৮৯৫, (বাংলা ১২৯৮-১৩০২) এ সময়ে চুয়াল্লিশটি গল্প, সমগ্র গল্পগুছের অর্ধেকের কিছু বেশি, প্রায় প্রত্যেক মাসে একটি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধনা পত্রিকার জন্য লেখা হয়েছে। এই কয়েক বছর সোনার তরী ও চিত্রা কাব্য রচনার সময়। তিনি আরও লক্ষ্য করেছেন ১৮৯৮ (বাংলা ১৩০৫) সালে কাহিনীমূলক কাব্যের বদলে গল্প বলার ধারাটা গদ্যের খাতে ফিরে গেছে এবং এই সময় আমরা সাতটি গল্প পাই। অতঃপর ১৯০০ (বাংলা ১৩০৭) সালে আটটি ছোট গল্প। ১৯০১ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে সবসুদ্ধ আটটি মাত্র গল্প রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। এই স্বল্পতার কারণ— গল্পের টুকরোগুলো জমিয়ে এক জোটে উপন্যাস আকারে রূপ দেওয়া। এই সময় তিনি তিনটি উপন্যাস রচনা করেন— চোখের বালি, নৌকাডুবি ও গোরা। ১৯১৫ ও ১৯১৬ সালে ছোট গল্পের বদলে আমরা উপহার পেয়েছি ঘরে বাইরে এবং চতুরঙ্গ।
গরিব-দুঃখী প্রজারা সামনে এলে ওদের দেখে তিনি ব্যথিত ও পীড়িত হয়েছেন এবং তখনই অন্তর দেবতার কাছে বলেছেন—
‘এই সব ম্লান মূঢ় মুখে দিতে হবে ভাষা,
এই সব শীর্ণ শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা। ’
ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাওয়ার পর শিলাইদহের সঙ্গে কবির যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যায় ১৯২২ সালে। তিনি শেষবারের মতো জমিদারির তৎকালীন মালিক তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরোধে ১৯২৩ সালে শিলাইদহে আসেন। তবে শিলাইদহের স্মৃতি তিনি চিরকাল মনে রেখেছিলেন। মৃত্যুর কিছুকাল আগে (১৯৩৮ সালে) শিলাইদহের একজনের চিঠির জবাবে তিনি লিখেছেন—‘শিলাইদহে দীর্ঘকাল তোমাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে যুক্ত ছিলাম, আজো তোমাদের মন থেকে তা’ ছিন্ন হয়ে যায়নি, তার প্রমাণ পাওয়া গেল তোমার চিঠিখানিতে। শ্রদ্ধার দান নানা স্থান থেকে পেয়েছি, তোমাদের অর্ঘ্য সকলের চেয়ে মনকে স্পর্শ করেছে’।
শিলাইদহের কুঠিবাড়ির দিনগুলো প্রসঙ্গে সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেন, “আমার বুদ্ধি এবং কল্পনা এবং ইচ্ছাকে উন্মুখ করে তুলেছিল এই সময়কার প্রবর্তনা— বিশ্বপ্রকৃতি এবং মানবলোকের মধ্যে নিত্যসচল অভিজ্ঞতার প্রবর্তনা। এই সময়কার প্রথম কাব্যের ফসল ভরা হয়েছিল সোনার তরীতে।তখনই সংশয় প্রকাশ করেছি, এ তরী নিঃশেষে আমার ফসল তুলে নেবে কিন্তু আমাকে নেবে কি। ”
আজ কবি নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তার স্মৃতিবিজড়িত কুঠিবাড়ি।
তিনি জমিদারি দেখার ফাঁকে ফাঁকে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতেন তার বজরা নিয়ে।
বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, প্রমথ চৌধুরী, মোহিতলাল মজুমদার, মীর মশাররফ হোসেনসহ আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির সে সময় নিত্য যাতায়াত ছিল এই শিলাইদহে। রবি ঠাকুর ১৯১২ সালে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ করা শুরু করেন এই শিলাইদহে বসেই। পদ্মার ঢেউ খেলানো প্রাচীরে ঘেরা কুঠি বাড়ির ছাদে বসে সুর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও জ্যোৎস্না প্লাবিত প্রকৃতির শোভায় মুগ্ধ হতেন কবি।
কুঠিবাড়িতে রয়েছে কবির নানা বয়সের ছবি। বাল্যকাল থেকে শুরু করে মৃত্যু শয্যার ছবি পর্যন্ত সংরক্ষিত রয়েছে। আছে কবির নিজ হাতের লেখা কবিতা, নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর প্রকাশিত কবির ছবি ও সনদপত্র। এমন কি কবি যেসব নাটকে অভিনয় করেছেন সেসব নাম ভূমিকার ছবিও রক্ষিত হয়েছে।
কবির শয়ন কক্ষে রয়েছে একটি পালঙ্ক, ছোট একটা গোল টেবিল, কাঠের আলনা, আলমারি, কবির ব্যবহৃত চঞ্চল ও চপলা নামের দুটো স্পিডবোট। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিভিন্ন মনীষীর ছবি এবং রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে আঁকা ছবি ও লেখা কবিতা।