ডায়েরি পড়তে পড়তে চোখের পাতা ভিজে গেল । আমি খুব আবেগপ্রবণ ।আর আমার বাবা আমার মনে অনেখানি জায়গা জুড়ে আছেন। উনি আমার আবেগের আর ভালোবাসার কেন্দ্র বিন্দু । বাবার বেপারে অনেক ধোঁয়াশা থাকলেও এখন আমার কাছে বাবার ব্যক্তিত্বটা অনেক স্পষ্ট । আমি যখন দিল্লির কলেজে পড়তাম তখন আমার খুব প্রিয়০ প্রফেসর ছিলেন ডঃ সরকার । উনি একসময় নকশাল করতেন তাঁর মুখ থেকেই শোনা তাঁরা কিভাবে এক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে র্যাসনালিসম্
তোয়াক্কা না করে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ছিলেন । আমি এখন রিলেট করতে পারছি যে বাবাও একজন কর্মযোগী পুরুষ ছিলেন । হয়তো ইউটোপিয়ান নেতৃত্বেই নিজের জীবন ভুল দিকে চালনা করেছিলেন । কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম বাবা ছিলেন খাঁটি মানুষ । মা মনে হয়ে বাবার এই অবাস্তব স্বার্থহীন কর্ম যোগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি। হঠাৎ একটা আর্তনাদ কানে এলো । আমি যেন এক ঝটকায় অতীত থেকে বর্তমান মানে ফিরে এলাম । আর্তনাদ শুনলাম কার? আমি স্বভাবতই নরম মনের মানুষ আমার বুকটা দুরু দুরু করে কাঁপছে । আর্তনাদটা এসেছে বাইরের ঘরের থেকে । আমি নিজের বেডরুম এর বেল টা বাজালাম । আমার মনে হচ্ছে আর্তনাদটা বাল্মীকির । কেউ নিশ্চই বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে এবং বাল্মীকিকে অ্যাটাক করেছে । আর্তনাদটা খুব জোরালো ছিল মনে হয়ে আঘাতটাও খুব তীব্র । তাহলে কি বাবার পুরোনো গ্রুপ SOAM এর গুন্ডারা দরজায় ঠক ঠক করছে । বার্গেস্টাইনের
লোক না কি গোকুল কুন্ডু? নাকি দুজনেই একই দলের?আমার ভয় এক মুহূর্তেই বিস্ময়ে পরিণত হল । যখন দরজার ওদিক থেকে বাল্মীকি জিজ্ঞাসা করলো ‘দাদা কেন বেল বাজালেন?’ গলায় কোনো উত্তেজনা নেই । আমি মনে অনেক বল পেলাম । দরজা খুলে দিলাম । বাল্মীকি ঘরে ঢুকলো এক বোতল জল নিয়ে । ও বোধহয় ভেবেছে আমি ওকে জলের জন্যই দেখেছি । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বাজে রাত্রি দেড়টা । ওর হাত থেকে জলের বোতল টা নিয়ে আমি অনেকটা জল খেলাম । জল খেতে খেতেই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভাবলেশহীন একটা মুখ । আমি বোতলটা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আর্তনাদ টা কিসের? জবাব শুনে খুব অবাক হলাম । ও বলল “আর্তনাদ? কই আমিতো কিছু শুনিনি?”আমার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না । আমার এত ভুল হল? যাই হোক আমার সময় নষ্ট করা যাবে না । ভাবলাম হয়তো গল্পের মধ্যে এমন নিমগ্ন ছিলাম যে আমার হ্যালুসিনেশন হয়েছে । বাল্মীকি চলে গেলে দরজা বন্ধ করে দিলাম ।
আবার ডায়েরি নিয়ে পড়তে বসলাম বেশি পাতা আর বাকি নেই । চোঙদার কাকা লিখছেন যে হঠাৎ বাবার মধ্যে একটা পরিবর্তন এল । চোঙদার কাকার মুখ দিয়ে বলি । উনি লিখছেন একদিন শুনলাম ABC র ডিভোর্স হয়ে গেছে । এর পর বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে । একদিন হঠাৎ এক শীতের রবিবার হাতে একটা ওয়াইনের বোতল নিয়ে ABC আমার বাড়ি হাজির । আমার স্ত্রী ইস্লোভা বাড়িতেই ছিল ও ABC কে ভালো করেই চেনে । ইস্লোভা খুবই গুনী মেয়ে । ও পেশায় বায়ো কেমিস্ট্রির প্রফেসার আর নেশা হল চিত্র কলা । শনিবার আর রবিবার হল ওর শিল্প চর্চার দিন । তাই বেশিক্ষন আমাদের সঙ্গ দিতে পারলো না । আমাদের দুই বন্ধুকে একা ছেড়ে ও স্টুডিওতে চলে যায় । আমরা নিঃসন্তান দম্পতি নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে চলি । ABC কে বেশ বিচিত্র দেখাচ্ছিল ওর মানসিক উদ্বেগের কথা ভেবে আমি কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলাম না । ও নিজেই বলা শুরু করলো । কিন্তু যা বলল আমি শুনে স্তম্ভিতো আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না । ভাবলাম ওর সংসার ভেঙে যাওয়ার ফলেই ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে । তাই যতসব অবিশ্বাশ্য কথা বলছে । কথাগুলো আমার কাছে প্রলাপি মনে হল । যাইহোক ও নির্বিকার চিত্তে বলল আর দৃঢ় কণ্ঠে বলল ও ফিলসফারস স্টোন আবিষ্কার করেছে । এবং ওর এই কৃত্রিত্বের ভার আমাকেও দিতে চায় । যে অজানা পার্টিকেল ওই তিনজন কোয়ারী ওয়ার্কর রোগীর দেহে পাওয়া যায় তা আসলে এক নতুন পদার্থ, যা সোনা বা ধাতুকে কৃত্তিম ভাবে বা রসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি করতে পারে । ও পদার্থটার নাম দিয়েছে “কোয়ার্ক “ABC অনেকটাই ওয়াইন খেয়ে ফেলেছিলো । তাই ওর কথা অসংলগ্ন হয়ে পড়েছিল । আমি মদ্যপ অবস্থায় বন্ধুর কথার বেশি পাত্তা দিলাম না । ও হঠাৎ টলতে টলতে বেরিয়ে গেল । বললো ছেলেটা একা বাড়িতে । বাড়ি যাই । যাওয়ার আগে বলে গেল ওর ছেলে অনেক ছোট তাই ওর আবিষ্কারের ও সম্পত্তির লিগ্যাল কাস্টডিয়ান আমাকে করতে চায় ।