গল্পে সোনালি

নব রস

“— গদ্য জাতীয় ভোজ্য ও কিছু দিয়ো
কাব্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায়
তা হোক তবুও লেখকের তারা প্রিয়
জেনো বাসনার সেরা বাসা রসনায়—-“
বাঙ্গালী তথা বিশ্বের মানুষকে রস বিতরন করে বেড়াচ্ছেন যে ভদ্রলোক এদ্দিন ধরে তিনি যখন রসনাকে এত বড় সাট্টুফিকেট দিয়েছেন , তখন তাকে একেবারে হেলাচ্ছেদ্দা করা উচিত হবে না নিশ্চই ।
নিজের মনেই এসব ভেবে মাথা নাড়েন ভজনবাবুর গিন্নি ।
“ নাহ , খাওয়া দাওয়াকে কম ইম্পর্টান্ট ভাবলে মোটেই চলে না ।“
ভদ্রমহিলা এই দু তিন দিন যাবত বড় মুশকিলে আছেন ।
কর্তা শ্রী ভজন কুমার পাকরাশী , লোহার কারবার করে রাশি রাশি টাকা রোজগার করেন ।
বাড়িতে রেগুলার পাঁঠার মাংস , পাবদা মাছের ঝোল , পারশের ঝাল দেওয়া , পনিরের ফ্রাই , কাঁচা আমের টক , ছানার জিলিপি , বিকেলে বেগুনি, পেঁয়াজি , পকোড়া , ডিমের ডেভিল চলতেই থাকে রোজকারের খাবার হিসেবে ।
সুগার , প্রেসার , কোলেস্টেরল আছে । তার জন্য সংগে ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ ও আছে । দু তিন মাস অন্তর গাঁটে ব্যথা বাড়লে , সব খাবার বন্ধ বলে , ভজনবাবুর প্রবল হুঙ্কারও আছে ।
আবার আরেকটু ঘ্যানঘ্যান শোনা যায় যখন পছন্দের জামা প্যান্টগুলো পড়তে গিয়ে ভুঁড়িতে আটকে যায় ।
তখন , সকালে বিকেলে হাঁটতে যাবার , কম খাবার , শুধুই শশা দিয়ে জলখাবার শেষ করার সিদ্ধান্ত শোনা যায় বটে ।
কিন্তু , ওই যে — বাসনার সেরা বাসা রসনায় —।
দু চার দিন পরেই , সকালের কর্নফ্লেক্সের বাটি , চিনি ছাড়া টক দই সব ত্যাজ্য হয়ে আবার ফুলকো লুচি বেগুন ভাজা ছোলার ডালে ব্যাক ।
তো , সেই মিস্টার বি কে পাকরাশী , এখন খাস লন্ডনে ।
আজ পিকাডেলী স্কোয়ারে বাচ্চা সাহেবদের গান আর ফোয়ারার বাহার দেখছেন , তো কাল টেমস নদীর ব্রিজ পেরিয়ে নদীর পারের ক্যাফেতে বসে হাওয়া খেতে খেতে লেজার বিয়ার খাচ্ছেন ।
মাটির তলার সুড়ঙ্গে ঢুকে লন্ডন ডাঞ্জেনের বীভৎস সব কারাকক্ষ , টর্চার চেম্বার আর শরীরকে যন্ত্রনা দেবার নানান যন্ত্র , জ্যাক দা রিপার থেকে শুরু করে প্লেগ , অর্ধেক লন্ডন ছাই হয়ে যাওয়া আগুন ; সব জলজ্যান্ত দেখা হয়ে গেছে দুই কর্তা গিন্নির । বাকিংহ্যাম প্যালেসে রানির সামনে লাল আর নীল গার্ডরা যে তাসের দেশের ছক্কা পাঞ্জা হরতন চিঁড়েতনের মত বাজনার তালে তালে খট খট পুতুলের ছাঁদে হেঁটে চেঞ্জ অফ গার্ড সেরে ফেলল ; হাইড পার্ক পেরিয়ে সেও দেখে ফেলেছেন দুজনে ।
কিন্তু ।
একটা মস্ত কিন্তুর জ্বালায় জ্বালাতন হয়ে আছেন সনাতনী ।
একে বনেদী এদেশী ঘরের মেয়ে । খাতাপিতা ঘর যাকে বলে আর কি আজকাল।
শ্বশুর ঘরেও খাওয়া দাওয়ার চর্চা বিরাট ।
অথচ এখানে এসে ইস্তক পাউরুটি আর রাবারের মত শক্ত মুরগী ভাজা , এই চিবিয়ে থাকছেন সনাতনী । বাইরে দেখছেন সবাই হই হই করে হট ডগ , বার্গার খাচ্ছে ।
একটু জিগেস করেই জানতে পেরেছেন , সবেতেই গরু ঘোড়া শুয়োরের মাংস ।
দুজনেই মুখ ফিরিয়েছেন বেজার হয়ে । ভেজ বললেই , চাট্টি চিজ আর চিজ ।
কাল শেষ মেশ বড় দোকানে নিয়ে গেছিলেন কর্তা ।
