সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শ্রীরাজ মিত্র (পর্ব – ১১)

ছায়াপথ, গুঁড়ো ছাই

মীরাবাঈ যেমন কৃষ্ণ ভজনা ও প্রেমকে এমন এক ভক্তিযোগের উচ্চমার্গে নিয়ে গেছেন যার কাছে নতি স্বীকার করেছে সময়। ঠিক তেমনই আজ এক অন্য মেয়ের গল্প শোনাই চলো। যাঁর রাজপাট ছিলনা বটে তবে তিনি রানী ছিলেন, এই বলে প্রকাশ ব্যানার্জী বললেন- ১৯৭০এর মাঝামাঝি, আমার এক পরিচিত ছিলেন, তিনি প্রথম দেখেন ওনাকে। ব্যাস ঐ একবারই! নাগাদের কোহিমায় সেসময় তিনি অজ্ঞাতবাসে কাটাচ্ছেন। ঘুরতে বেরিয়ে দেখেন এক বিশাল বিভাগীয় বিপণী। নাম Dass & Co.! বিদেশের মাটিতে বাঙালির দোকান, দেখা মাত্র আনন্দের আর সীমা নেই। সামনে দাঁড়িয়ে মহার্ঘ এক মার্সিডিজ গাড়ি। তার বনেটে সাদা পতাকা। দোকানে ঢুকতে যাবেন দেখেন দরজার পাশে স্টেনগানধারী তিনচার জন গাঁট্টাগোট্টা লোক! ইশারায় নিষেধ করলো ঢুকতে। কাউকেই তখন ঢুকতে দিচ্ছে না। ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছেন উল্টোদিকের ফুটপাতে। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এলেন কালো চশমায় চোখ ঢাকা বছর পঞ্চাশের এক মহিলা। গায়ের রঙ খুব ফর্সা। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় কয়েকজন নাগা ভাষায় চীৎকার করে উঠলো, মনে হলো জয়ধ্বনি দিচ্ছে তারা। মহিলা তাদের দিকে হাত নেড়ে উঠে পড়লেন গাড়িতে। নিমেষে বেরিয়ে গেল মার্সিডিজ। পরে শুনেছিলেন উনি নাগাদের কোন এক রানী, নাম গাইন্দিল্যু !
পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনা! তবে এবছর ১৫ আগষ্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখে নামটা শুনে আবার মনে পড়ে গেল তাই। রাজা রামমোহনের মতো এনারও কোনো রাজত্ব ছিলো না, তবে একসময় ছিলেন নাগাদের অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী। ‘আমরা স্বাধীন হয়ে জন্মেছি, কোন শ্বেতাঙ্গের অধীনে বাঁচার জন্য নয়’ একথায় সোচ্চার তুলে জিতে নিয়েছিলেন নাগাদের হৃদয়।
১৯১৫ সালে মণিপুরে এক নাগা উপজাতি পরিবারে জন্ম হয় তাঁর। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি আট ভাইবোনের সংসারে পঞ্চম কন্যাটি। এগারো বছর বয়সে তুতোভাই হাইপাও জাডনাঙের কাজকর্মে ভীষন ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন তিনি। বছর দশেকের বড় ভাইটি উত্তর পূর্বাঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে তখন “হেরাকা” নামে এক ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করছিল। কয়েকবছরের মধ্যেই নাগা ও মনিপুরের বহু উপজাতি তাঁর নেতৃত্বে ঐ পার্বত্য এলাকায় শুরু করে সশস্ত্র বিদ্রোহ। গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিলেন সেদিনের সেই ছোট্ট একরত্তি মেয়েটাও। ১৯৩১এর গোড়ার দিকে হাইপাও ধরা পড়ে যান এবং সংক্ষিপ্ত বিচারের পর ইম্ফল কারাগারে তাঁর ফাঁসি হয়।
ততদিনে বেশকয়েকটি সফল গেরিলা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে সংগঠনে নামডাক হয়েছে মেয়েটির। হাইপাও এর পর নাগা বিদ্রোহীরা তাঁকেই মেনে নেয় পরবর্তী নেতা হিসেবে। বয়স তখন তাঁর মাত্র ষোল! আর দায়িত্ব হাতে পেয়ে প্রথমেই সে স্বাধীনতার ডাক দিয়ে আদিবাসীদের সরকারি খাজনা দিতে বারন করে দিল। সেই সাথে নিষিদ্ধ করল বৃটিশ প্রশাসনের সাথে সবরকমের সহযোগিতা। এ যেন এক অন্য অসহযোগ!এতে বিপদে পড়ল ইংরেজ সরকার, শুরু হলো তাঁকে ধরার জন্য বিশেষ অভিযান। সন্ধান দেবার জন্য ঘোষণা করা হলো দশহাজার টাকা পুরস্কার! এর মাঝেও বিশ্বস্ত একদল অনুচর নিয়ে আসাম মনিপুর ও নাগা পার্বত্য অঞ্চল গুলোতে চরকির মতো ঘুরে ঘুরে আদিবাসীদের সংগঠিত করতে লাগলেন গাইন্দিল্যু !
