সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শ্রীরাজ মিত্র (পর্ব – ১৭)

ছায়াপথ, গুঁড়ো ছাই

২৯ সেপ্টেম্বর ,১৯৪২ । বহু শহিদের রক্তে রাঙা এই দিনটি মেদিনীপুরের তো বটেই , সারা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। মাত্র কয়েকদিনের প্রস্তুতিতেই এক মহাযজ্ঞের আয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন একদল দেশব্রতী দেশপ্রেমিক। বিশেষ করে তমলুক, মহিষাদল, সুতাহাটা ও নন্দীগ্রাম থানায়। সেই সংগ্রামের কাহিনী প্রথমেই আসা যাক তৎকালীন তমলুক মহকুমার সুতাহাটা থানার কথা। সুতাহাটা থানায় কংগ্রেস সংগঠন ছিল বেশ দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।গান্ধিবাদী নেতা কুমার চন্দ্র জানা ‘র নেতৃত্বে একটা কর্মী বাহিনী গড়ে উঠেছিল । ‘বাসুদেবপুর গান্ধী আশ্রম’ই ছিল থানা কংগ্রেসের অফিস। সুতাহাটা থানাতেই এই আন্দোলন সবচেয়ে বেশী তীব্র আকার ধারন করে এবং বেশকিছু সত্যাগ্রহী কুমার চন্দ্র জানা সহ হীরালাল মাইতি , ক্ষুদিরাম ডাকুয়া প্রমুখ গ্রেপ্তার হন। শীর্ষস্থানীয় নেতারা গ্রেপ্তার হলে মহকুমার কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ শ্রীসুশীল ধাড়ার উপর ভার দেন যে তিনি তাঁর নিজের থানা মহিষাদল ছাড়াও সুতাহাটা থানাতেও ২৯শে সেপ্টেম্বরের কার্যসূচী রূপায়নের। ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২ সালে ডা. জনার্দন হাজরার আহ্বানে হাদিয়া গ্রামের গোবিন্দ প্যাটেলের বাড়িতে সুতাহাটা থানার কংগ্রেস কর্মীদের নিয়ে সম্মেলন বসল । পরবর্তীতে ২৪ শে সেপ্টেম্বর বাসুদেবপুর গান্ধী আশ্রমেও থানার প্রতিনিধি স্থানীয় কর্মীদের নিয়ে আবার একটি বৈঠক হয় । ২৯ সেপ্টেম্বর পূর্ব নির্ধারিত থানা দখল অভিযানের দিন, সকাল থেকেই কর্মীরা গ্রামে গ্রামে , বাড়িতে ঘুরে ঘুরে লোকজন সংগ্রহ করতে থাকেন। স্থির হয় বেলা ১ টার সময় থানার চারিদিক থেকে চারটি শোভাযাত্রা এসে সুতাহাটা বাজারে থানার সামনে মিলিত হবে। চৈতন্যপুর, নন্দরামপুর , মনোহরপুর এবং আমলাট এই চারটি স্থানে বিশেষ বিশেষ এলাকার মানুষজনকে সমবেত হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। চৈতন্যপুর মোড়ে আগত প্রায় দশ হাজার লোকের সমাবেশটির নেতৃত্ব দেন রাসবিহারী জানা , মহতাব চাঁদ দাস, কুমুদিনী ডাকুয়া, কেদারনাথ দাস , বীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রমুখ । দ্বিতীয় শোভাযাত্রাটি সুতাহাটা বাজারের উদ্দ্যেশ্যে হাজার হাজার মানুষ ধ্বনি দিতে দিতে এগিয়ে চলে। এই শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন প্রমথনাথ দাস , জ্যোতিভূষণ জানা, অবিনাশ মণ্ডল , সুধীর মিদ্যা , ব্যোমকেশ অধিকারী , ধৈর্য প্রামাণিক প্রমুখ। ডাঃ অমূল্য খাটুয়া , ননী সামন্ত , ভবতারণ ভুঁইয়া প্রমুখ দের নেতৃত্বে তৃতীয় শোভাযাত্রাটি সংগঠিত হয় নন্দরামপুরে। বাসুদেবপুর গান্ধী আশ্রমে সমবেত স্বেচ্ছাসেবক ও শোভাযাত্রাকারীদের দল দেবেন্দ্রনাথ কর ও শুকদেব দাসের নেতৃত্বে নন্দরামপুর থেকে আগত শোভাযাত্রার সঙ্গে মিলিত হয়ে সুতাহাটা বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মহকুমার নির্দেশে ডা. জনার্দন হাজরা , ডা. অমূল্য খাটুয়া ,ডা. নিত্যগোপাল দাস, সন্তোষ চক্রবর্তী , অতুল চন্দ্র ভুঁইয়া প্রমুখ চিকিৎসকগণ চিকিৎসার সরঞ্জামসহ চারটি মিছিলে যোগদান করেন। দুপুর ১ টা নাগাদ প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের বিশাল জনসমুদ্র পূর্ব নির্দেশমত থানা প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হলেন। থানায় উপস্থিত পুলিশ দলের পক্ষে এই জন- সমুদ্রের মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না। সুতাহাটা থানার পুলিশেরা আত্মসমর্পণ করেন। বিপ্লবীরা নগেন্দ্রনাথ সামন্তের নেতৃত্বে থানা প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা তোলেন। পুলিশদের আত্মসমর্পণের পরে উল্লসিত জনতা থানার বাড়িটি আগুন ধরিয়ে দেয়। এই সময় একটি উড়োজাহাজ খুব নীচে নেমে এসে সুতাহাটা থানার উপর চক্কর দিয়ে দুটি আগ্নেয় বোমা ফেলে দিয়ে উড়ে যায়। কিন্তু বোমা দুটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে থানার উত্তর পশ্চিম দিকে মাঠের মধ্যে পড়ে। মাঠে ২/৩ ফুট জল থাকায় জলে পড়ে বোমা দুটি কোন ক্ষতি করতে পারে নি। ভারতবর্ষে আগস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে একমাত্র সুতাহাটার বিপ্লব দমনের জন্য ইংরেজ কর্তৃক বোমা বর্ষণ করা হয়েছিল।পরবর্তীতে ১ অক্টোবর জলপথে লঞ্চযোগে একদল সশ্স্ত্র সৈনিক কুকড়াহাটি বাজারে নামার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে ঐ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ রূপনারায়ণের পাড়ে সমবেত হন এবং ‘গো ব্যাক’ ধ্বনিতে মুখর হয়। ফলপ্রসূ ঐ সশস্ত্র বাহিনীর দল ওখানে নামার চেষ্টা না করে মোহনার দিকে এগিয়ে যায়। সুতাহাটা থানায় ১৯৪২ এর ১৭ ডিসেম্বর তমলুকে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতাহাটা থানার যে জাতীয় সরকার গঠিত হয় ডা. জনার্দন হাজরার নেতৃত্বে জাতীয় সরকারের সৈন্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত হন বিধুভূষণ মাইতি , শিক্ষা সচিব হন বিরাজ মোহন দাস, প্রচার সচিব বিল্বপদ জানা, স্বরাষ্ট্র সচিব ও অর্থ সচিব রাসবিহারী জানা, বিচার সচিব হন বিধুভূষণ সামন্ত , সৌহার্দ্য মন্ত্রী মুরারী মোহন মান্না, সহকারী ডাক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত হন বীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল, কমান্ড্যান্ট যদুপতি মাইতি প্রমুখ।