ডেবেনহ্যাম ।
কি সুন্দর সাজানো গোজানো । আহা ফুটফুটে সাহেব মেম সব হাই হ্যালো গুড মর্নিং বলে কি খাতির করে অর্ডার নিলো ।
কেমন হেসে হেসে কথা বলে এখানে সবাই , এইটাই সবচে’ ভাল লাগে সনাতনীর । বাস ট্রামের ড্রাইভার থেকে দোকান পসার সব জায়গায় । কি মধুর ব্যবহার , আআহা ।
সনাতনী অবশ্য বেশি মুখ খোলেন না ।
পুরনো বাগবাজারের মেয়ে ত । বাড়িতে এখনও ঠাকুর দালানে দুর্গা পুজো করে সব শরিকে মিলে । তাই ভক্তিমতী ঠাকুমা বড্ড ভালবেসে নাম রেখেছিলেন সনাতনী ।
কর্তার যে কি বিরক্তিই হয় নামখানা বলতে ।
অল্প বয়েসে তবু হেসে উড়িয়ে দিতেন । কিন্তু মাঝবয়েসে এলে গিন্নিদের ওপর যখন তখন খেঁকিয়ে উঠতে কর্তারা বেশ আনন্দ পান । এখন নামটাও গালি দেবার একটা যাচ্ছেতাই ছুতো ।
তাই রাস্তাঘাটে বিদেশে , পারতে মুখ খোলেন না গিন্নী ।
তিনি যে ইংরেজী ভালই বোঝেন বা পড়তে ভালই বাসতেন এককালে , সেটা গিলে ফেলেন ।
কর্তাই মেনু পড়ে ঠিক করেন । অর্ডার দেন ।
আজ এসে টেবিলে বসে আরাম করে বললেন ,” গিন্নি এদের সব চাইতে ভাল ডিসের একখানা অর্ডার দিলাম , বুঝলে । আজ ভাল করে খাও । মেম সাহেব বলল ডেলিকেসি । “
গিন্নি স্মিত হাসলেন ।
এল দুজনের ডিস ।
সুন্দর বোন চায়নার বাটিতে বিরাট দুটি বোমার মত বড় আলু সিদ্ধ , খোসা না ছাড়ানো । ওপরে সাদা সাদা গুঁড়ি গুঁড়ি চাট্টি কি ছড়ানো , আর এক হাতা টম্যাটো সস যার মধ্যে রাজমার ডাল এক মুঠো সেদ্ধ করে দেয়া আছে ।
খানিক হতভম্ব হয়ে থাকার পর সনাতনী চামচ তুলে নিয়ে এক খাবলা মুখে দিলেন ।
না টক , না নুন , না ঝাল , না কোন স্বাদ ।
কর্তার দিকে তাকিয়ে বললেন , “ হ্যাঁ গো , এইটা কি ?”
কর্তাও ভ্যাবাচেকা খেয়ে বসেছিলেন আলুসেদ্ধ এক চামচ কেটে নিয়ে মুখে দিয়ে ।
বললেন ,” আরে পাশে এই ত নুন গোলমরিচ মেয়নিজ সব আছে , এই সব মাখিয়ে খাও , খাসা লাগবে । “
গিন্নি নির্বিকার মুখে বললেন , “ সেতো লাগবেই । বলছি এটার নাম কি ? এত দামি ডিস যখন ।“
কর্তা গম্ভীর মুখে বললেন , “ পটাটো কুকড ইন ইটস জ্যাকেট উইথ চেড্ডার চিজ অ্যানড বেকড বিন ইন টমাটো শস ।“
গিন্নি নুন গোল মরিচ আলু সেদ্ধর ওপর ছড়াতে ছড়াতে বললেন ,” বাহ । খাসা খেতে ।“
তারপর থেকে সনাতনী হিসেব করছেন রোজ । কর্তার ইচ্ছে আছে , আবার এখানে আসার। এদিকে ব্যবসার কি সব অর্ডার টর্ডার পাবার । তখন পরের বারে কোন অসুবিধে হবে না । আসার সময় এভারেস্ট চাট মশলা , ধনে পাতা , ভাজা মশলার গুঁড়ো , এবং আমচুর, আর প্লাস্টিকের প্যাকেটে চাট্টি পাপড়ি নিয়েই আসবেন । এবারে আসার সময় অনেক মুড়ি চিঁড়ে ভাজা ত এনেইছেন । সেই খেয়েই ত রাতে ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় । সেরকমই নিয়ে আসবেন ।
হট ডগের ঠেলার পাশে একটা করে চাটের দোকান থাকলেই রাঁধুনি সাহেবরা শিগগীর দেউলিয়া হয়ে যাবে ।
তখন এখানকার মানুষের রসনারা আনন্দ রসটা টের পাবে বেশ ।
আর বাকি রসগুলো ত হাতে থাকবে , ক্যাপিটাল জমলে লুচি বেগুন ভাজা ঘুঘনি ইত্যাদির দোকান খুলে জমিয়ে খাওয়ানোর জন্য ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।