আবার এসেছে? কতবার বারন করি সবসময় ওনাকে প্রশ্রয় দিওনা, সময় নেই অসময় নেই চলে আসে।
আঃ, আস্তে বলোনা, উনি বাইরের ঘরেই বসে আছেন সব শুনতে পাবেন তো। একা থাকেন তাই মাঝেমধ্যে কথা বলতে আসেন, তোমার এতে কি সমস্যা, কথা তো আমি বলি।
স্বামী-স্ত্রী ; অভিজিৎ আর তমালিকা, এতক্ষন যাকে নিয়ে কথা বলছিলেন তিনি তাদের প্রতিবেশী, সুতনুকা রায়। চল্লিশ পেরিয়েছেন হয়তো মহিলা, একাই থাকেন, স্বামী ছেড়ে গেছিলেন বহু বছর আগেই, একমাত্র মেয়েও শ্বশুরবাড়ির ভয়ে মায়ের কাছে আসতে পারেনা, এমনটা সুতনুকা বলেন, আর ঠিক যেটা অভিজিৎ বিশ্বাস করেননা। বলেন-“একজন মহিলা, তার জীবনে, মেয়েদের জীবনের যতরকম ট্রাজেডি হতে পারে, সবই কি ওনার সাথে হয়েছে? যত্ত আজগুবি গল্প ফেঁদে লোকের সহানুভূতি আদায় করে, আর তোমার মত কিছু মানুষের দরদ উথলে ওঠে। জিজ্ঞেস করেছ, কেউ নেই তাহলে বাড়িভাড়া কিকরে জোটে?”
তমালিকা চাপা গলায় বলেন- “তাতে তোমার কি পাকা ধানে মই দিচ্ছেন উনি? সবসময় মানুষকে সন্দেহ করাটা তোমার বদ-অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে। আর তাছাড়া তুমি তো ওনাকে চোখেও দেখনি, তুমি থাকলে হয়ত উনি সঙ্কোচেই আসেন না, আসার কথা শুনেই তুমি যা রাগারাগি করো, হয়তো কখনো শুনতে পেয়েছেন!”
“হ্যাঁ, শুনতে পেয়েছেন? কিকরে পাবেন, আমি বাড়ি থাকাকালীন এই নিয়ে দুবার ওনার আসার খবর শুনলাম, মুখোমুখি হইনি। কিন্তু তুমি ওনাকে নিয়ে যা বাড়াবাড়ি শুরু করেছ তাতে বিপদে পড়বে বলে দিলাম। তাই আমাকে এবার সরব হতেই হচ্ছে” একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ল অভিজিৎ এর গলায়।
“আচ্ছা, আচ্ছা, এবারের মতো থামো, সুতনুকাদি বাইরেই বসে আছেন। সামনাসামনি অপমান নাই বা করলে, এখনকার দিনে সবাই আপনি কোপনি, কেই বা শোনে কার কথা? দীপু স্টেটসে চলে গেল, তুমিও অফিসে চলে যাও, আমি কি করি? তাও সুতনুকাদির সাথে দুটো কথা বললে মন হাল্কা হয়।”-বলেই আর কথা না বাড়িয়ে বাইরের ঘরে এসে তমালিকা দেখেন সুতনুকা ম্লান মুখে, উদাস হয়ে দীপুর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে। কিছু কি শুনতে পেয়েছে? সামলে নিয়ে সহজভাবে তমালিকা জিজ্ঞেস করেন-“একটু চা করি?” সুতনুকা যেন অকারনেই চমকে যান খানিকটা, তমালিকাও হকচকিয়ে আবার বলেন-“চা করি দিদি?” সঙ্গেসঙ্গে সুতনুকা নিজের স্বভাবসিদ্ধ মৃদু হাসি সারা মুখে ছড়িয়ে বলেন-“চা, পরে কোরো, এই ছবিটা কখন তোলা?”