‘৪২ এর এই জাতীয় সরকারের প্রতিষ্ঠায় সুতাহাটা থানার অন্তর্ভূক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে শহীদ ব্রজগোপাল দাস (গ্রাম –পানা), শচীন্দ্রনাথ ঝুলকি (গ্রাম- দ্বারিবেড়িয়া), পুরীমাধব প্রামাণিক (গ্রাম – দ্বারিবেড়িয়া), হরহরি দেব (গ্রাম- তাজনগর), গুণাধর দাস ( গোপালপুর), বিপিনবিহারী মণ্ডল ( ঊর্ধ্ববমাল), সুধাংশু পণ্ডা (গোড়াদোরো) , সুধীরচন্দ্র মিদ্যা ( বেগুনাবেড়্যা), মুরারী মোহন কালসা (বাহারডাব), ব্রজগোপাল কুইতি , বঙ্কিম কুইতি ( বাড়বাসুদেবপুর) ননীগোপাল দাস (গ্রাম- বাবুপুর), শরৎচন্দ্র ভৌমিক – (হরিণভাষা), চিন্তাহরণ দাস ( দেউলপোতা) প্রমুখ ছিলেন উল্লেখযোগ্য। মাস্টার আজ আমাদের তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠন, প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সুতাহাটা থানার ভূমিকা নিয়ে কথা বলছিল। হ্যাঁ, পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে এই স্বাধীন তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল। মেদিনীপুরের মানুষ মাত্রই এই ঐতিহ্যের ওম-কে স্মরণ করে আত্মপ্রসাদ পায়।