১৯৩২ সালে উত্তর কাছাড়ের এক গ্রামে তাঁদের ঘিরে ফেলেছিল প্রায় আসাম রাইফেলসের সেনা। ভয়ঙ্কর গুলির লড়াইয়ের পর জাল কেটে বেরিয়ে যান। ঘটনার পর ক্যাপ্টেন ম্যাকডোনালড নামে এক অভিজ্ঞ সেনানায়ককে দেওয়া হয় তাঁকে ধরার ভার। ততদিনে ইংরেজদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে ঐ কিশোরী।
ঐ বছরের অক্টোবর মাসে পুলোমি নামে এক নাগা গ্রামে সেনাবাহিনীর অতর্কিত হামলায় সঙ্গীদের নিয়ে ধরা পড়ে যান গাইন্দিল্যু। বেশিরভাগ বিদ্রোহীদের ফাঁসি হলেও তাঁকে আজীবন কারাবাসের সাজা দেওয়া হয়। ১৯৩৩ থেকে১৯৪৭ ছিলেন গৌহাটি শিলং এবং আইজলের জেলখানায়। নেহেরুজী তাঁর আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ তে লেখেন- “What suppression of spirit they have brought to her who in pride of her youth dared to challenge the Empire…And India does not even know of this brave child of her hills.” তিনিই গাইন্দিল্যু কে নাগাদের রানী উপাধিতে ভূষিত করেন। দীর্ঘ পনেরো বছর পর দেশ স্বাধীন হতে বেরিয়ে আসেন কারাগার থেকে। জেল থেকে বেরিয়ে রানী দেখলেন পনেরো বছরে বদলে গেছে চেনা জগতটা। ততদিনে খ্রীষ্টান মিশনারীরা জাঁকিয়ে বসেছে পাহাড়ে, চলছে ঢালাও ধর্মান্তরীকরণ। শুধু তাই নয় মাইকেল স্কটের মতো কিছু বৃটিশ যাজক টাকা দিয়ে মদত দিচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে। খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বী আঙ্গামী ফিজো’র ডাকে হাজার হাজার সরল পার্বত্য মানুষগুলো সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের বিরুদ্ধে তুলে নিয়েছে হাতিয়ার। মদত দিচ্ছে প্রতিবেশী পাকিস্তান। রুখে দাঁড়ালেন রানী। মিশনারীদের সমর্থনে তখন ফিজো ও তার নাগা ন্যাশনাল পার্টির আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা। তারা চায় স্বতন্ত্র রাষ্ট্র নাগালিম। অন্যদিকে ধর্মান্তরীকরণের বিরোধীতা করে রানী যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই তাঁর মাতৃভূমি Zeliangrong অঞ্চলের জন্য দাবি করলেন স্বায়ত্ত্ব শাসনের অধিকার। আবার শুরু হলো লড়াই। শত্রু এবার তাঁর স্বজাতিরাই। হাজার খানেক সশস্ত্র নাগা যুবককে নিয়ে আত্মগোপন করলেন রানী। সাতবছর পর ১৯৬৬ সালে সরকার ও NNC দলের সাথে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবার পর প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসেন। ততদিনে মাইকেল স্কট সহ বেশ কয়েকজন মিশনারীকে দেশ থেকে বহিস্কার করেছে ভারত সরকার। নাগাদের দাবীদাওয়া পূরণে এবার শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নামলেন রানী। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে তাম্রপত্র এবং ১৯৮২তে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়া পেয়েছেন বিবেকানন্দ সেবা পদক ও মরণোত্তর বিরসা মুন্ডা পদক। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে ডাকটিকিট ও মুদ্রা চালু করা হয়। সময়ের সাথে সাথে রানী ও তার ‘হেরাকা’ আন্দোলন জনপ্রিয়তা হারায়। ১৯৯৩ এর ১৭ ফেব্রুয়ারী ইহলোক ত্যাগ করেন স্বাধীনতা সংগ্রামের এই মুকুটহীন ‘রানী’!
মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর এ অবদানের কথা কেউ মনেও রাখেননি। অবহেলিত ও বিস্মৃতপ্রায় ‌আজ নিজের জন্মভূমিতেই!‌ এই বলে প্রকাশ ব্যানার্জী থামলেন।
