সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ২৮)

রেকারিং ডেসিমাল

উৎসবের আমেজ বাড়িতে।
নতুন মানুষ আসার আনন্দে। নতুন মাকে ঘিরে।
সপ্তামৃত হল। শ্বাশুড়ি মা সকালে বাজারের থেকে সকলের জন্য রান্নার ফর্দ মিলিয়ে জিনিসপত্র আনতে গেলেন রিকশা করে। বাজারের সাথে জুইঁফুলের মালা এনে রেখে দিলেন ফ্রিজে।
নতুন বউয়ের মাথায় এত্ত চুল। খুলে দিলে হাঁটুর নিচে পড়ে। সে ফুল ভালো বাসে। আচার অনুষ্ঠানের আগে লাল টুকটুকে নতুন শাড়ি পরা বউয়ের হাতে ফুলের প্যাকেট ধরিয়ে দেন শ্বাশুড়ি।
— নে, জীবনে ত সাজিস না। ওই একখানা লাল টিপ আর শাঁখা পলা। ফুলটা লাগাও খোঁপায়।
শ্বাশুড়িকেই লাগাতে হয় মালা, ক্লিপ কাঁটা দিয়ে।
চওড়া বারান্দায় এয়োরা উলু আর শাঁখের আওয়াজ তোলে।
দিদার মুখে এক গাল হাসি।
এই সাত মাসের হই চইয়ের পর আবার সাধ ভক্ষণ।
এ বাড়ির পর, বউয়ের বাপের বাড়িতে অনুষ্ঠান।
হঠাৎ সেইখানেই ফোন এল।
বিকেলে শ্বশুর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রস্ট্রেট অপারেশন হবে বলে।
শুরু হল ছোটাছুটি।
পায়ের ফ্র‍্যাকচার কিছুটা জোড়া লাগলেও বাসে ট্রামে ওঠার মত অবস্থা ত নয়। তবু কর্তাকে দেখতে যেতে চান শ্বাশুড়ি।
বউ বেরিয়ে আনোয়ার শাহ রোড থেকে ট্যাক্সি ধরে বাড়ির সামনে নিয়ে আসে। পা ভাঙা রুগিকে রাস্তায় হাঁটতে দিতে তার ইচ্ছে নেই।
তিন চার দিন যেতেই, দিদা কুন কুন করতে থাকেন নতুন বউয়ের কানের কাছে।
তোমরা হইলা ডাক্তার। তাও কই। আমি দেখসি। এক্ল্যাম্পসিয়া।
বাচ্চা পেটে থাকতে খিঁচুনি হইয়া মইরা যায় মা। জানো?
চমকে যায় ডাক্তার বউ।
সে ত অবশ্যই জানে।
অনেক এক্ল্যাম্পসিয়া রুগি সামলাতে হয়েছে সরকারি হাসপাতালে ডিউটি করতে করতে। আর তার বেশিরভাগ রুগিকেই বাঁচানো মুশকিল হয়েছে।
কিন্তু এই অশীতিপর বৃদ্ধা এই খটমট ডাক্তারি জ্ঞান আওড়াচ্ছেন কি করে ?
মুখের বিস্মিত ভাব দেখে মুচকি হাসেন ঘোমটা টানা অভিজ্ঞতা।
বলেন, ভাব কি? হ, আমি কাশী ডাক্তারের ভাগ্নী। ঘোড়ায় চইরা সারা গ্রামে আবার দূরে ও, রুগি দেখতেন মামা। আমার ত কূলীন বাপ। কোন দিন দেখি নাই চক্ষে। মামার কাসেই বড় হওয়া। তিনিই বিয়া দিসিলেন।
দেখসি আমি।
এক খান আচমকা হাঁচির আওয়াজেও খিঁচুনি উইঠ্যা মইরা যায় পোয়াতি।
আর তুমি এই অফিস টাইমের বড় রাস্তায় রোজ গাড়ি ধরতে দৌড়াও।
কিছু হইলে, আমার বংশধরের সর্বনাশ। কুমার বিকালে যায় হাসপাতালে। তাই অর মায়েরে সকালে যাইতে লাগে।
আমি কিস্যু কমুনা। তুমি তোমার বাপেরে ফোনে ধরো। আমি বলাইরে কইতাসি। সে বুঝাইয়া কউক কুমরারে। ছুটি নিতে আপিসে।
এইটা দরকার।
নতুন বউ টের পায় আস্তে আস্তে, ঘরেলু মহিলাদের একটা নিজস্ব আমলাতন্ত্র, রাজত্বের ধারা, কূটনৈতিক ধরন আছে। এ মহিলা মহলকে এই ভাবেই টিকে থাকতে হয়।
তার নিজের বাড়িতে অফিস করা, সন্ধ্যা বেলা টেলিগ্রাফ, স্টেটসম্যান পড়া মায়ের জীবন, লড়াই এদের থেকে অনেক আলাদা।
এঁদের আরাম অনেক বেশি। আর সম্মান অনেক কম।
এখানে মহিলারা এখনো মেয়ে মানুষ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।