কথা প্রসঙ্গে প্রকাশ ব্যানার্জী বললেন, আচ্ছা তোমরা কি জানো, বর্ণপরিচয়ের রচয়িতা পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র একজন সফল হোমিওপ্যাথ ঔষধ প্রস্তুতকারক? না, আমরা কেউই জানতামনা! ‘দয়ার সাগর’ বিদ্যাসাগরের এ হেন কৃতিত্বের কথা ! হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন জানতাম। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ‘বার্ধক্যের বারানসী’ কার্মাটাঁড়-এ তাঁর ডিসপেনসরি আজও সে সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। প্রকাশ ব্যানার্জী শুরু করলেন- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাঁপানি ছিল। শীতকাল এলেই বাড়ত তার প্রকোপ। তাই শীতে দু’বেলা গরম চা খেতেন নিয়ম করে। এক দিন চা খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাঁপের টান একদম কমে গেল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অবাক! গৃহভৃত্যকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘আজ চায়ে কি আদার রস মিশিয়েছিলে?’’

ভৃত্য না বললেন এবং স্বীকার করলেন যে, তাড়াহুড়োয় আজ কেটলি না-ধুয়েই চা করে ফেলেছিলেন। বিদ্যাসাগর তাঁকে কেটলি আনতে বললেন। আনার পর কেটলির ভিতর পরীক্ষা করে তো তিনি স্তম্ভিত! অবশিষ্ট চায়ে দু’টো আরশোলা পড়ে রয়েছে। মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। আরশোলা বেশি জলে সেদ্ধ করার পর, তাকে অ্যালকোহলে ফেলে ছেঁকে ডাইলিউট করে হোমিয়োপ্যাথির মতে ওষুধ বানিয়ে নিজে ও অন্যদের দিয়ে পরীক্ষা করে দেখলে কেমন হয়? তাতে হাঁপানি, সর্দি সারে কি না! লোককে না জানালেই হল ওষুধে কী আছে। ভাবনাকে কাজে পরিণত করতে দেরি করেননি। জানা যায়, সেই ওষুধে অনেকের রোগের উপশম করেছিলেন বিদ্যাসাগর!

সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম তো সবাই জানে, কিন্তু হাঁপানির ওষুধ Blatta orientalis এর আবিষ্কারকর্তা পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম কতজন জানে? নামিদামী ডিগ্রীধারী ডাক্তারদের পাশে “মেটিরিয়া মেডিকায়” এ ওষুধের প্রথম প্রয়োগকর্তা হিসেবে আজও লেখা আছে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম।

আরে তাই নাকি? এ তথ্য তো আগে কখনও শুনিনি। আমরা আমাদের এই আড্ডা শুধু উপভোগই করিনা, রোজ রোজ কত কি নতুন কিছু জানি, শিখি!

এই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাস্টার বলে ওঠে- জানেন কি নেতাজির কত সম্পত্তি ছিল এবং সেগুলি আজ কোথায়?

