গারো পাহাড়ের গদ্যে এস এম শাহনূর (পর্ব – ৩)

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য শিলাইদহ
১৮৯১ সালে বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্দেশে ঠাকুর পরিবারের জমিদারী পরিচালনার জন্য কুষ্টিয়ার শিলাইদহে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য ও ছায়াঘেরা নিভৃত পল্লী কবিচিত্তকে আকৃষ্ট করেছিল। প্রমত্তা পদ্মা নদী ও পদ্মার বুক থেকে বেরিয়ে আসা গড়াই নদী আর নীলকর সাহেব শেলীর নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত শিলাইদহের কুঠিবাড়ি কবিগুরুর পদস্পর্শে ধন্য হয়েছে।
তারও আগে বালক রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার সহযাত্রী হয়ে ১৮৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে শিলাইদহে অল্প সময়ের জন্য একবার এসেছিলেন। এরপর ১৮৭৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সেজু দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর নতুন বউঠাকরন কাদম্বীনি দেবির সঙ্গে শিলাইদহে বেড়াতে এসেছিলেন।[ছেলেবেলা ১] পরবর্তীতে ৩০ বছর বয়সে জমিদারির পুরো দায়িত্ব নেবার পর ১৮৯১ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় কাটিয়াছেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর এবং রাজশাহীর পতিসরে।
শিলাইদহ গ্রামের উত্তরে পদ্মা এবং পশ্চিমে গড়াই নদী প্রবাহিত। দুটি নদী শিলাইদহকে অর্ধ-চন্দ্রাকারে ঘিরে রেখেছে। সপরিবারে তিনি ১৮৯৮ সালে শিলাইদহের এই কুঠিবাড়ীতে উঠে এসেছেন এবং থেকেছেন দীর্ঘ সময়। এই কুঠিবাড়ি থেকে তিনি পতিসর ও শাহজাদপুরের জমিদারী দেখাশুনা করতেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে পদ্মা নদীর তীরে মস্ত বড় বড় নীলকুঠি তৈরি করা হয়েছিল। ওই সময় নীলের ব্যবসা ছেড়ে সাহেবরা চলে গেলে নীলকুঠির নীচতলা কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারীর কাচারি ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
নদীর ভাঙ্গনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীলকুঠি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে ১৮৯২ সালে পদ্মার তীর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে শিলাইদহ গ্রামে ৩২ বিঘা জায়গা নিয়ে পৌনে চার বিঘা জমির উপর ঢেউ আকৃতির প্রাচীর বেষ্টিত তিন তলার বর্তমান এই কুঠিবাড়িটি নির্মাণ করা হয়। পদ্মা-গড়াইয়ের মধ্যবর্তী জমিদারী এস্টেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ কবি ১৮৯১ সাল থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ গ্রামে এই কুঠিবাড়িটিতেই থেকেছেন।
তিনতলা এই কুঠিবাড়ির কামড়ার সংখ্যা ১৮টি। এর নীচতলায় ৯টি, দোতলায় ৭টি ও তিনতলায় দুটি কামড়া রয়েছে। প্রাচীন ঐতিহ্য ও জমিদারী নিদর্শনের অবয়বে গড়ে তোলা কুঠিবাড়ি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নয়নাভিরাম। এই কুঠিবাড়ির পশ্চিমদিকে অবস্থিত পুকুরপাড়ের শান বাঁধানো বকুলতলার ঘাট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে ফুলের সুগন্ধ ও পাখির কলরবে কবি গান ও কবিতা লিখতেন।
কুঠিবাড়িতে কবির ব্যবহার্য জিনিষ-পত্র ও অন্যান্য সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৮০টিরও অধিক বিভিন্ন দুর্লভ ছবি ও কবির ব্যবহৃত খাট, ইজি চেয়ার, লেখার টেবিল, স্পিড বোট, দুই বেহারার পালকি, ঘাস কাটা মেশিন, গদি চেয়ার, নৌকাসহ অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিষ-পত্র রয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুঠিবাড়ি সংরক্ষণ ও দেখাশুনার কাজ করছে।
শিলাইদহ থেকে জমিদারী ছেড়ে যাওয়ার পরও কবি বেশ কয়েকবার শিলাইদহে এসেছেন।
শিলাইদহ পর্বে কবি লিখেছেন সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, ক্ষণিকার অসংখ্য কবিতা৷ লিখেছেন অর্ধশতাধিক ছোটগল্প আর প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রীকে অনন্য পত্রগুচ্ছ৷ ‘পদ্মা’ বোটে ভেসে বেড়িয়েছেন পদ্মা নদীর ওপর৷