তমালিকা বলেন-“ও তো দীপু তখন চার বছরের, সালটা…হুমম, ১৯৯৯, আমরা সিমলা গিয়েছিলাম গরমের ছুটিতে।”
“ও, আমার মেয়ে তখন ন বছরের ছিল, ও কোনোদিন পাহাড়, সমুদ্র কিছুই দেখেনি জান, আমি গিয়েছিলাম একবার ওর বাবার সাথে পুরী, ও তখন হয়নি, কি বড়বড় ঢেউ, আমাদের গাড়িটা একটা বাঁক নিতেই প্রথমবার সমুদ্র দেখলাম”, কথা বলার সময় চকচক করছিল সুতনুকার চোখ, যেন সমুদ্র ভিজিয়ে দিয়ে শিহরণ তুলছে ওনার মধ্যে, হারিয়ে গেছেন তরুণীবেলার সুতনুকার মধ্যে। তারপরই হঠাৎ ফিরে এলেন বিষাদময় বর্তমানে, “মেয়েটা জন্ম থেকে বাবাকেও পেলনা, আর বিয়ের পরও শান্তি পেলনা, আসলে কি বলতো, নিজের সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে তড়িঘড়ি ওর বিয়েটা দিয়ে ভুল করে ফেলেছিলাম। আমি আজীবন শুধু ভুল করে গেছি। যাকে ভালবেসে বিয়ে করলাম সেই, মেয়ের গর্ভে আসার খবর শুনেই ছেড়ে চলে গেল!”
”কিন্তু কেন গেল দিদি?”-তমালিকা কৌতুহলী।
“আমার কপাল”, প্রতিবার এই একই উত্তর দেন সুতনুকা, তারপর নীরব হয়ে যান অনেক্ষন। অন্যদিন তমালিকা অপেক্ষা করেন, অনুভব করেন ব্যাথা। আজ অধৈর্য্য লাগলো, হয়ত সন্দেহের বীজটা ভালোই বুনে দিয়েছেন। তমালিকা জিজ্ঞেস করে-“তাহলে আপনার এখন চলে কিকরে?”আচমকা এরকম প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন সুতনুকা-“আগে কোনোদিন তো জিজ্ঞাসা করোনি?যাক, আমি এখন ঠোঙা বানাই, আর দোকানে বিক্রি করি, মশলাও বানাই, তবে ভয় নেই তোমাকে খরিদ্দার করতে আসিনা, এখানে এলে একটা পরিপূর্ণ সংসারের আরাম পাই, স্বপ্ন দেখি, আজ আসি।”
সুতনুকা চলে যান। স্তম্ভিত তমালিকার চোখে জল আসে,”ছি, ছি, অকারণে সন্দেহের বশে কত কষ্ট দিল, একজন ক্ষতবিক্ষত মানুষকে! অভিজিৎ এর ওপর রাগ হয়।বিকেলে গাজরের হালুয়া বানিয়েছিলেন তাই একটা টিফিন কৌটোয় ভরে অভিজিৎকে দিয়ে বলেন-“যাও, সুতনুকাদিকে দিয়ে এসো, তোমার কথার জন্যই মানুষটাকে শুধুশুধু হেনস্থা করলাম, তুমিই মেটাও।”
অভিজিৎ বলেন-“আরে কি মুশকিল, আমি কি ওনাকে চিনি, দেখিওনি, বাড়িও চিনিনা।” কিন্তু তমালিকার খর চোখ দেখে আর কথা বলার সাহস হয়না, অভিজিৎ জানেন এই দৃষ্টির মানে। আপাত শান্ত তমালিকার এরকম রাগ খুব কম হয়, এসময় অভিজিৎ এর বুক কাঁপে, অজানা, গোপন অপরাধবোধের ভয়ে। চুপচাপ টিফিন কৌটো নিয়ে তমালিকার বলা দিক নির্দেশিকা মেনে খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়না সুতনুকার বাড়ি। অপরিচিতার বাড়িতে হুট করে এসে অস্বস্তি নিয়ে বেল বাজান অভিজিৎ। আর তারপরই হতবাক হয়ে বলেন-”তুউউমি?”
সুতনুকার মুখে স্বভাবসিদ্ধ হাসি, তবে এবার বিদ্রুপের।
জীবনটা চক্রের মত, যা করেছ তার সবটুকুই ফিরে আসবে, তাকেও ফিরতে হবে সেই জায়গায় যেখান থেকে সে ভুল শুরু করেছিল।