গল্পে সোনালি

চড়ুই ভাতি

সবাই মিলে হইহই করতে করতে এসেছে ।
পাড়ার প্রায় আট নটা পরিবার একসংগে বেরিয়ে পড়েছে আজ ।
পৌষের সকাল । কুয়াশা মাখা ভোরের হাওয়ায় কাঁপন ধরছে মানুষের ।
ছেলেরা কেউ কোট প্যান্ট , হাত পকেটে ঢোকানো । কেউ সংগে টুপি মাফলারও ।
মহিলাদের গায়ে ছোট বড় মাঝারি ঝুলের সোয়েটার । সংগে স্টোল সাল ইত্যাদির বাহার । বেশির ভাগ পায়েই আঙ্গুল দেওয়া মোজা ।
একটু কম বয়েসীরা ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে জিনস । মোদ্দা কথা সাজের বাহার খুব । একেবারে রামধনু রঙ গয়নাগাটি , লিপিস্টিক , টিপ , স্নিকার্স , হাই হিল এবং অবশ্যই কায়দার রোদচশমা ।
রেব্যানের চকচকে মিরর ফ্ল্যাশ লেন্সের পিছনে বন্দনের চোখগুলো দেখা যাচ্ছিল না । কার দিকে তাকাচ্ছে বা কি এক্সপ্রেশান বোঝার কোন উপায় নেই । মুখে আলগা হাসি ভাসিয়ে রেখে সবার কথাবার্তা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল সে ।
অরুন্ধতী পাশের পুরনো ফ্ল্যাটবাড়ির মেন গেট থেকে দেখছিল ওকে ।
বন্দনদের ফ্ল্যাটের সামনে একটা ইনোভা একটা টাটা সুমো দাঁড়িয়ে । কিছু বৌদি মাসিমা কাকিমা এসে বসে গেছেন দুই গাড়িতেই । বাচ্চারা ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়িদুটোর আশেপাশে ।
অরুন্ধতী আজ লাল পালাজো ,কালো লম্বা হাতা টি শার্ট আর জ্যাকেটে স্মার্ট । টপ নটে একটা ঘুঙুর ঝুলে থাকা কাঁটা । ঠোঁটে ডার্ক চকোলেট লিপস্টিক । তার চশমা সাইজে বড় কিন্তু ফ্ল্যাশ লেন্সের মত চকচকে না । হালকা কালো ছায়া ।
বন্দনরা নিজেদের গাড়ি নিয়ে যাচ্ছে । বাবা মাকে নিয়ে বন্দন নিজেই ড্রাইভ করবে আকাশিনীল ওয়াগনারটা ।
এত মজা হচ্ছিল পিকনিক স্পটে , হঠাৎ বন্দনের শ্বাস কষ্ট শুরু হওয়াতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল । দৌড়াদৌড়ি করে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করছিল সবাই এত বেশি কষ্ট দেখে ।
বয়স্করা অস্থির হয়ে বলাবলি করছিলেন , দ্যাখো দেখি কি কাণ্ড ? হাসিখুশি হেলদি ইয়াং ছেলে , সকাল থেকে হই হই করছে সবার সংগে , খেলো সবার সাথে বসে । হঠাৎ কি হয়ে গেল ?
কাজে জয়েন করে পেশেন্টের আদ্যোপান্ত বিবরণ নেওয়া এবং চার্টে লিখে ফেলাটাই সবার আগে শিখতে হয়েছিল অরুন্ধতীকে ।
রোগীর ছোটবেলা থেকে কী কী অসুখ হয়েছে , বাবা মায়ের কোন অসুখ আছে কিনা , হাঁটার ভঙ্গী , মুখের এক্সপ্রেশান , কোন বিশেষ অভ্যাস বা নেশা , নখ , দাঁত , চামড়া ; মোটমাট একটা মানুষের যাবতীয় খুঁটিনাটি কেস হিস্ট্রি হিসেবে লিখে মনে রাখতে হয় নার্স এবং ডাক্তারদের ।
অরুন্ধতী আলিপুরের এক নামজাদা নার্সিং হোমে ট্রেনি নার্স হিসেবে কাজ পেয়েছে এই ছ মাস হল । বাড়ির সবাই খুব খুশি । পুরনো ফ্ল্যাট বাড়িতে আগে একতলাতেও ফ্ল্যাট হত ।সেই আমলেরই একটা এক ঘরের ছোট্ট ফ্ল্যাটে ওরা দুই বোন থাকে বাবা মায়ের সংগে ।
একটা গাছের তলায় ছায়ায় দাঁড়িয়ে নির্বিকার মুখে অরুন্ধতী দেখছিল ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খাচ্ছে বন্দন ।
ওর মনে পড়ছিল মাস পাঁচেক আগে পায়ে চোট নিয়ে ওর ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিল বন্দন ।
“ আপনাকে চিনি মনে হচ্ছে যেন ?”
সপ্রতিভ পেশেন্ট হাসিমুখে আলাপ করেছিল বিছানা থেকেই । ঘনিষ্ঠতা কার দোষে বা গুণে এগিয়েছিল , কে জানে ?
কখন পেশেন্টের বলিষ্ঠ হাতের টানে তার বুকের মধ্যে পড়ে গলো গিয়েছিল ট্রেনি সিস্টার তার হিসেব কেউ রাখেনি ।
ডিসচার্জড হয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর একতলার অন্ধকার ঘর থেকে বেরোনো নার্সকে আর চিনতে পারেনি আইটির স্মার্ট এগজিকিউটিভ বন্দন রায় । ফোন করলে কেটে দিয়েছে ।
আজ খুব ছোট্ট করে ভাঙ্গা চিনে বাদামের কুচিগুলো ভাজা ফিসফিঙ্গারের ভিতর একটু একটু করে ঢুকিয়ে দিয়ে কাগজের প্লেটটা পাশের বাড়ির বাবলুর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল অরুন্ধতী ।
যা তো , বন্দনদাকে দিয়ে আয় ত রে , ওরা মনে হয় পায়নি ।
ওর মনে ছিল কেস হিস্ট্রিটা ।
হাসপাতালের ফাইলে নোট করা ছিল , মিস্টার বন্দন রায় হ্যাজ অ্যাকিউট পিনাট এলার্জি ।
চিকিৎসা শাস্ত্রের সংগে যুক্ত মানুষ মাত্রেই জানেন , এ ধরনের এলার্জী থাকলে সে মানুষের এক কুচি চিনা বাদাম থেকেও মারাত্মক রিঅ্যাকশান হয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে ।
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা অরুন্ধতীকে দেখে বোঝার উপায় নেই ছটফট করতে থাকা বন্দনকে দেখে কি ভীষণ খুশি হয়ে উঠছে ওর ভেতরটা ।
এই রকমই কষ্ট হত যে ওর ও , দিনের পর দিন , ব্যবহার করা পুরোনো চপ্পলের মত অনায়াসে বন্দন ওকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল যখন ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।