সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৫৭)

রেকারিং ডেসিমাল
হঠাৎ, দরজায়, ঠুক ঠুক।
লাফ দিয়ে গিয়ে দরজা খোলে নতুন বর।
কে ? কি, কি চাই ?
কই কেউ নেই তো সামনের বারান্দায়। দাদু দিদার ঘর বন্ধ। সব ঘরে দরজা দেয়া।
সেজ কাকু নিজের ঘরের দরজা খুলে একটু বেরিয়ে আসেন।
আচ্ছা, কি অভদ্র সব লোকজন! কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই ? দ্যাখো দেখি। সারাদিন এই হইচই, তারপর সবাই শোবে ক্লান্ত হয়ে আছে। এইসব বিরক্তিকর ব্যাপার।
না না, তুই যা। আমি দেখছি।
ঘরে এসে দরজায় ছিটকিনি তোলে বর। আলোর সুইচটা অফ করে বিছানায় বসা মাত্র, ঠুক ঠুক।
তবে রে…
এক টানে দরজা খুলে, সেই হতভম্ব। কোথথাও কেউ নেই।
সেজ কাকু আবার এগিয়ে আসেন।
কিরে?
ফের?
নাহ। এত বড় জ্বালাচ্ছে। দাঁড়া। আমি বাইরে বসি চেয়ারে।
আরে না না। কি মুশকিল। তুমি এখন জাগবে না কি। শুয়ে পড়ো। আমি দেখছি দরজা খুলে রেখে।
নানান কথাবার্তা কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষকে বিবিধ গালাগালির পর দরজা বন্ধ হল।
এই বারে বউ উঠে বসেছে খাটের ওপর।
ছিটকিনি দেয়া মাত্র ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে বরকে বলল, চুপ।
থতমত নতুন বর গলা নামিয়ে বলল, কি?
বাঁদিকের জানালার ও পাশে বাঙুর হাসপাতালের নার্স কোয়ার্টার।
সব সময় লোকের কলকল আর আলো জ্বলে বলে আজ দুটো জানালাই বন্ধ।
বউ ফিসফিস করে বলল, শোনো ভাল করে।
নিচ থেকে ওপরে উঠেছে জানালার পাশে সুপুরি গাছ।
তার পাতারা জানলার খিড়খিড়িতে ঘসা খাচ্ছে। খচ খচ করে আওয়াজ হচ্ছে তার।
বর বলে, গাছ বাইছে কেউ।
কনে এক গাল হেসে, কোমরে শক্ত করে আঁচল গোঁজে।
সড়াৎ করে খাট থেকে নেমে ততোধিক ফিসফিস করে বলে, যেই ওয়ান টু থ্রি বলব, এক ধাক্কায় জানলার পাল্লা খুলে দেবে। দেরি করবে না, বুঝলে?
বর অবাক হয়ে দেখে ক্ষুদ্র মহিলা মাথার কাছের গোল কাঠের টেবিল থেকে জল ভর্তি জগটা তুলে নিয়েছে।
কি করছ ?
মধুমাখা হাসি হাসে নতুন বউ, দেখোই না।
চলো, চলো।
খচমচ আওয়াজটা আরো বেড়েছে জানালার কাঠে।
এর পরে একটা মারাত্মক শোরগোল হল।
এদিকে থ্রি বলতেই জানালা খোলা।
ওদিকে মস্ত জগের জল জানালা দিয়ে ঝপাৎ।
গাছে ছোট খুড়শ্বশুর এবং নিচে সাগরেদ ভগ্নিপতি আচমকা জল গায়ে পড়ে ঠাণ্ডা রাতে চীৎকার এবং ধপাস। এক জন একজনের ঘাড়ে তাই আরো কলরব। একতলার ঘরের ভিতরে থাকা উৎসাহী জনতার সরু মোটা গলার কনসার্ট। সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দাড় করে দোতলায় ওঠা ভিজে জামা ছাড়ার জন্য। বারান্দার আলো জ্বলা। সেজ কাকুর, কি হল কি হল, চিন্তিত আর্তনাদ।
সব মিলিয়ে জগঝম্প।
নতুন বর ভুরু কুঁচকে বলল, দেখব গিয়ে।
কনে বলল, ধ্যুত, সবাই ব্যস্ত আছে। এইবারে ঘুমোনো যাবে। আমি শুলাম।
পর দিন সকালে খোঁজ পাওয়া গেল, ঠুক ঠুক , আসামী, আর কেউ নয়, সেজ কাকুই স্বয়ং।