‘কবিতাঞ্জলী’ – বইচর্চায় সৌরভ মণ্ডল

ছন্দবদ্ধ সহজ স্বীকারোক্তি তবে অভিঘাত গভীর 

কবিতা তো হৃদয়ের অন্তর্গত সুর। একজন কবি তার সময়কালের ও মহাজাগতিক সময়ের বার্তাবাহক। আর যে কবিতা সময়ের দাবি মেটাতে পারে তা-ই কালের স্রোতে বেঁচে থাকে। আজ যে বইটি নিয়ে আলোকপাত করবো সেটির নাম ‘কবিতাঞ্জলী’। লিখেছেন দীনেশ বিশ্বাস। একদম শুরুতেই যেকথা বলার, হয়তো প্রথম বই বলে লেখক নামকরণ নিয়ে অতটা ভাবেননি তবে বইটির লেখা পড়ে মনে হয়েছে আরও আকর্ষণীয় ও চমৎকার নামকরণ করা সম্ভব ছিল।
যাই হোক এবার এই বইয়ের কবিতাগুলোতে আসি। এখনকার দিনের অধিকাংশ কবি খানিকটা প্রথাগত ছন্দ বর্জন করেই কবিতার শরীর তৈরি করেন, দীনেশবাবু সেইদলে পড়েন না। তার অধিকাংশ কবিতায় যেমন আছে ছন্দের অনুরণন তেমনই জোরালো বক্তব্যের উপস্থাপন। “মনে পড়ে সেই মেঠো পথ আর দিগন্ত ছোঁয়া মাঠ/ যেখানে আমি শৈশবে করেছি কত কিশলয় পাঠ”- অতীতের মেদুর হাওয়া যেন সারা শরীরে খেলা করে যায় এইরকম শব্দগুচ্ছের মুখোমুখি হওয়ার পর। কোথাও হয়তো পর্ব ও মাত্রা গঠনে সামান্য ত্রুটি রয়েছে তার কিছু কিছু কবিতায় তবে বক্তব্যের স্ফুরণ সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে গেছে। শুধু যে নস্টালজিয়া তা নয় সমাজের জটিল, কুটিল সমীকরণের দিকে আঙুল তুলেছে দীনেশ বিশ্বাসের কবিতা- “যাদের জন্য মানুষ পেল অন্ন বস্ত্র বাসস্থান/ তাদের ধ্বংস হতে দেখেও কাঁদে না কারো প্রাণ”। সমাজের অবক্ষয় যেমন উঠে এসেছে তার সাবলীল শব্দচালনায় তেমনই ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতিও কবিতার আঙ্গিকে ধরা দিয়েছে। ‘একটা প্রেমের মৃত্যু’ কবিতায় তিনি লিখছেন- “আমি তখন আড়াল খুঁজে আপন মনে হাসি/ মনের ভিতর শীতল বাতাস বইলো রাশি রাশি”। কত সরল অথচ কী আন্তরিক স্বীকারোক্তি। আবার ‘ভালোবাসার চিহ্ন’ কবিতায় লিখছেন- “নীচু জাতের মেয়ে বলে রেখেছিলাম একান্ত গোপনে”। সমাজের প্রচলিত অন্ধ বুনিয়াদকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তার কবিতা। 
মোটের ওপর তার কবিতা পড়তে গিয়ে কোথাও মনে হয়নি শব্দ বা শব্দের চলন আরোপিত। এই সাবলীল গতিই তো একজন কবির কাছে প্রত্যাশিত। তবে কোথাও কোথাও ছন্দ ধরে রাখার জন্য এবং অন্তমিল ঠিক রাখার জন্য এমন কিছু শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা কলোকিয়াল নয়। এটা বর্জিত হলে অর্থাৎ কবিতার শব্দচয়ন যদি মানুষের মুখের ভাষায় হয়, তবে দীনেশবাবুর কবিতা আরও বেশি করেও পাঠকের প্রিয় হয়ে উঠবে। 
বই – কবিতাঞ্জলী
লেখক – দীনেশ বিশ্বাস
প্রকাশক – পালক পাবলিশার্স
মূল্য: ৯৯ টাকা 
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।