মাস্টার বলল- আজ কত তারিখ বলুন তো প্রকাশ দা? আচমকা এ প্রশ্নে আমরা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিলাম। প্রকাশ ব্যানার্জী চুপ! আমিও ভাবলাম বোধহয় কিছু একটা…। দিয়ে নিজেই বললাম, ‘কেন… ষোলই আগস্ট?’ মাস্টার বলল- ‘কেন মানে? আজকের দিনেই শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস বিদায় নিয়েছিলেন। সেদিন ১৬ অগাস্ট, সোমবার, রাত একটার কয়েক মিনিট পর শ্রীরামকৃষ্ণদেব চলে গেলেন।
সকাল হল। খবর ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। অনেকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না শ্রীরামকৃষ্ণদেব মারা গেছেন।অনেকে আবার ভেবেছিলেন সমাধি হয়েছে, বোধহয়।
যে ডাক্তারবাবু চিকিৎসা করতেন ডা৹ মহেন্দ্রলাল সরকারের কাছে লোক পাঠানো হল। তিনি এলেন প্রায় বেলা একটা নাগাদ।
রামকৃষ্ণের দিকে অনিমেষ নয়নে কিছুক্ষণ বিভোর হয়ে চেয়ে রইলেন। আর তারপর শবদাহের ব্যবস্থা করতে বলে। ডাক্তার চলে গেলেন। দুর্মুখ ডাক্তার আর কার সঙ্গে ঝগড়া করবেন? একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল তাঁরও ! যাওয়ার আগে পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বার করে বললেন, এই নাও। একটা ফটো তোলার ব্যবস্থা করো।
বুকের মধ্যে তাঁরও কোথায় যেন একটা যন্ত্রনা! জীবনে কাউকে তো কোনদিন ভালবাসেননি।
সবাই বাইরেটাই দেখল, শুধু একজন চিনেছিল।
সেই আমলে বত্রিশ টাকা ভিজিটের ডাক্তার সরকার ভাবলেন, সেদিন আর তিনি চেম্বারে যাবেন না। ডাক্তারের ঘরবন্ধ করে প্রাণভরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে যে বড়!
এদিকে আকাশেরও মন মেঘলা।তখন বিকেল পাঁচটা। দোতলা থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের দেহ নামিয়ে রাখা হল অজস্র সাদা ফুল দিয়ে সাজানো পালঙ্কে শায়িত অবস্থায় । ভক্তরা শ্বেতচন্দন মাখিয়ে দিল সারা শরীরে।চারিদিকে সুগন্ধি ভেসে বেড়াতে লাগল। শবযাত্রা এগিয়ে চলল কাশীপুর মহাশ্মশানের দিকে।
নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর গুরুভাইরা বিষাদমুখে এগিয়ে চলেছেন।
আজ ঠাকুরের নরেন যেন রিক্ত হয়ে গেলেন।চোখে জল।সন্ন্যাসী বলে কি কাঁদতে নেই? ভক্ত ভৈরব গিরিশের চোখ কেঁদে কেঁদে লাল।
অনেক মানুষ হেঁটে চলেছেন সে শবযাত্রায় । আকাশ থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল।
তবে কি আকাশও কাঁদছে? কোনও কোনও ভক্ত আবার বলতে লাগলেন, আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে!
সেই বৃষ্টির জল সারা শরীরে মেখে পরম ভালবাসায় স্টার থিয়েটারের সমস্ত নট-নটী কলাকুশলী সবাই হাঁটছেন।
তাঁদের মনের মানুষ আজ চলে গেলেন।
সেদিন সেই শবযাত্রার মিছিলে একটি আশ্চর্য জিনিস দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল!মিছিলে শ্রীরামকৃষ্ণের সেই সর্বস্ব ত্যাগী যুবক শিষ্যদের এক একজনের হাতে রয়েছে হিন্দু ধর্মের ত্রিশূল ও ওঁকার, বৌদ্ধ ধর্মের খুন্তি, মোহম্মদীয় ধর্মের অর্ধচন্দ্র এবং খ্রিষ্ট ধর্মের ক্রুশবাহিত পতাকা।
মৃত্যুর পরও তাঁরা ভোলেননি
“যত মত তত পথ” -এর সেই কথা।
সর্বধর্মের প্রতীক নিয়ে শবদেহের এরকম মিছিল পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা হয়ে রইল।
শ্রীরামকৃষ্ণের প্রয়াণের পর রবীন্দ্রনাথ যে কবিতা স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত ” উদ্বোধন ” পত্রিকায় লিখেছিলেন-
” বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তাঁরা।

দেশবিদেশের প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।”

ক্রমশ…

(কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমানে আঘাত বা আরোপ- এ লেখনীর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য নয়। যে কোনো প্রকার সাযুজ্য আকস্মিক কিংবা দৃশ্যপট নির্মাণে সংবন্ধিত।)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।