সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শ্রীরাজ মিত্র (পর্ব – ৩)

ছায়াপথ, গুঁড়ো ছাই

হিটলারের সহযোগী ছিলেন আইখম্যান। আইখম্যান ছিলেন মূলত গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ইহুদি হত্যার প্রধান রূপকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পরাজয় হলে তিনি গোপনে আর্জেন্টিনা পালিয়ে যান এবং ছদ্মবেশে একটি কৃষি ফার্মে কাজ করতে থাকেন। যদিও তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। বেশ কয়েক বছর পর তিনি ধরা পড়েন ইহুদিদের হাতে। এমনিতেই ইহুদিরা তার প্রতি খুব রেগে ছিল, তার ওপরে তাকে খুঁজে পেয়ে হত্যা করার সব প্রস্তুতি নেওয়া সারা, এমতাবস্থায় মৃত্যুর পূর্বে তার শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হলে তিনি মৃত্যুর পূর্বে ইহুদি ধর্ম গ্রহন করার কথা বলেন।
তার এমন ইচ্ছার কথা শুনে উপস্থিত সবাই হাসাহাসি করল। মনে মনে ভাবল, ‘বাছাধন, তুমি মনে করেছ, ইহুদি ধর্ম গ্রহন করলেই ইহুদিরা তোমায় মাফ করে দেবে! তা হবে না। মরতে তোমায় হবেই।’
কয়েকজন কৌতুহলী কৌতুহলের বশে জিজ্ঞাসা করল- ‘আচ্ছা তোমার এই ইচ্ছা কেন হলো বলো তো?’
আইখম্যান নির্বিকার চিত্তে উত্তর দিয়ে ছিলেন, ‘তোমরা যে আমায় ছাড়বে না, এটা আমি নিশ্চিত। তাই মারা যাওয়ার আগে দেখে যেতে চাই, আরও একটা ইহুদি মারা গেল!’
দেখো, ঔরঙ্গজেবের বাবার নাম জানতে চাইলে ৯৯% লোক পুরো খানদানের পরিচয় দিয়ে দেবে। এই যেমন ঔরঙ্গজেবের বাবা শাহজাহান, শাহজাহানের বাবা জাহাঙ্গীর, জাহাঙ্গীরের বাবা আকবর, আকবরের বাবা হুমায়ুন, হুমায়ুনের বাবা বাবর।এদের নামগুলো ঠিকঠাক মনে রাখার জন্য আমাদেরকে ছোটবেলায় শেখানো হয়েছিল “বাবার হল আবার জ্বর সারলো ঔষধে”।
আচ্ছা হর্ষবর্ধনের পিতার নাম বা তাঁর পাঁচ পুরুষ আগের বংশধরদের নাম আমরা কি জানি?পৃথ্বীরাজ চৌহানের পিতার নাম ও তাঁর পাঁচ পুরুষ আগের বংশধরদের নাম? কিংবা সম্রাট অশোক, মহারাণা প্রতাপ প্রমুখের বংশনামা?আলেকজান্ডারের সেনাপতির নাম ৯০%লোক জানে, আচ্ছা মহারাণা উদয় সিং এর সেনাপতির নাম আমরা জানি?কোন রাজাকে “আলেকজান্ডার অফ ইন্ডিয়া” বলা হত তাও জানা নেই আমাদের। ভারতবর্ষে সব চেয়ে বেশীদিন রাজত্ব করা সাম্রাজ্যের নাম চোল। ক’জন চোলরাজার নাম আমরা বলতে পারি?
কেন? ব্যাপারটা এরকম কেন হল? আমার আপনার মনে এরকম প্রশ্ন কেন এল না? কেন ইতিহাসের পাতায় এই প্রশ্নের কোনও উত্তর খুঁজে পাওয়া যাই না। বেশীরভাগ মানুষ বলতে পারবে না, কারণ ভারতের প্রকৃত ইতিহাস ইচ্ছাকৃতভাবে জানতেই দেওয়া হয়নি।
পাঠান – মুঘলদের ইতিহাসই অগ্রাধিকার পেয়েছে পাঠ্যপুস্তক গুলিতে। এর পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল সেকুলারপন্থী ও প্রগতিশীলেরা।কংগ্রেস বরাবর সেকুলারপন্থী দল। যে কারণের জন্য নেতাজির মত মানুষকে আলাদা করে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন করতে হয়েছিল।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭, কংগ্রেস সরকারের অধীনে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী- মৌলনা আবুল কালাম আজাদ,হুমায়ুন কবির, মো: করিম,ফকরুদ্দিন আলী,নুরুল হাসান.. প্রমুখ ব্যক্তি।
এবার বুঝেছো কেন আকবর, বাবর, খলজী, ঔরঙ্গজেব, তৈমুরলঙ, টিপু সুলতান,শাহজান রূপী ভারত আক্রমণকারী ও লক্ষ লক্ষ ভারতীয়দের হত্যাকারীরা আজ ভারতবর্ষের ইতিহাসের বইয়ের পাতায় মহান ?
