Cafe কলামে সংগ্রামী লাহিড়ী – ৬

সংগ্রামী লাহিড়ী নিউ জার্সির বাসিন্দা, বৃহত্তর নিউইয়র্ক বলা যায় | পরিচয় - শিক্ষায় প্রযুক্তিবিদ, পেশায় কন্সাল্ট্যান্ট, নেশায় লেখিকা | শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বহুকালের সিরিয়াস চর্চা আছে, অল ইন্ডিয়া রেডিওর A গ্রেড শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী | উত্তর আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের এপিসেন্টারে বসে বদলে যাওয়া প্রবাস-জীবনের ডায়রী লিখছেন |

করোনা-ধারায় এসো – 6

অঙ্ক এলো অনলাইনে – পর্ব 2

 

সেদিনটা ছিল বিদিশার রেড লেটার ডে |
ছাত্র ডেভিড ইমেল পাঠিয়েছে | সে তো ইমেল নয়, যেন লাল চোখের ধমক |
এমনিতেই ডেভিডের চেহারা বিরাট | সুইডিশ উত্তরাধিকার | সাক্ষাৎ ভাইকিংদের বংশধর | বিরাট কাঁধ, আজানুলম্বিত বাহু, সাড়ে ছ’ফুটি ফ্রেম | ছোটোখাটো বিদিশা তার সামনে নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর | কবে কোনকালে তার পূর্বপুরুষ সুইডেন থেকে ভাসতে ভাসতে আটলান্টিক পেরিয়ে ঠেকেছিলেন হাডসন নদীর তীরে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির এলিস আইল্যান্ডে | তারপর আমেরিকায় এগিয়েছে গুস্তাফসন বংশধারা |
এহেন ডেভিড কমিউনিটি কলেজে এসেছে নার্সিং পড়তে | বিদিশা দুয়েকবার ভেবে দেখেছে, অমন শালপ্রাংশু মহাবাহু, বৃষস্কন্ধ নার্স যদি রুগীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রোগ বোধহয় ভয়েই পালাতে পথ পাবে না | সে যাকগে, আসল কথা হলো এই যে নার্সিং পড়তে গেলেও ডেভিডকে অঙ্ক শিখতেই হবে |
ক্লাসে একগাদা ছেলেমেয়ে অঙ্ক শিখতে আসে শুধুই কলেজ পাশ করার জন্যে | এদের কারোরই অঙ্কে অনার্স নয় | কেউ হয়তো ফিলোসফি পড়ে, কেউ বা আবার ফার্মাসি | কিন্তু কলেজের এমনই নিয়ম, বেসিক অঙ্কে পাশ না করলে তারা ডিগ্রি পাবে না | তাই এই কোর্স |
ডেভিড ছোকরার গার্লফ্রেন্ডের নাম মারিয়া | সাউথ আমেরিকার মেয়ে, গোলগাল ফুটফুটে চেহারা | মারিয়া চটপটে, মাথাখানি সাফ, পড়াশুনোয় মনোযোগী | দুজনে পাশাপাশি বসতো ক্লাসরুমে | অঙ্কে ডেভিডের হামেশাই আটকাতো | পাশ থেকে মারিয়া সাহায্য করতো, বুঝিয়ে দিতো | আপ্রাণ চেষ্টা করতো ডেভিডকে পিটিয়ে ঘোড়া বানাবার | একদিন তো রেকট্যাংগলের পেরিমিটার নিয়ে সে কি ধ্বস্তাধ্বস্তি ! যতই বোর্ডে এঁকে বোঝাও না কেন, ক্লাসের আদ্ধেকেরও বেশির ভ্যাবলার মতো মুখ | ডেভিড অবশ্যই তাদের মধ্যে একজন | মারিয়ার মাথাতেই শেষে বুদ্ধিটা খেললো | ডেভিডকে বোঝালো – তোমার ব্যাকইয়ার্ডের বাগানে যদি তুমি চারদিক ঘুরে একপাক দৌড়ে আসো তাহলে যতটা দৌড়োবে সেটাই পেরিমিটার |
ডেভিডের মুখে একগাল হাসি | বুঝেছে নিশ্চয়ই |
বিদিশা আশাবাদী | ডেভিড নিশ্চয়ই পাস করবে | মারিয়া আছে না ?
