গারো পাহাড়ের গদ্যে এস এম শাহনূর (পর্ব-১৭)

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য ঢাকা (১ম বার):
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৮ সালে প্রথম ঢাকায় আসেন। প্রথমবারের সফর ছিল মাত্র তিন দিনের। দ্বিতীয় দিন বিক্রমপুরের ভাগ্যকুলের জমিদারদের সৌজন্যে বুড়িগঙ্গায় বিশাল এক স্টিমার পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত হয়ে ভাগ্যকুলের ধনাঢ্য জমিদারদের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন।
জীবদ্দশায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৮ ও ১৯২৬ সালে ঢাকায় আসেন। প্রথমবার তিনি এসেছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের দশম অধিবেশনে যোগদান করতে। এই সফরকালে ঢাকা ক্রাউন থিয়েটার হলে ৩০ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত মোট তিন দিন অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি অংশ নেন সম্মেলনে। বিশ্বকবির এই আগমন নিয়ে খুব একটা মাতামাতির খবর জানা যায়না।
গোপালচন্দ্র রায়ের ‘ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালের ৭ জানুয়ারি কলকাতা থেকে ট্রেনে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে স্টিমারযোগে নারায়ণগঞ্জ এবং মোটর শোভাযাত্রা করে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় তাঁর সফরসূচি ছিল ৯ দিনের। রবীন্দ্রনাথকে ঢাকায় আনার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (পরে উপাচার্য হন) ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের বিশেষ অবদান ছিল।
রবীন্দ্রনাথ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেহমান নন, সারা ঢাকাবাসীর মেহমান হয়ে আসেন। তিনি বুড়িগঙ্গা নদীর ওয়াইজ ঘাটে বাঁধা ঢাকার নবাবদের রাজকীয় জলযান তুরাগ হাউস বোটে ওঠেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ১৯৩৬ সালে ডি লিট উপাধি প্রদান করলেও সেবার তিনি আসেননি। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬-এর ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল নর্থব্রুক হলে সংবর্ধনা গ্রহণ দিয়ে ঢাকা কর্মসূচি শুরু করলেও ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের (এখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) কর্মসূচি দিয়েই মূলত তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কর্মসূচির সূচনা। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে তিনি ময়মনসিংহের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। মূলত ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর—সাড়ে চার দিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়মণ্ডলীর কেন্দ্রীয় অতিথি ছিলেন।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় এসেছিলেন দুইবার। প্রথম বার ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দিতে; দ্বিতীয়বার এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ঢাকাবাসীদের আমন্ত্রণে।
এক.
১৮৯৮ সাল (বাংলা ১৩০৫)। ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন। সে বছরই ২১ মে (৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৫, শনিবার) ভারতীয় ত্রাণ সমিতি (ইন্ডিয়ান রিলিফ সোসাইটি)-এর সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধির মধ্যে ছিলেন আশুতোষ চৌধুরী, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী, গগনেন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রমুখ। সম্মেলনের সভাপতি মনোনীত হন রেভারেন্ড কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩০ মে – ১ জুন, ১৮৯৮(১৭-১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৫) এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের আয়োজন হয়েছিল ঢাকার ক্রাউন থিয়েটারে।
সম্মেলনে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যান্য প্রতিনিধির সঙ্গে ২৯ মে (১৬ জ্যৈষ্ঠ, রবিবার) কলকাতা থেকে ঢাকা আসেন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ, যোগেন্দ্রনাথ চৌধূরী প্রমুখ।
সম্মেলন শেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১ জুন (১৯ জ্যৈষ্ঠ, বুধবার) রাতেই শিলাইদহের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
On Thu, 4 Aug 2022, 10:11 am SM Shahnoor, <smshahnoor82@gmail.com> wrote:
গারো পাহাড়ের গদ্যে এস এম শাহনূর (পর্ব-১৬)
লালন ও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথা :
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন লালনের তত্ত্ব ও গানের এক মহান ভক্ত। ১৮৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আসেন তখনই কোনো একসময়ে লালন সাঁইজির সাথে তাঁর দেখা হয়। তিনি লালন ফকিরের ২০টি গান প্রবাসী পত্রিকায় হারামনি বিভাগে প্রকাশিত করেছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর বক্তৃতায় তিনি লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানের ইংরেজি অনুবাদ বিদেশি শ্রোতাদের শুনিয়েছিলেন। লালনের গানে রবীন্দ্রনাথ দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর এক লেখায় বলেছেন ‘লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন। আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’ ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়/ধরতে পারলে মনো-বেড়ি দিতাম পাখির পায়’ লালনের এই গানটি শুনে রবীন্দ্রনাথ এমনই মুগ্ধ হলেন, দেহতত্ত্বের এ গানটিকে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। ১৯২৫ সালের ভারতীয় দর্শন মহাসভায় ইংরেজি বক্তৃতায় এই গানের উদ্ধৃতিও দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ নিজে স্বপ্রণোদিত হয়ে লালনের ২৮৯ টি গান সংগ্রহ করেন। রবীন্দ্রনাথই বাঙালির লালনকে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বমায়ের লালনে পরিণত করেন।