কেন ভারতীয়দের ভুলতে বাধ্য করা হল – ৬০০ বছরের মৌর্য সাম্রাজ্য, ৬৫০ বছরের অহম সাম্রাজ্য, ৬৫০ বছরের চালুক্য সাম্রাজ্য, ৫০০বছরের সাতবাহন সাম্রাজ্য,১০০০ বছরের চোল সাম্রাজ্য,৮০০ বছরের পাড্রু সাম্রাজ্য, ৪০০ বছরের চন্ডিল্য সাম্রাজ্য,৬০০ বছরের গুপ্ত সাম্রাজ্য, ৬০০ বছরের পল্লব সাম্রাজ্য।
এই বলে যেন হাঁফ নিলেন প্রকাশ ব্যানার্জি। তার পর আবার বলতে শুরু করলেন- আজ তাই ভারতের নিজস্ব গৌরবময় ইতিহাস জানার ও জানানোর দিন আসছে।আমাদের পাঠ্যক্রমের মধ্যে ভারতের ইতিহাস এর দিকগুলি বিস্তারিত ভাবে লেখার ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সাংবাদিকদেরই গর্জে উঠতে হবে। জন জাগরণ চাই গো মাস্টার, জন জাগরণ চাই!
□■
আমরা যে সবাই বন্ধু এমন নয়। তবে একটা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছি বলতে পারেন। আমরা ভীষণ গল্পবাজ। কয়েকজন তো এক্কেবারে তথ্যের ভাণ্ডার! ভাবতে পারেন, ফিরছি কর্ণগড় থেকে। ভাদুতলা ঢোকার মুখে বাম দিকে যে মিষ্টি দোকানটা… এখানে আমরা চা সিঙাড়া খাই , প্রায় এপাশে এলেই। স্বাভাবিকভাবেই আজও। সিঙাড়া ভাজা আছে,মিনিট পনেরো আগেই হয়েছে। কিন্তু পরিমল বলল – না যেটা গরম উঠবে সেটা দিও। আমি আপত্তি করি। কিন্তু কে আর শোনে? আমি বাংলায় সিঙাড়া সাম্রাজ্যের ইতিবৃত্ত বলি।
ঠাণ্ডা লুচি বারবার রাজসভা থেকে ফিরিয়ে দেওয়া য় রাজবাড়ির হালুইকর অনুমতি চাইলেন রাজসভায় তিনি মিষ্টান্ন পাঠাবেন কি না! আর তা শুনেই রাজচিকিৎসকের পরামর্শে মধুমেহ রোগাক্রান্ত রাজা অগ্নিশর্মা হয়ে শূলে চড়ানোর হুকুম দিয়েছিলেন হালুইকরকে। অনেক অনুনয় বিনয় করে নিজের প্রাণ রক্ষা করেন হালুইকর। তবে রাজা আদেশ দেন – হালুইকরকে তিনরাত্রের মধ্যে দেশত্যাগ করতে হবে ।
দ্বিতীয় রাত্রে হালুইকরের স্ত্রী ঠিক করে দেশত্যাগের আগে একবার দেখা করবে রাজার সাথে। সেইমতো তৃতীয়দিন সকাল বেলা রাজদরবারে এসে প্রণাম জানালো স্বয়ং রাজামশাইকে। রাজসভায় আসার কারণ জিজ্ঞেস করায়, রাজাকে জানায় – সে নাকি এমনভাবে লুচি তরকারি করতে পারে, যা রাজা আধঘন্টা বাদে খেলেও গরম পাবেন। এজাতীয় লুচি এবং তরকারি নাকি কিছুক্ষণ বাদে খাওয়াই দস্তুর।