কিন্তু হায়, ডেভিড হোমওয়ার্ক করে না | বহুবার ওয়ার্নিং দেওয়া সত্ত্বেও না | হোমওয়ার্কের থেকে ওর ঢের বেশি জরুরী কাজ আছে নিশ্চয়ই | অতএব যা হবার তাই হয় | গ্রেড নামতে থাকে, পাস-ফেলের সীমারেখা ধরে ডেভিড বিপজ্জনক দড়ির ওপর টলমল করতে থাকে |
এমনি সঙ্গীন সময়ে বিদিশা একদিন খেয়াল করলো ডেভিড আর মারিয়া দূরে দূরে | পাশাপাশি বসা নেই, বকবকানি বন্ধ,- বাক্যালাপ প্রায় নেই বললেই চলে | ক্লাসে আর চুপ করতে বলতে হচ্ছে না | ব্রেক-আপ !
বিদিশা প্রমাদ গোণে | অ্যাদ্দিন তবু মারিয়া ছিল | এবার একা নিজের কৃতিত্বে ডেভিড কি পাস করে উঠতে পারবে ?
পরের অধ্যায়ে দেখা গেল ক্লাসে ডেভিড বসতে শুরু করেছে আর্থারের পাশে | দুজনে সারাক্ষণ ফুসফুস গুজগুজ | মারিয়া ফিরেও তাকায় না ওদিকে | ব্যাপার দেখে বিদিশা একদিন জিজ্ঞেস করল – কী এতো কথা তোমাদের ?
সগর্বে উত্তর এলো – ও আমায় অঙ্কে হেল্প করে |
বিদিশা থ | আর্থার যে এতো বড়ো দিগগজ তা জানা ছিল না |
মিডটার্মের পরীক্ষা শেষ হলো | সময় শেষ, সবাই খাতা দিয়ে বেরিয়ে গেছে | হলে ডেভিড একা | মিনিট পাঁচেক পর তাগাদা দিল বিদিশা |
বিমর্ষ মুখে খাতা দিয়ে বললো – পরীক্ষা ভালো হয়নি |
সে তো জানাই ছিল, পড়েই না তো পরীক্ষা ভালো হবে কোত্থেকে ?
মুখে বললো – মারিয়া তো দিন দিন ভালো করছে, তুমি ওর সঙ্গে গ্ৰুপ করে পড়তে পারো না ?
– মারিয়া আর সম্পর্ক রাখতে চাইছে না | বলছে – তুমি এতো ডলার খরচ করে কোর্সে রেজিস্টার করেছো অথচ পড়ছো না, ফেল করছো | তার মানে তুমি রেসপন্সিবল নও | সামান্য পড়াশোনায় রেসপন্সিবল না হতে পারলে তুমি জীবনে কি রেসপন্সিবিলিটি নেবে ?
আরো বলেছে ডেভিড ক্যালাস, ডেভিডের সঙ্গে মারিয়ার মেন্টালিটির মিল নেই, ঐজন্যে মারিয়া দূরে দূরে থাকছে |
বিশ্বাস করো প্রফেসর আমি এবার খুব পড়বো | ডেভিডের গলা ধরে আসে |
সে দিনটাই ছিল লকডাউনের আগে শেষ ক্লাস |
এরপর তো অঙ্ক ক্লাসটাই আর নেই | বোর্ডে ছবি এঁকে প্রাণপাত করে বোঝানো নেই | ছেলেমেয়েরা সফটওয়্যারএ লগ ইন করে অঙ্ক শেখে | হোমওয়ার্ক করে | না পারলে টিচারকে ইমেল করে |
লকডাউনে ডেভিড জানালো – আই হ্যাভ টু স্টাডি | ইউ উইল সি |
নিশ্চয়ই ! বিদিশা তো দেখার জন্যেই বসে আছে, আরো কত তার দেখা বাকি ! ক্লাসে তার প্রাইভেট টিউটর আর্থার তো মাঝপথেই ড্রপ করেছে | এবার মারিয়া-বিহীন ডেভিড কি করে দেখা যাক |
প্রথম ঝামেলা বাধলো মাইম্যাথল্যাব নিয়ে |
– প্রফেসর, তোমার কোর্সে আমি নিজেকে দেখছি না কেন ?
– সে কি ? আমি তো তোমায় দিব্যি দেখতে পাচ্ছি আমার গ্রেডবুকে | এই দ্যাখো স্ক্রিনশট |
– কিন্তু আমায় দেখাচ্ছে কোর্স শেষ হয়ে গেছে !
– সফটওয়্যার প্রব্লেম | দাঁড়াও, সাপোর্ট টিমকে বলি |
পরের দিন |
– হ্যালো প্রফেসর, দেড় দিন কেটে গেল, কই এখনো তো কিছু হলো না ?
বিদিশার ঘাম ছুটে যায়, আবার সে খোঁচায় সাপোর্ট টীমকে |
ডেভিড গজগজ করে – এমনই কোর্স যে ফেল করাবে আমায় | কম ডলার নিচ্ছে এর জন্যে ? আবার আশি ডলার দিয়ে মাইম্যাথল্যাবে রেজিস্টার করতে হয়েছে আমাদের |