প্রকাশ ব্যানার্জী উত্তর দেন- দিল্লী মিউজিয়ামে সুভাষচন্দ্রের প্রায় ১২ কিলো সোনা ও হিটলারের দেওয়া উপহার, যেমন-সোনার সিগারেট কেস ইত্যাদি কয়েকটা উপহার প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।

মাস্টার বলে, হ্যাঁ তা ঠিক! কিন্তু সুভাষচন্দ্রের কি ঐটুকুই স্মৃতিবিজড়িত সামগ্রীই ছিল? না! ১৯৪৪ সাল। রেঙ্গুনে নেতাজির সেই ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’ এই বক্তব্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আপামর নরনারীকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে জাতীয়তাবাদে জ্বালিয়ে তুলেছিল। তিনি আরও বলেছিলেন “সর্বাত্বক যুদ্ধের জন্য সর্বস্ব পণ”…দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য সব দিয়ে দাও। তাঁর অমোঘ নির্দেশে সকলে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন এবং নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন প্রিয় নেতাজিকে। মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত দিয়েছিলেন মা-বোনেরা।

শুধু কি তাই? ১৯৪৪ সালে ২৩ শে জানুয়ারি তাঁর জন্মদিনে তাঁর মতের বিরুদ্ধে জনগণ তাদের প্রিয় নেতাজিকে সোনা দিয়ে ওজন করে উপহার দিয়েছিলেন, প্রায় ৮৫ কিলো সোনা। আজাদ হিন্দ ব্যাঙ্কে ৪২ কোটি টাকা ও ২৯০০ সোনার সিক্কা। হিটলারের দেওয়া সোনার সিগারেট কেস, তোজো (জাপানের প্রধানমন্ত্রী) ও মুসোলিনির (ইতালির প্রধানমন্ত্রী) দেওয়া বিভিন্ন দামি উপহার।
১৮৪০০ ক্যারেটের পান্না, যার বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৬০ লাখ আমেরিকান ডলার। ১৭৮৮০ ক্যারেটের পান্নার বুদ্ধ মুর্তি, যার বর্তমান মূল্য আন্দাজ করাই যাচ্ছে না। ১৪৭০০ ক্যারেটের ১৭০০ বছর পুরনো পান্নার বুদ্ধমুর্তি, যার বর্তমান মূল্য ১৫ লাখ আমেরিকান ডলার।
পুরো সম্পত্তির বর্তমান মূল্য দাড়ায় ৯০০ ক্রোড় আমেরিকান ডলার। এই বিপুল সম্পত্তি কোথায় গেলো জানলে আজও আমাদের শিহরিত হতে হয়! ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ এর সেই নাটকীয় বিমান দুর্ঘটনার পরেই সাত দিনের মধ্যেই জাপান সমস্ত সম্পত্তি নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজেরই রামামুর্তী ও আইয়ারের হাতে দিয়েছিল। গদ্দার রামামুর্তী ও আাইয়ার সেই সম্পত্তি নয়ছয় করতে থাকলে জাপান পর পর তিনবার ভারত সরকারকে সরকারি ভাবে তা জানান, কিন্তু নেহেরু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরস্ত, উপরন্তু তাঁদের পুরস্কৃত করেন।

পর্দার আড়ালে কি হয়েছিল জানেন? অনেকে মনে করেন, ১৯৪৬ সালে নেহেরু সিঙ্গাপুর যান আসলে ঐ সম্পত্তি ভাগাভাগি করতেই। লর্ড মাউন্ট ব্যাটন ও নেহেরুর মধ্যে সেই সম্পত্তি ভাগ হয় এবং দুই বিচারপতি রামামুর্তি ও আইয়ার কিছু পায়। তাই নেহেরু সিঙ্গাপুর গিয়েও আজাদ হিন্দ স্মৃতিসৌধে মালা দিতে যান নি। এমনকি মাউন্টব্যাটন ঐ স্মৃতিসৌধ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিলেও তার প্রতিবাদ করেন নি।

সেন্সর হতে পারে লেখা। তাই মাস্টার আরও যা যা বলল তা কাহিনীতে যুক্ত করা গেলনা। হ্যাঁ এই ভাবেই বোধহয় আমাদের ভুলতে শেখায় রাষ্ট্র, সুভাষ কে! জাতির কাছে সুভাষচন্দ্র তাই বোধহয় আজও কেবলই একটা আবেগ!