সন্দিহান রাজা কিঞ্চিৎ কৌতূহলী হয়ে হালুইকরের স্ত্রীকে পাঠালেন পাকশালে। জানিয়ে দিলেন যখন রাজসভা থেকে খবর যাবে তৎক্ষণাৎ পাকশাল থেকে খাবার পৌঁছনো চাই। হালুইকরের স্ত্রী মৃদু হেসে মহারাজকে জানিয়েছিলো – খাদ্যদ্রব্য রাজসভায় তৎক্ষণাৎই পৌঁছবে, কিন্তু অনুগ্রহ করে তিনি যেন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে খান – অন্যথায় মহামান্য রাজার জিহ্বা পুড়ে যেতে পারে। বিস্মিত মহারাজের সামনে দিয়ে হাস্যমুখে হালুইকরের স্ত্রী চলে গেল পাকশালে।
রাজ-পাচক আলুর তরকারি তৈরি করে পাকশালে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন, হুকুম এলেই লুচি ভাজতে হবে। ময়দার তাল মাখা রয়েছে হাতের সামনে। হালুইকরের স্ত্রী পাচককে কটাক্ষ করে বসলো ময়দার তাল নিয়ে। লেচি কেটে লুচি বেলে, কাঁচা ময়দার ভেতর লুচির জন্য তৈরি সাধারণ তরকারি ভরে দিয়ে, সমভুজাকৃতি ত্রিভুজের গড়ন বানিয়ে আড়ষ্ঠ রাজ পাচকের সামনে নিজের আঁচল সামলে শুরু করলো চটুল গল্প।
রাজাজ্ঞা আসতেই তরকারির পুর ভর্তি দশটি ত্রিভুজাকৃতির লুচির ময়দা ফুটন্ত ঘি ভর্তি কড়ায় ফেলে দিয়ে, নিমেষের মধ্যে সোনালী রঙের ত্রিভুজগুলি তুলে নিয়ে স্বর্ণথালায় সাজিয়ে নিজেই চললো রাজসভায়।
মহারাজ এরূপ অদ্ভুত দর্শন খাদ্যবস্তু দেখে স্তম্ভিত। হালুইকরের স্ত্রী অত্যন্ত বিনীতভাবে জানালো – খাদ্যদ্রব্যটির নাম সমভুজা। মহারাজ যেন সম্পূর্ণ বস্তুটি মুখে না ঢুকিয়ে একটি কামড় দিয়ে দেখেন – ঠাণ্ডা না গরম এবং অনুগ্রহ করে স্বাদটি জানান।
মহারাজ স্বাদ জানাননি। তিনি তিনছড়া মুক্তো মালা খুলে হালুইকরের স্ত্রীয়ের হাতে দিয়েছিলেন। রাজবাড়ির হালুইকরের দণ্ডাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিলেন। প্রায় ছ’মাস পর হেসে উঠেছিলেন মহারাজ, শান্তি পেয়েছিলো তামাম প্রজাকুল।
মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। ১৭৬৬ সালে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার রাজ-হালুইকর, কলিঙ্গ তথা বর্তমান ওড়িষ্যা থেকে আগত গুণীনাথ হালুইকরের ষষ্ঠপুত্র গিরীধারী হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী দেবী আবিষ্কার করেছিলেন সিঙ্গাড়া।
শাক্ত সাধক, পরবর্তিকালে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভরতচন্দ্র স্বয়ং সন্ধ্যাহ্নিক সেরে প্রতিসন্ধ্যায় বসতেন একথালা সিঙ্গাড়া নিয়ে।
দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যায়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দরবার থেকে বাইশটি সুসজ্জিত হাতি ভেট নিয়ে গিয়েছিলো উমিচাঁদের কাছে – বাইশটি স্বর্ণথালা ভর্তি বাইশশোটি সিঙ্গাড়া। ভারতীয় খাদ্য হিসেবে সিঙ্গাড়ার সাথে রবার্ট ক্লাইভের প্রথম সাক্ষাৎ হয়, এই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রেরই সৌজন্যে। সিঙ্গাড়ার জন্য ইতিহাস স্বীকৃতি দিয়েছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে। নাম ভুলে গেছে তাঁর প্রধান হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহারার। ইংরেজিতে বলে, কমন সেন্স মেকস্ আ ম্যান আনকমন। ধরিত্রীদেবী সাধারণ বুদ্ধি খাটিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন এই অসাধারণ খাদ্যদ্রব্যটির, যেটি সেই ১৭৬৬ সাল থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলা তথা সারা ভারতে।
ঐতিহাসিকদের মতে, এর বহু আগে, নবম শতাব্দীতে পারস্যের অধিবাসীরা যব এবং ময়দার তালের সঙ্গে গাজর কড়াইশুঁটি রসুন ও মাংস মেখে সেঁকে খেতো, যাকে বর্তমান সিঙ্গাড়ার জনক হিসাবে ধরা হলেও, সুদূর পারস্য থেকে ভারতবর্ষে এসেও তাঁরা ময়দার তালে মাংসের কুঁচি ঢুকিয়ে সেঁকেই খেতেন। এরও বহুপরে তাঁরা ভারতবর্ষের উত্তরপূর্ব উপকূলে বিভিন্ন মশলা সহযোগে তৈরি আলুর তরকারি, ময়দার ভেতর ঢুকিয়ে ঘিয়ে ভাজার পদ্ধতিতে চমৎকৃত হ’ন।
ডায়বেটিক পেশেন্টদের ঘন ঘন খিদে পায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নত হয়েছে। ডাক্তাররা বলছেন, অনেকক্ষণ অন্তর একসাথে প্রচুর পরিমানে না খেয়ে, ক্যালোরি মেপে কিছুক্ষণ অন্তর অল্পসল্প খাবার খেতে। কিন্তু সেযুগে ডাক্তারবাবুদের হৃদয় ছিলো বিশাল। মধুমেহ রোগীরা তখন তেল ঘি মশলা, ভাজা খেলেও তাঁরা রাগ করতেন না। নিশ্চিতভাবেই আজকের যুগে ডাক্তার বাবুরা আঁতকে উঠবেন যদি দেখেন কোনো ডায়াবেটিক পেশেন্ট প্রতিঘন্টায় সিঙ্গাড়া খাচ্ছেন! তবু, আঁটকানো যায়নি সিঙ্গাড়াকে।
শহুরে অভিজাত পরিবারের বৈঠকখানায় মোটা গদির সোফায় বসা অতিথির থালাই হোক বা প্রত্যন্ত গ্রামের জরাজীর্ণ চায়ের দোকানের সামনে নড়বড়ে বাঁশের বেঞ্চে রাখা তেলচিটে কালো ভাঙ্গা বেতের চুবড়ি – বিকেল সাড়ে চারটেই হোক বা সকাল পৌনে দশটা, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রধান হালুইকরের স্ত্রীর উদ্ভাবনটি সর্বত্র সর্বদা সর্বগামী। যা রাজসভায় রাজ-সম্মুখে পরিবেশিত হয়, তার কৌলীন্য প্রশ্নাতীত হবে – এই তো স্বাভাবিক!
