সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শ্রীরাজ মিত্র (পর্ব – ৯)

ছায়াপথ, গুঁড়ো ছাই

গল্প চলছিল রামায়ণকে কেন্দ্র করেই। হঠাৎ পরিমল সকলের একঘেয়েমি কাটাতে গল্প জুড়ে বসে। এমন ভাবে গল্প বলা শুরু করল, যেমন করে কিশোর বয়সে আমরা গল্প শুনতে অভ্যস্ত ছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে পরিমল বলল- তা সে অনেকদিন আগেকার কথা । এক শহরের এক স্কুলে একই ক্লাসে পড়ত তিন বন্ধু। অভিন্ন হৃদয়। সুতরাং পাশাপাশি বসা থেকে শুরু করে খুনসুটি, ফাজলামি সবই চলত নৈমিত্তিক হিসাবেই। তিনবন্ধুর মধ্যে প্রথম জন পড়াশুনোয় ছিল বেশ মেধাবী। জীবনে কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়নি।স্কুল, কলেজ,ইউনিভার্সিটি যে কোনও পরীক্ষাতেই সে টপার।দ্বিতীয় বন্ধুটি মধ্যমেধার | ফেল কখনও করেনি বটে কিন্তু মেডেলও কোনোদিন জোটেনি। ঐ কোনোক্রমে ক্লাসের গন্ডি পার।আর তৃতীয়জন হাত সাফাইয়ে জিনিয়াস। স্কুল থেকেই বদসঙ্গে মেলামেশা। লোক ঠকিয়ে টাকা উপায়ে তখনই সিদ্ধহস্ত | লেখাপড়ার ধার ধরেনা তেমন।পরীক্ষার সময় তার ক্লাসের বৈতরণী পার করার দায়িত্ব পড়তো বাকি দুই বন্ধুর ওপর। যদিও তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই তৃতীয় জনের। স্কুলের পাশে কালভার্টে বসে পা ঝুলিয়ে বসে চলত তিন বন্ধুর আড্ডা |
এবার স্কুল গন্ডি পার করে সবাই নিজের রাস্তা ধরল।একদিন তাদের পড়াশুনোও শেষ হল।প্রথমজন প্রথম থেকেই জিনিয়াস । ফলে হলও তাই। ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসে প্রথম হয়েই সরকারি অফিসার হিসেবে তিনি যোগদান করলেন তাঁর কর্মজীবনে। পরবর্তীতে যিনি ভারতীয় রেলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিলেন। দ্বিতীয়জন ফিজিক্স অনার্স নিয়ে স্নাতক হয়ে প্রস্তুতি নিতে বসলেন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার। কৃতকার্যও হলেন | নিযুক্ত হলেন সরকারি অধিকর্তা হিসাবে | অনেক মালা গলায় যেদিন প্রথম চেয়ারে বসলেন, একটি ছেলে ঘরের ভিড়ে একটা গাঁদাফুলের মালা হাতে দাঁড়িয়ে দেখছিল তাঁকে । ছেলেটির হাতের মালা হাতেই থেকে গেল। সবাই হতবাক । ততক্ষণে চেয়ারে বসা মানুষটি জড়িয়ে ধরেছেন মালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে। আর সে মালা হাতে দাঁড়ানো ছেলেটা কে জানেন? সেই কালভার্টে পা দুলিয়ে আড্ডা দেওয়া সেই তিন বন্ধুর প্রথম জন। ছাত্রাবস্থায় যে ছিল প্রচণ্ড প্রতিভাধর। কর্মজীবনে এসে যে দ্বিতীয়জনের অধীনস্থ ব্লকের একজন সরকারি ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে দেখা করতে এসেছে। আর এদিকে তিন নম্বর বন্ধু দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন । স্কুলের পর আর কলেজের দরজায় পা বাড়ায়নি সে আর। স্পষ্ট বুঝেছিল, পড়াশোনা তার কর্ম নয় । তাই ভিড়ে গেল রাজনৈতিক দলে। দুরন্ত বক্তৃতা ও জনমোহিনী দক্ষতায় যথাসময়ে পেয়ে গেল লোকসভার টিকিট। জিতে মেম্বার অফ পার্লামেন্ট। তারপর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী । সে এক উত্তরণ!
