ক্যাফে গল্পে সুব্রত মিত্র

আমাদের হানিমুন

জীবনে যেটুকু যা করেছি বা করতে হয়েছে তার অধিকাংশটাই প্রয়োজনের তাগিদে করে ফেলা। ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে প্রয়োজন বলতে যা বোঝায় তা হল কি করে বেঁচে থাকব। আর এই কি করে বেঁচে থাকবো এই ভাবনাই আমাকে জীবন যুদ্ধে কখনো জয়ী হতে দেয়নি। জীবন যুদ্ধের সৈনিক হয়েই লড়ে গেছি, আজও লড়ছি। একটা হাল ছাড়া গরুর মত যখন ছুটছিলাম, ছুটতে ছুটতে কখন যেন আমার ভিতরে কোন মানুষের মানসিকতা কাজ করতো। আর এই মানুষের মানসিকতা কাজ করার কারণেই আমি পুরোপুরি হাল ছাড়া গরু হয়ে যেতে পারিনি। বেঁচে থাকার দায়বদ্ধতা আমাকে তাড়িত করেছে সব সময়। যার কারণে বেঁচে থাকার লড়াইটা করে গেছি কিন্তু জীবনকে উপভোগ করতে পারিনি বিন্দুমাত্র। সেই ১৯৯৮ সালের ১২ ই এপ্রিল বিদ্যালয়ের ত্যাগ করেছি। অনেক স্বপ্ন নিয়ে কোলকাতায় বসবাস শুরু হয়েছিল আবার ছাত্র জীবন ফিরে পাব বলে এই আশায়। ছাত্র জীবন ফিরে পাওয়া হলো না। কেন ছাত্র জীবন ফিরে পেলাম না? কারা কথা দিয়েও কথা রাখেনি? অনেক প্রশ্নের মাঝে জীবনের প্রশ্ন হারিয়ে গেল গভীর অন্ধকারে। অবশিষ্ট প্রশ্ন একটাই ছিল কি করে বেঁচে থাকব? আমি পড়াশোনা করলে আমার খাওয়ার খরচ কে যোগান দেবে? একজন নিত্য শ্রমিকের ভূমিকায় এভাবে দিন চলতে চলতে যখন আবার পুনরায় সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়লাম নতুন করে ভাবতে হলো এত একাকী বেঁচে থাকা যায়? কে আমাকে দুমুঠো খেতে দেবে? বৃদ্ধ বয়সে কে দেখবে আমায়? সারা জীবনের এত পরিশ্রম এত সঞ্চয় সব বৃথা হয়ে যাবে যে……. এসব কৌতুহলী প্রশ্নের উত্তর খুজে পেতে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়েছিল ২০০৯ সালের ১০ই মে তারিখে। আমার বিবাহের অনুষ্ঠান সেও এক হাস্যকর ও দুঃখময় ইতিহাস। নিজের হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পয়সার বিনিময়ে আমার বিবাহের সমস্ত খরচ করতে পারলেও স্ত্রীকে কোন উপহার আমি ভালোবেসে দিতে পারিনি সেদিন। একজন উপযুক্ত স্বামী হওয়ার ব্যর্থতার সেই অনুভূতি আমাকে আজও লজ্জিত করে স্ত্রীর সামনে। কত মানুষ জীবনকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখে। কত নারী তার বিবাহিত জীবনের সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে চায় স্বামীর হাত ধরে। আমি পারিনি এগুলো দিতে তাকে। বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি অঞ্চলের ব্রিজিতে একটি টালির দোচালা ঘরে আমরা ভাড়া থাকতাম। দিন আনা দিন খাওয়া সংসার আমাদের। জীবন সংগ্রামের মাঝে হানিমুন শব্দটা আমাদের মাঝে উচ্চারিত করার পরিবেশ উপলব্ধ হয়নি এক্কেবারেই। এতে আমার খুব একটা দুঃখ অনুভব হয়নি সেদিন। তার কারণ আমি তো বেঁচে থাকার জন্যই বিবাহ করতে রাজি হয়েছি। জীবনকে উপভোগ করার জন্য নয়। আর উপভোগ করার লক্ষ্য থাকলেও উপায় তো নেই একদম। তবে অনেকগুলি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও আমি বেশ কয়েকটি বিষয়ে অত্যন্ত অনুকূল স্রোতে ধাবিত হই এ আমার চিরকালীন অভ্যেস। খুব ভোর হতে মধ্যরাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে যখন আমার স্ত্রীর হাসিমুখ খানি দেখতে পাই আমি অনেক ধনী ব্যক্তি হয়ে উঠি মুহূর্তের মধ্যেই। যেকোনো কাজ করে দিন যাপন করা কোন ছোট বড় হয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। ছোট বড় হয়ে যাওয়ার বিষয়ে আমাদের মানসিকতা। আমার দৈনন্দিন জীবন দশা দেখে আমার স্ত্রী প্রথম থেকেই লোকের বাড়িতে ঠিকে কাজ বা বাসন মাজার কাজ করতে আগ্রহবোধ করতো। আমি তাতে রাজি হইনি। আমি মিত্র বাড়ির সন্তান। আমার স্ত্রী লোকের বাড়িতে গিয়ে এঁটো বাসন মাজবে আর আমি একজন পুরুষ হয়ে তা দেখব? তাছাড়া কয়েকদিন পরেই হয়তো আমাদের একটি বাচ্চা হবে তখন তার পিছনে একজন মায়ের দায়িত্ব-কর্মের