গোপীবল্লভপুর থেকে ছ’নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে ফিরছি। রাস্তার পাশে বনদেবী মা গুপ্তমণির মন্দির। এ মন্দিরের বৈশিষ্ট্য কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিত নয়, এখানে দেবী পূজিতা হন শবর লোধা ইত্যাদি জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষদের দ্বারা।

জনশ্রুতি আছে বহু বছর আগে যখন এই অঞ্চল গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল তখন গরু চরাতে এসে নন্দলাল ভক্তা নামে জনজাতি সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি এখানে একটি গাছের তলায় ঘুমিয়ে পড়েন। তখন দেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দেন এবং পুজো করার আদেশ দেন। ঘুম থেকে জেগে ওই ব্যক্তি বাড়িতে গিয়ে মা ও স্ত্রীকে স্বপ্নের কথা বললে তাঁরা তাকে জঙ্গলে যেতেই নিষেধ করেন এবং বিষয়টিকে অপদেবতার ছলনা বলে তাঁকে আপাতভাবে নিরস্ত করেন। সেদিন রাতে তাঁকে দেবী আবার দেখা দিয়ে জানান যে তিনি অপদেবতা নন এবং তাঁর পুজো অবিলম্বে জঙ্গলের ওই স্থানে শুরু করতে বলেন। তখন উনি জঙ্গলের সেই গাছের তলায় দেবীকে প্রতিষ্ঠা করে পূজা নিবেদন করেন। এরপর ঝাড়গ্রামের রাজার আদরের হাতি পাগল হয়ে কোথায় চলে গেলে রাজা নরসিংহ মল্লদেব খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। বনদেবী গুপ্তমণি তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে জানান যে হাতিটি তাঁর আশ্রয়ে জঙ্গলে রয়েছে। রাজা নন্দলালবাবুর মাধ্যমে জঙ্গলের ওই স্থানে পৌঁছে হাতিটিকে ফিরে পান। তখন তিনি মন্দির নির্মাণ করিয়ে দেন এবং দেবী এভাবে গুপ্ত থাকার জন্য ‘মা গুপ্তমণি’ নামে পূজা নিবেদন করেন ।তারপর থেকে দেবীর নাম ও দয়াপরবশতার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ।

এ মন্দিরের আরও বৈশিষ্ট্য হলো এখানে কোনো বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো হয় না। দেবী দীপ মোমবাতি ইত্যাদির মৃদু আলো পছন্দ করেন। বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করা হলেও তা নাকি কয়েক দিনের মধ্যে খারাপ হয়ে যায়। শনি ও মঙ্গলবার পশুবলি সহকারে পূজা হয়। দুর্গাপূজা ও মকর সংক্রান্তির সময় বিশেষ পূজার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।অনেকেই মানত করেন মূলত হারানো সামগ্রী ফিরে পাওয়ার প্রার্থনায়। এছাড়া অন্যান্য নানান কারণেও ভক্তপ্রাণ দেবীর শরণাপন্ন হন। মা গুপ্তমণি কাউকেই নিরাশ করেন না। এখানে এলে মানতের মাটির হাতি বাঁধা থাকতে দেখা যায় মন্দির চত্বরে ।

গুপ্তমণি মায়ের মন্দিরে প্রণাম করে উঠে এলাম মোটরে। নিশুতি জনশূন্য পথ, দূর থেকে কানে আসে ভারী ভারী গাড়িগুলোর রাস্তা দাপিয়ে যাওয়ার শব্দ…

ক্রমশ…

(কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমানে আঘাত বা আরোপ- এ লেখনীর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য নয়। যে কোনো প্রকার সাযুজ্য আকস্মিক কিংবা দৃশ্যপট নির্মাণে সংবন্ধিত।)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।