ঘটনাচক্রে, কালভার্টে বসে পা দুলিয়ে আড্ডা দেওয়া সেদিনের সেই তিন বন্ধু একই দফতরের বিভিন্ন পদে । কিন্তু প্রথম দুজনই তৃতীয় বন্ধুর অধীনস্থ ।এ কোনও কাল্পনিক গল্প নয়। প্রথমজন,
ই. শ্রীধরন,দ্য মেট্রো ম্যান । যাঁর হাত ধরে আজ দিল্লির মেট্রো দৌড়োচ্ছে ।দ্বিতীয়জন, টি. এন. সেশন, ভারতের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক। আর তৃতীয়জন,কে . পি. উন্নিকৃষ্ণান । পাঁচবারের লোক সভা সদস্য , কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ।তিন বন্ধু । একই স্কুল। একই শিক্ষক। কিন্তু দাঁড়াবার পথ ভিন্ন । তাই ইর্ষা নয়, বরং বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক।
এদিকে দু এক দিনের তুমুল বৃষ্টিতে ভাসছে আমাদের জেলার একটা বৃহত্তর অংশ। ঘাটালের বন্যার প্রকৃতি এবছর বড় ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ঘাটাল অবিভক্ত মেদিনীপুর তথা বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি মহকুমা শহর। সেই অর্থে নগর পরিষেবা না থাকলেও এ শহর অনেক প্রাচীন শহর। ঘাটাল শহরের প্রাণ বলতে পারেন শিলাবতী নদীকে, তবে আবার কখনও কখনও ভারি বর্ষায় এই নদীই ঘাটালের মানুষের কাছে ত্রাস হয়ে পড়ে।ইংরেজরা তখন আমাদের দেশ শাসন করছে। হয়তো তখনো রেলগাড়ি, যন্ত্র-শকট আবিষ্কৃত হয় নি। হয়তো আবিষ্কৃত হলেও তার প্রসার ঘটেনি। তখন কলিকাতা, হাওড়া, হুগলী জেলা সঙ্গে ঘাটাল সহ ঘাটালের পশ্চিমাঞ্চল ক্ষীরপাই, চন্দ্রকোনা, রামজীবনপুর, কামারপুকুর, গড়বেতা, পিয়ারডোবা, গোয়ালতোড়, শালবনি, সারেঙ্গা প্রভৃতি জায়গার যোগাযোগের একমাত্র উপায় শিলাবতী নদী।শিলাবতী নদী, বন্দরের কাছে দ্বারকেশ্বরের শাখা নদী ঝুমী নদীর সঙ্গে মিশলে নদীটি আরও প্রশস্থ হয়ে এরনাম হয় রূপনারায়ণ। রূপনারায়ণ রানীচক্, কোলাঘাট,তমলুক হয়ে এগিয়ে আসে গেঁওখালি। গেঁওখালিতে রূপনারায়ণ সঙ্গ পায় হুগলী নদীর। এই হুগলী নদীর পূর্বদিকে কলিকাতা আর পশ্চিম তীরে হাওড়া ও হুগলী জেলা। হুগলী-রূপনারায়ণ-শিলাবতী এই ছিল প্রধান পরিবহন পথ। এ পথেই সেকালে কলিকাতা থেকে প্রয়োজনীয় মালপত্র আমদানি হত ঘাটাল মারফৎ। আবার ঘাটাল সহ তার পশ্চিম দিকের বিস্তীর্ণ পশ্চার্ধ ভূমির উদ্বৃত্ত পন্য রপ্তানির হত কলিকাতা সহ নানা প্রান্তরে। ডিঙি, নৌকা,পানসি স্টিমার যোগে পণ্যের আমদানি রপ্তানি হতো। শুধু পণ্যই নয় যাত্রী পরিবহনের একমাত্র পথ ছিল শিলাবতী।আর সেই আমদানি রপ্তানিকে কেন্দ্র করে, মূলত পণ্য ওঠা-নামার জন্য শিলাবতী নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বিদেশীদের আস্তানা। ঘাটাল ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদ গুলোর ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, অতীতে ঘাটাল ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের এক প্রসিদ্ধ ভূমি। ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে শুধুমাত্র ঘাটাল স্টীম নেভিগেশান কোম্পানীর স্টীমার ও লঞ্চ চলতো। এই কোম্পানি মূলত আমাদের ঘাটাল এলাকার বিত্তশালী মানুষদের কোম্পানি ছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীকালে বিদেশি হোরমিলার কোম্পানীর স্টীমার ও লঞ্চ আসে। আস্তে আস্তে প্রতিযোগিতায় না পেরে নেভিগেশান কোম্পানীর যবনিকাপাত হয়। স্বাধীনতার অনেক পরেও এই লঞ্চ ব্যবহার হত। সম্ভবত নয়ের দশকের শেষ দিক পর্যন্ত ঘাটাল থেকে লঞ্চ চলত।
ইতিহাস দেখলে দেখা যায় যে, ১৭ শতকের মধ্যভাগে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সরকার থেকে বাংলায় কয়েকটি রেশম কারখানা খোলার অনুমতি পায়। তারা তৎকালীন সময় মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, শান্তিপুর, মেদিনীপুরের সুতি কাপড়,রেশম এবং সূক্ষ মসলিন(সাদা কাজ করা মসলিন বা চিকন নামে পরিচিত ছিল)নিয়ে কাজ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যের গতি মাঝারি রকমের ছিল কিন্তু হঠাৎই ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সাথে বিলাস দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং প্রচুর পরিমাণে বাংলার থান-কাপড় ব্রিটেনে রপ্তানি শুরু হয়।১৭ শতকের শেষ দিক থেকে ১৯ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত এ অবস্থা চলে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার তাঁত শিল্পের একচেটিয়া বাণিজ্য দখল করে নেয়। রেশম শিল্প ও নীল চাষে ব্রিটিশ আমলের অনেক আগে থেকেই উৎকর্ষ লাভ করেছিল ঘাটাল এলাকা। দাসপুরের গুড়লি, সুরথপুর, নিমতলা, বাড়জালালপুর ইত্যাদি স্থানে তৈরি হয়েছিল রেশমকুঠি। সেইসব কুঠির প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এবং বিশেষ করে ইটের তৈরি আকাশচুস্বী চিমনিগুলি আজও দাঁড়িয়ে আছে নিমতলা ও গুড়লি গ্রামের নদীতীরবর্তী জনহীন প্রান্তরে। গুড়লির দুটি চিমনি ছিল ফরাসি কুঠি ‘মেসার্স লুই, পাইন এন্ড কোম্পানি অব্‌ লায়ন্স’-এর। শিলাবতী নদীর পূর্বতীরে ঘাটাল-পাঁশকুড়া পিচরাস্তার নিমতলা স্টপেজ থেকে পশ্চিমে দেড় কিমি দূরে নিমতলা ছিল সেকালে রেশম শিল্পের এক বৃহৎ কেন্দ্র। এখানকার ‘গুঁই’-পদবিধারী তন্তুবায় সম্প্রদায়ের অধীনে ছিল এই শিল্প ও বাণিজ্য। ইউরোপীয় বণিকদের চাহিদামত রেশম এখান থেকে সরবরাহ করা হত। ‘গুঁই’দের রেশমকুঠির সুউচ্চ চিমনিটি এবং কুঠিবাড়ির ধ্বংসাবশেষ শিলাবতীর তীরে, নিমতলা ফুটবল মাঠের পাশে বর্তমান। ঘোলসাই,কুঞ্জপুর,কোলমিজোড়,সুরতপুর ছিল নীল চাষের ও ব্যবসার কেন্দ্র। নীল কুঠিও ছিল এই স্থানগুলোতে। ঘাটালে ও ঘাটালের আশেপাশে রাধানগর,ক্ষীরপাই আর্মেনীয়, ডাচ, ফরাসী সহ অন্যান্য বিদেশীরাও নীল কুঠি স্থাপন করে বিভিন্ন সময়ে।পনেরো শতক থেকেই আমাদের বাংলা থেকে সুদূর ইতালিতে এই রেশম ব্যবসা শুরু হয় যা ‘গাঙ্গেয় সিল্ক’ নামে পরিচিত ছিল। ঘাটালের শিল্প কবে থেকে না জানা গেলেও এখানের রেশমের উৎকর্ষতা ইতিহাসে পাওয়া যায়।