গজগজানির সঙ্গে ফাউ এই ইমেল | লাল ফন্ট-বাহিত হয়ে বিদিশাকে ধমকাচ্ছে |
ভাগ্য ভালো, সাপোর্ট টিম দিনদুয়েকের মধ্যে সব ঠিকঠাক করে ডেভিডকে মাইম্যাথল্যাবে সেট করে দিলো |
আর সঙ্গে সঙ্গে ডেভিড প্রচন্ড বেগে হোমওয়ার্ক শুরু করে দিল |
দিন নেই, রাত নেই, ডেভিডের লালরঙা ইমেলএর ধাক্কায় বিদিশা বেসামাল | কখনো সে অঙ্কটাই বোঝেনি, কখনো বা কষতে গিয়ে আটকেছে |
বিদিশা যথাসাধ্য তাকে সাহায্য করে | পড়াশোনায় মন হয়েছে, এই না কত !
একদিন কেঁদে পড়লো – তার কম্পিউটার গেছে ভেঙে | শুনে বিদিশার মাথায় হাত | তবে সামলে নিলো চটপট |
– শোনো, আমি তোমায় অঙ্ক কষে কষে পিডিএফ করে পাঠাচ্ছি | যাতে তুমি ফোনেই সেগুলো দেখে নিতে পারো | পরীক্ষার জন্যে অবিশ্যি একটা কম্পিউটার লাগবেই |
ডেভিড বাতলায় – সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে | সিনিয়র গুস্তাফসনের বাড়িতে একটি কম্পিউটার আছে | আমার দাদা আর তার ছেলেমেয়েগুলো সেটা শেয়ার করে | আমি ওটাতেই নাহয় পরীক্ষার সময় বসে যাবো |
বিদিশা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে |
কিন্তু আরো চমক বাকী ছিল | অনলাইন কোর্সে পরপর টেস্ট, হোমওয়ার্ক সবেতেই ডেভিডের দুর্দান্ত গ্রেড |
ফাইনাল আসন্ন | রিভিউ প্যাকেট পৌঁছে গেছে সবার কাছে | বিদিশা চব্বিশ ঘণ্টা ইমেলে থাকে | কে কখন সাহায্যপ্রার্থী হয় – বলা তো যায় না !
আশ্চর্য এই যে ইনবক্সে ডেভিডের একটিও ইমেল নেই | তার দুটো অর্থ হয় | হয় সে সব বুঝে গেছে, নাহলে কিচ্ছু বোঝেনি | বিদিশার বুক ঢিপঢিপ করে | কে জানে বাবা !
খোঁজ নিলো একবার – ফাইনাল রিভিউ ঠিকঠাক চলছে তো ?
লাল রঙের ফন্ট, বাইশ সাইজের ক্যাপিটাল লেটার সাজিয়ে একটি কথায় জবাব এলো – ইয়েস |
ফাইনাল মিটলো | গ্রেডিং করতে গিয়ে মিষ্টি-মধুর চমক – ডেভিডএর ঝুলিতে নব্বই পার্সেন্ট নম্বর !
ভাগ্যিস মারিয়া ধাক্কাটা দিয়েছিলো ! বিদিশার বুঝতে আর বাকি থাকে না ডেভিডের উন্নতির কারণ | মারিয়া ওকে ছেড়ে না গেলে ডেভিড পথে আসতো ? বিদিশা যতই অঙ্ক গুলে খাওয়াবার চেষ্টা করুক না কেন, নিজে পড়াশুনোয় মন না দিলে কেউ কি পাস করতে পারে ? যাক বাবা, এবার ভাব হয়ে যাবে আবার |
ফাইনাল গ্রেডিং করতে করতে বিদিশার মুখে আলতো একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে | সামনের ফল সেমেস্টার শুরু হবে সেপ্টেম্বর মাস থেকে | কলেজ আবার ক্লাসরুমে ফিরছে, অবশ্যই সবরকম সাবধানতা নিয়ে | বিদিশা যেন মনের চোখে দেখতে পেল – মারিয়া আর ডেভিড মুখে মাস্ক এঁটে হাত ধরাধরি করে কলেজের ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরোচ্ছে | রং লেগেছে মারিয়ার আধঢাকা মুখে | সে রং ছড়িয়ে গেছে আশপাশের পাহাড়ী ঢালে, উইলো-মেপলের পাতায় সদ্য-ধরা হেমন্ত-রঙের ছোপে |

 

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।