□■□
সিঙাড়া চলে এসেছে। এই পাঁচ ছজন একসাথে জুটলে বেশ জমে যায়। কি করে যে সময় কেটে যায় ..! হেনকালে মাস্টার হঠাৎ হো হো করে হেসে ওঠে। কে তাকে হোয়াটস অ্যাপে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে তাই দেখে। কিছু বলতে যাব, মাস্টার হাসতে হাসতে বলল, হোয়াটস অ্যাপ টা দেখবেন। কেন হাসছি, আপনাদেরও পাঠালাম।
“হাওয়াই চপ্পল পায়ে সিরাজ তো উঠে পড়লেন ঘোড়ায়। তারপর তরোয়াল নিয়ে সাঁই সাঁই সাঁই! কী যুদ্ধু, কী যুদ্ধু! ” — সিরাজ সত্যিসত্যি এমন করেছিলেন কিনা, জানি না। সিরাজ নিজেও মনে হয় জানতেন না। তবে মালিপাঁচঘড়ার ক্লাস এইটের ছাত্র এসব দিব্যচক্ষে দেখেছে। ‘পলাশীর যুদ্ধ’ নিয়ে কোশ্চেনের উত্তরে খাতায় লিখেও দিয়েছে। লেখা পড়ে মাস্টারমশাই সিরাজোচিত ধামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন কিনা জানা নেই। আপনারা অবাক হতেই পারেন, স্কুল শিক্ষার সঙ্গে জড়িত মানুষজন কিন্তু হন না। তাঁরা মজ্জায় মজ্জায় জানেন, ভুল লজ্জার বিষয় নয়। ঠিকের চেয়ে ভুল দিয়েই মানুষকে চেনা যায় বেশি। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যে কত প্রতিভা সুপ্ত থাকে, তা জানতে গেলে উত্তরপত্রে লেখা তাদের ভুলগুলো পড়তেই হবে।
আলেকজান্ডার একদিন সকালবেলা পুরুর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লেন। পুরুর মা দরজা খুলে দিতে বললেন, “মাসিমা, পুরু আছে?” ‘মাসিমা’ বললেন, “না বাবা, পুরু খেলতে গেছে।” আলেকজান্ডার বললেন, “এলে বলে দেবেন, বিকেলে যুদ্ধ আছে।” এমন ইতিহাস লিখতে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র পারেননি, এডাম স্মিথও না। এ আমাদের বাংলা মিডিয়ামের কিশোরকিশোরীদের পাকা হাতের কাজ। তাদের প্রতিভার কি আর কমতি আছে? একবার প্রশ্ন এল, “রবি ঠাকুর ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেন কেন?” ক্লাস এইটের এক প্রাজ্ঞ ছাত্রী লিখল, জালিয়ানওয়ালাবাগে প্রচুর মানুষকে হত্যা করেছিলেন বলে নাকি রবি ঠাকুরের ‘নাইট’ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাস ‘খুনি’ কবিবরের এই সংবাদে কেঁপে উঠতে পারত। ভাগ্যিস শিক্ষিকা বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন!
কোনো ব্যাকরণবিদ কি স্বপ্নে ভেবেছিলেন, ‘উত্তম’ শব্দের বিপরীত ‘সুচিত্রা’ হতে পারে? অথবা ‘আজানুলম্বিত’ শব্দের অর্থ ‘হাফপ্যান্ট’? আর ‘রামায়ণে’র লেখক যে ‘মহাভারত’, তাই নিয়ে বাল্মীকি বেদব্যাসের ইগো ক্ল্যাশ থাকলেও এ বাংলার অভাগা শিক্ষক শিক্ষিকারা নির্বিকারই থাকেন। কারণ এসব তাঁদের গা সওয়া হয়ে গেছে। প্রাথমিকের শেষ পর্বে এক ছাত্রী লিখল, “আমার দিদিমণিদের আমি খুব শ্রাদ্ধ করি।” ‘শ্রদ্ধা’কে ‘শ্রাদ্ধে’ পৌঁছে দেওয়া তো শুধু একটা আ-কারের ব্যাপার। হাহাকার করে হবে কী? ক্লাস সিক্সে এক মাই ডিয়ার টাইপ শিক্ষিকা ছাত্রীদের বললেন ‘এওয়ে’ দিয়ে বাক্যরচনা করতে। এক পুঁচকি উঠে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞ হেসে বলল, “মিস, ইউ পাস্’ড এওয়ে।” পৃথিবীতে নিজের মৃত্যু সংবাদ শোনার অভিজ্ঞতা খুব কমজনেরই আছে। সেই বিরল প্রাপ্তির ঘায়ে চেয়ারশায়ী শিক্ষিকা আর্তনাদ করে উঠলেন, “কখন?” উত্তর এল, ” ফার্স্ট পিরিয়ডে, মিস। আপনি আমাদের ক্লাসরুমের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেলেন তো!” কে জানে, শিক্ষিকা নিজেই নিজের শ্রাদ্ধাদি সেরেছিলেন কিনা।