ডাচ-রা মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় তাদের বাণিজ্য প্রসারের পর ঘাটালের দিকে নজর ফেরান। একসময় নদীয়ায় দায়িত্বে থাকা রবার্ট ওয়াটসন আঠারো শতকের চারের দশকে ঘাটালে আসেন। নীল ও রেশম শিল্পের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে ওনাদেরই মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন এণ্ড কোং.। এই কোম্পানিই ঘাটালের বিভিন্ন জায়গায় কুঠি স্থাপন করে। ১৮৭৬ সালে হান্টার সাহেব যখন স্টাটিস্টিক্যাল একাউন্ট অফ বেঙ্গল সংকলন করেন তখন বড় শিল্প ছিল না। রেশম,সুতী ও নীল-এর বাণিজ্যিক বাজার ছিল ঘাটালেই। ওয়াটসন এন্ড কোম্পানির কুঠিটি ছিল বৃহত্তম রেশম উৎপাদন কেন্দ্র। ঐ কুঠিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য অঞ্চল কুঠিবাজার নামে পরিচিতি লাভ করে।সাড়ে তিনশ ‘ঘরা’র কর্তা ছিলেন পরেশচন্দ্র ভুঁইয়া। তাঁর জ্ঞাতিগণ এখন চেচুয়া-গোবিন্দনগরে বাস করেন। ঘাটালের কুঠি সাহেবদের পরে রাজপুতানাবাসী (মাড়োয়ারি) রামজীদাস সুরেখা প্রায় দেড়লক্ষ টাকায় ক্রয় করেন। বর্তমানে ওঁদের বংশধরগণ দ্বারা পরিচালিত ট্রাস্ট ঘাটাল কুঠিবাজারের মালিক। কুঠিবাজার ছিল শিলাবতী নদীর পশ্চিম তীরে আর কিন্তু সাহেবদের বাসস্থান ছিল নদীর পূর্ব তীরে। পূর্ব পারে এখন যেখানে মহকুমা শাসকের সদর কার্য্যালয়টি এখানেই ছিল ডাচ সাহেবদের কুঠি। রবার্ট ওয়াটসন ছাড়াও তিন জন রেসিডেন্ট ছিলেন। হোরমিলার স্টীমার কোম্পানীর কর্ণধার হোরমিলারও বেশ কিছুকাল এখানে কাটিয়েছিলেন। বর্তমানে ঘাটাল শহরে পরিত্যক্ত হাসপাতালটি ছিল ডাচ সাহেবদের অতিথিশালা।
প্রতিদিনই সাহেবদের পূর্বতীরের বাসস্থান থেকে পশ্চিমের কুঠিতে আসতে হত। মাঝের নদীপথ ছিল ঝামেলার পারাপার। অপ্রশস্থ, শীর্ণ অথচ উত্তাল সেই জলস্রোতের উপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের আধুনিক প্রযুক্তি তখনও সভ্যতার হস্তগত হয়েছিলনা। সে সময় পারাপারের জন্য সাহেবরা শিলাবতীর উপর নির্মাণ করেন কাঠেরপুল। নদীতে ৯-১০টি নৌকো, তার উপরে কাঠের পাটাতন দিয়ে পুলটি বানানো হয়। জলস্তরের উঠা নামার সঙ্গে সংগতি রেখে পুলটি উঠত বা নামত। পুলটির ভাসমানতার জন্য এর নাম হয় ভাসাপুল। সাহেবরা ঘোড়ায় চড়ে ভাসাপুল হয়ে দিনের শুরুতে পূর্ব থেকে পশ্চিম আর দিন শেষে পশ্চিম থেকে পূর্বে যাতায়াত করত। যাতায়াতের ঐ পথ ছিল কেবল সাহেবদের। এদেশের লোকজনের জন্য ঐ পথের লক্ষ্মণরেখা পার হওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না। বিলাসী ভাসাপুল শুরুতে কেবলমাত্র বিদেশী সাহেবরা ব্যবহার করত। এদেশীয়দের মধ্যে নামী ব্যবসায়ী বা বিশিষ্ট লোক জন ছাড়া ভাসাপুল পার হবার অনুমতি ছিল না। শোনা যায় পন্ডিত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নাকি ওই সময় ভাসাপুলের উপর দিয়ে পারাপার করার অনুমতি ছিল। স্বদেশী আন্দোলন ও শিল্প বিপ্লব শেষমেষ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শিল্পে