সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ১)

রেকারিং ডেসিমাল

বাড়ির একতলার পাঁচিলের ওপারেই বাঙুর হাসপাতাল।
পুরোনো বাড়ি। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে।
বাড়ি করেছেন যিনি তাঁর বয়স একশোর খুব কাছে এখন। গিন্নিও নব্বুইয়ের ঘরে।
থই থই সংসার।
দোতলায় দুই ছেলে তাদের ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি।
নিচে এক ছেলে আর এক মেয়ের ঘরগেরস্তি।
সামনের দোতলা বাড়িতে সেজ মেয়ে।
এই কিছুদিন আগেই নাতির ঘরে পুতি হতে বড় আহ্লাদিত হয়েছেন এই মানুষ দুটি।
নিজেরা ফাঁকা সময়ে ভেঙেচুরে আসা মুখে আলো ভরিয়ে সুখে হাসেন।
— আর কি চাইতে পারি, বলো?
কিচ্ছু নেই হা-দরিদ্র থেকে নটা ছেলেমেয়ে বড় করেছি, এই এত বড় বাড়ি করেছি, ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছি, বিয়ে দিয়েছি। সক্কলের ছেলেপুলেও হয়ে বড় হয়ে গেছে। বলতে নেই সবাই ত করে কম্মে খাচ্ছে মোটামুটি । আর কি চাইতে পারি, হ্যাঁ ?
গিন্নি চওড়া লাল পাড়ের ঘোমটার তলা থেকে মুচকি হাসেন।
বড় ছেলের বড় ছেলে এ বংশের প্রথম ছেলে। তাকে হাতে করে বড় করেছেন। তার জন্য দুজনেরই টান বেশি।
তার ছেলে হয়েছে সদ্য। তারা বাইরে থাকে । বাচ্চা হবার পর কদিনের জন্য এসেছে।
তার কথাই বলেন কর্তাকে।
— এইটেই সাধ ছিল খুব, বুঝলা।
নাতির ঘরের পুতি।
এরা আজকালকার মেয়েরা, আর ত চান্স নিবো না। আগে ত মেয়ে আছে। এই দুই নম্বর খান পোলা না হলে, নাতবউকে বলে রেখেছিলাম ত, বোটানিক্যাল গার্ডেনে নির্বাসন দিয়ে আসব।
এরা কি আর আমাদের মত ? বছর ঘুরতেই ছেলেপেলে হবে ? আমরা হাজারে বেজার নই শতে নাহি ভয়।
তা ভাল ,ছোটোটা ত ছেলেই হল ঠাকুরের ইচ্ছেয়।
হাত জোড় করে কপালে ঠেকান পাকা চুলে সিঁদুর পরা মানুষটি।
টানা বারান্দার একপাশের ঘরে দুই পুচকেকে নিয়ে নতুন মা মশারি গোঁজে। তার লম্বাচওড়া বর হঠাৎ বলে, ওরে বাবা।
মা ভুরু কুঁচকে বলে , চুপ। এত চেষ্টায় ঘুমিয়েছে বাচ্চাদুটো কথা বলে কেন ?
বাবা উঠে বসে বলে , আরে ইঁদুর।
মা চোখ বড় করে ঘুরে বসে মস্ত খাটের মধ্যিখানে ।
— সেকি ? কি ইঁদুর? কোথায় ইঁদুর দেখছ ? মানে কি ? বাচ্চাদের ঘরে ইঁদুর ? কেন যে আমি রাজি হয়েছি তোমাদের এই ধ্যাধধ্যাড়ে পুরোনো বাড়িতে আসতে ডেলিভারির পরে । উফ। না আছে এটাচড বাথ। চারদিক খোলা বারান্দা। একেকটা ঘর একেক লেভেলে। পাগল হয়ে যাব।
এরমধ্যে বলছ ইঁদুর ?
দেখো দেখো শিগগির।
বাবা আবার ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে মেজের দিকে বলে, ওরে বাবা। দাঁড়াও অশোককাকুকে ডাকি।
ব্রহ্মরন্ধ্র অব্দি জ্বলে যায় মায়ের।
ক্ষেপে গিয়ে বকতে শুরু করেন।
— অশোককাকু? এত রাতে ? বাচ্চাদের পয়দা করেছ কি বাবাকাকাদের ভরসায় ?
অপদার্থ!! এর পরে যখন নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকবে তখন কি করে অশোককাকুকে ডাকবে কোন এমারজেন্সি হলে শুনি ?..
কাঁচুমাচু বাবা মশারির ফাঁক দিয়ে নিচে তাকিয়ে থাকে ভয়ার্ত চোখে।
আর বিড়বিড় করে।
— ওরে বাবা!! ওরে বাবা!!! একে আমি ভয় পাচ্ছি তার ওপরে তুমি এত বকাবকি করছ। আর বাইরে ইঁদুর। কি যে হবে!!
তারপরেই কিঁচ আওয়াজ আর মশারির বাঁধন খুলে বাবা বারান্দায় লাফ।
কি চীৎকার।
অশোককাকু শিগগির এসো, ঘরে ইঁদুর!
পাশের ঘরের দরজা খুলে হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসেন অব্যর্থ নিশানাওয়ালা দুঁদে পুলিশঅফিসার কাকু। সঙ্গে ছোট কন্যা টিনা।
বাকি বাড়ির সবাইও আস্তে-ধীরে জড় হতে থাকে বারান্দার এই কোনায়, কি হল কি হল, বলতে বলতে।

(চলবে)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।