এক ইতিহাসের শিক্ষক টীচার্সরুমে বসে মাধ্যমিকের খাতা দেখছিলেন। হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে পাহাড়ি সান্যাল স্টাইলে ঝুঁকে পড়লেন। কী হয়েছে? ব্যাপার কী? পরীক্ষায় প্রশ্ন ছিল, “ইতিহাসে কণিষ্ক’র অবদান সম্পর্কে লেখ।” ছেলে লিখেছে ভালোই। ক্লাইম্যাক্সটা শেষকালে। সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা হয়েছে, “মাথা না থাকতেই কণিষ্ক এতকিছু করেছেন। মাথা থাকলে না জানি তিনি কতকিছু করতেন!” মুণ্ডহীন সম্রাটের অমর কীর্তি বেচারা শিক্ষককে প্রায় মেরেই ফেলেছিল। এক শিক্ষিকাও এমনই উত্তর পাঠ করে হৃদয়ঘটিত সমস্যায় পড়েছিলেন। তাঁর ছাত্রী লিখেছিল, “মীরা বাই ইতিহাসে একজন মাওবাদী হিসাবে বিখ্যাত।” বাদী বিবাদীর চক্করে পড়ে ভাববাদীকে ‘মাওবাদী’ বানানোর মূলে কোন কিষেণজির ভূমিকা আছে, শিক্ষিকা ভেবে আকুল। ‘বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল’ মানে যে “ছায়ার মধ্যে বৃষ্টি”, সেটাই বা কতজন পণ্ডিত জানেন? আর ‘গদাইলস্করি চাল’ দিয়ে বাক্যরচনা? হুঁহুঁ, সে একেবারে ফাটাফাটি। “বাজারে অনেক রকম চাল আছে। কিন্তু গদাইলস্করি চালের জবাব নেই!”
ভুলের ভুলভুলাইয়ায় ঢুকলে বেরোনো মুশকিল। তবু এত মজাদার উদ্ভাবনের কথা ভাবতে ভাবতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে একটু বেহালাও কি বাজে না? ভুল করা স্বাভাবিক। আমরা সবাই করে থাকি। কিন্তু এই ভুল যদি শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশ বা বিবেক নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয় , সে বড় চিন্তার কথা। মাথা না থাকলে যে মানুষের ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়, লেখার আগে একবারও ছাত্র সেকথা ভাবল না? বিশ্ববরেণ্য কবি বন্দুক হাতে জালিয়ানওয়ালাবাগে শয়ে শয়ে মানুষকে হত্যা করছেন, একথা ভাবতে ছাত্রীর বিবেকে বাধল না? তবে কি শিক্ষা জীবন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে? তবে কি লেখাপড়া বুদ্ধি, অনুভূতিহীন এক আনুষ্ঠানিক ব্যাপার মাত্র? পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই না পড়ে পড়ে কি শিক্ষার্থীর হৃদয়রাজ্যে চড়া পড়ে যাচ্ছে? সে শুধু টিক দিচ্ছে, শূন্যস্থান পূরণ করছে, ‘ঠিক ভুল’ বের করছে । সে ভাবছে না, বিশ্লেষণ করছে না, সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে না।
বুদ্ধি নেই, তাই বা বলি কীকরে? এক বুদ্ধিমান ছাত্রীর কাণ্ড দিয়েই শেষ করব। ড্রইং পরীক্ষায় বেড়াল আঁকতে দেওয়া হয়েছে। ক্লাস ফাইভের কুচি মেয়ে গম্ভীর মুখে বিরাট এক বেড়াল আঁকছে খাতার পাতা জুড়ে। নিচের ডানদিকে লিখেছে “পি টি ও”। দিদিমণি তো অবাক। জিজ্ঞেস করলেন, ” ড্রইং খাতায় পি টি ও কেন?” ছাত্রী জানাল তার মা বলে দিয়েছেন, উত্তর এক পাতায় না আঁটলে পরের পাতায় যেতে হলে ঐ কথা লিখতে হয়। তার বেড়াল এত বড় হয়েছে, যে সেই অনুপাতে একটি পেল্লাই লেজ দরকার।সেই লেজ এই পাতায় আঁটবে না। তাই সে ঠিক করেছে “পি টি ও” লিখে পরের পাতায় মনের সাধ মিটিয়ে লেজখানা আঁকবে। এমন ভাবনা ভাবতে পারতেন লিওনার্দো?”
আমরা সবাই হেসেছি খুব । আপনারাও হাসুন…

ক্রমশ

(কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমানে আঘাত বা আরোপ- এ লেখনীর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য নয়। যে কোনো প্রকার সাযুজ্য আকস্মিক কিংবা দৃশ্যপট নির্মাণে সংবন্ধিত।)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।