ভাটা পড়বে তা আমি চাইনা। আমার নিজেরই কষ্টার্জিত পয়সায় পরিকল্পিতভাবে বিবাহের কয়েক বছর আগেই একটি জমি ক্রয় করে রেখেছিলাম আমি গড়িয়া নতুন দিয়াড়াতে। পরবর্তীতে আমার থাকার জায়গা হল, আমাদের ফুটফুটে একটি সন্তান হল,উপযুক্ত বসবাসযোগ্য একটি ঘর হল। আমার সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমার সাধ্যমত একটি উন্নত মানের বিদ্যালয়ে ভর্তি করার সমর্থ্য হলো। বড় হয়ে যেন কোনদিন আমার সন্তান বলতে না পারে বাবা আমাকে একটু শিক্ষা দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে পারলেন না? দীর্ঘ একটা যুগ অতিক্রম করেও দু’বছর পেরিয়ে যেতে যেতে একটা আফসোস আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আজও জীবন্ত ব্যাথা রূপে অনুভূত হচ্ছিল। এতদিন বিয়ে হল, একজন সন্তান হল, সন্তান এত বড় হয়ে গেল, আমরা হানিমুনে যেতে পারলাম না একদিনও? বহুবার স্ত্রী ও আমি পরিকল্পনা করা সত্ত্বেও নানান কর্মব্যস্ততার কারণে হয়ে ওঠেনি আমাদের হানিমুন যাত্রা। তবে এইবারে আর এই বিষয়টিও পড়ে থাকলো না আমাদের জীবনে। গত ২৪ শে ফেব্রুয়ারী ২০২৩ তারিখে আমার পুত্রের কয়েকজন সহপাঠী ও তাদের অভিভাবকদের সাথে আমরা স্বামী-স্ত্রী ও এক সন্তান সহ সবাই মিলে একত্রে দীঘার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। খুব আনন্দ উদ্দীপনা হইহুল্লোর মধ্য থেকে কয়েকটি দিন কাটিয়ে আসলাম দীঘার সমুদ্র সৈকতে। দীঘার পার্শ্ববর্তী অনেক দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখলাম আমরা। চলে গিয়েছিলাম উড়িষ্যার বেশ কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্রে। মাঝে মাঝেই নিজেকে নিয়ে গর্ব ছিল। আর মনে মনে ভাবছিলাম শুধু শুধু আমি এতগুলো বছর থেমেছিলাম। এগুলো হয়তো আমি একটু চাইলেই করতে পারতাম। কাজকর্ম টাকা পয়সা এই বিষয়বস্তুগুলো তো সারা জীবন থাকবেই। তবুও এর বাইরে বেরিয়ে জীবনকে উপভোগের কথা একটু গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে আমাদের। যদিও আমি অত্যন্ত নিম্নস্তরের এক লড়াকু জীবন সৈনিক। আজও নিরবে বসে বসে সেই একাকী জীবনের নিঃশতম দিনগুলোতে তাকাই আর নিজেকে প্রশ্ন করি। তার মাঝেই উত্তর খুঁজে পাই, আমি পুরোপুরি হেরে যায়নি। আমি পুরোপুরি হেরে যাইনি। এমতাবস্থায় দাঁড়িয়েও মাথা উঁচু করে বলতে পারি আমি দরিদ্র নই আমি ধনী, আমি ধনী। আমার মানসিকতার কাছে আমি অত্যন্ত ধনী একজন ব্যক্তি। অনেক মানুষ কোটি কোটি টাকার উপরে দাঁড়িয়েও স্ত্রীর ভালোবাসা পায় না। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও তাদের সন্তানেরা বাবাকে বাবা বলে ডাকে না,মাকে সম্মান করে না। এছাড়া অভ্যাসগত দিক দিয়েও আমি অনেক অনেক ধনী। এই সমাজে একগুচ্ছ ডিগ্রী সহ শিক্ষা বোঝাই মগজ নিয়েও ঢুকলাম লিখতে পারে না এরকম লোক আছে। অথচ আমি এক সাদামাটা ভবঘুরে পাবলিক। এমন একটা সুখী জীবন পেয়েছি। পেয়েছি একটি কবি জীবন। টাকার অনেকগুলি বস্তা না থাকলেও এই সমাজ থেকে পেয়েছি অনেক মানুষের অনেক সম্মান, অনেক শুভকামনা, অনেক ভালোবাসা, এগুলো নিয়েও কি ধনী হওয়া যায় না? যায়। আমাদের জীবনের সময়ে বড় সীমিত। অর্থে ধনী হলে সেই অর্থের সাথেই মিলিয়ে যায়। বিবেক বুদ্ধি সম্মানে ধনী হলে সেই সম্মান সমাজকে দিয়ে যাওয়া যায়। ইতিহাসে এমন মানুষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেতে পেরেছেন তারা অর্থে ধনী না হতে পারলেও সম্মানে ধনী হয়েছেন। এই সমাজ তাঁদের জন্য গর্ববোধ করে আজও। আমার এই নিত্যদিনের সাথী ভাঙ্গা পায়ে এগোতে চাই আরো কিছু স্বপ্ন নিয়ে। আমার পরবর্তী প্রজন্মকে এক শিক্ষণীয় উদাহরণ স্বরূপ রেখে যেতে চাই কিছু প্রমাণ এই দৈনন্দিন আচরণ থেকে। আরো একবার প্রমাণিত করে যাব অর্থে ধনী না হয়েও আমি ধনী হতে পেরেছিলাম।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।