ভাটা পড়ে। ডাচরা আসতে আসতে বাণিজ্যে সংকোচন ঘটায়। ইংরেজদের প্রভাব আরও পরিণত হয়, তাদের বিভিন্ন আইনের প্রণয়ন ঘটে। তারই ফল হিসেবে বেঙ্গল ফেরী এ্যাক্ট ১৮৮৫ এর ৬নং ধারা মোতাবেক, ১৯০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, পুলটি সাধারণের ব্যবহারের অনুমতি লাভ করে। স্বাধীনতা লাভের প্রায় তেরো বছর পর ১৯৬০ সালে শিলাবতী নদীর উপর আধুনিক প্রযুক্তির বিদ্যাসাগর সেতু নির্মাণ নিশ্চিত ভাবেই ভাসাপুলের চাপ কমিয়েছে। হয়তো তার উপযোগিতা নিয়েও আজ প্রশ্ন থাকতে পারে কিন্তু ঘাটাল বললে দৃশ্যপটে আজও প্রথমেই ভেসে উঠে ভাসাপুল। সুদীর্ঘ কাল ঘাটাল ও ঘাটালবাসীর পায়ে পায়ে জড়িয়ে আছে বিলাসী এই কাঠপথ।
এই ভাসাপুলের নানা ঐতিহ্য, আবেগ, ইতিহাসের সাক্ষী এই ভাসাপুল অনেক বার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর একটা পোশাকি নাম আছে পুনটুন ব্রিজ। প্রতিবছর মকরসংক্রান্তির দিন এই ভাসাপুলকে কেন্দ্র করেই নদীর প্রান্তে একটি ছোট মেলা ও গ্রাম্য জিনিস পত্র কেনাবেচা হয়। ঘাটালবাসীর কাছে ভাসাপুল গা-সওয়া হলেও রাজ‍্যবাসীর কাছে বড়োই বিস্ময়ের। তাইতো রাজ‍্যের পর্যটন মানচিত্রে নাম উঠেছে ভাসাপুলের। বহু মানুষ শুধুমাত্র ভাসাপুল দেখতে ঘাটালে ছুটে আসেন। পর্যটকদের কাছে ভাসাপুল দেখার মতো আকর্ষণীয়। যখনই কেউ শোনেন যে নদীর জলস্তরের সাথেই পুলটি ওঠানামা করে তখনই পর্যটকদের আগ্রহ কয়েকগুন বেড়ে যায়। কিছুদিন আগেও শিলাবতী নদীর উপর এই ভাসাপুলে কোনও আলোর ব্যবস্থা না থাকায় এতদিন অন্ধকারেই পুলের উপর যাতায়াত করতেন মানুষ। সেই অসুবিধা দূর করেছে ঘাটাল পুরসভার সৌরবাতি। ঐতিহ্যশালী ভাসাপুল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঘাটাল পুরসভার বছরে খরচ হয় বেশ কয়েক লক্ষ টাকা। ভাসাপুলে নিযুক্ত কর্মীদের বেতনও দেয় পৌরসভা। বিশেষ কিছু দিনে পুলটিকে আলাদা করে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করে পুরসভা। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘাটালের ভাসাপুলকে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় হেরিটেজ কমিশন এটিকে হেরিটেজের মর্যাদা দেয়। তবে ঐতিহ্যশালী নিদর্শনটিকে আকর্ষণীয় করে তোলার পদক্ষেপ বিশেষ চোখে পড়েনা। ভাসাপুল ঘাটালের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ঐতিহ্যের স্বর্ণালী স্মারক। ঐতিহ্যের আর এক নাম ভাসাপুল বেঁচে থাকুক দিনের পর দিন আর পুরসভা ও হেরিটেজ কমিশনের অর্থানুকূল্যে আরও রূপবতী হয়ে উঠুক এই ঐতিহ্যের স্মারক তা সবারই আন্তরিক চাওয়া।

ক্রমশ

(কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমানে আঘাত বা আরোপ- এ লেখনীর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য নয়। যে কোনো প্রকার সাযুজ্য আকস্মিক কিংবা দৃশ্যপট নির্মাণে সংবন্ধিত।)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।