সাপ্তাহিক কোয়ার্ক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুশোভন কাঞ্জিলাল (পর্ব – ৮৬)

ছিয়াশি

বেতালদার মুখ দেখে বোঝা গেলো উনি কিছু বুঝতে পারেননি।বেতালদার অনেক জ্ঞান তবু জানার ইচ্ছা অসীম।এই ব্যাপারটা ইঞ্জিনিয়ারিং এর অন্তর্গত হওয়ায় ওনার জ্ঞান খুব কম। আর ওনার কথা কি বলবো আমার ধারণাও স্বচ্ছ নয়। তাই অনিকেতকে বললাম, “ভাই, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং এর ব্যাপারে যদি একটু ধারণা দাও তাহলে খুব ভালো হয় “। বেতালদাও বললেন,”হ্যাঁ ঠিক বলেছেন আপনি। ড্রয়িং বলতে আমার যা জ্ঞান তা ওই বাড়ির প্ল্যান দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কতকগুলো চৌকো ঘরের মধ্যে লেখা ড্রয়িংরুম, বেডরুম ইত্যাদি। এমনকি সিঁড়ির সিম্বলও চিনি। কিন্তু ইংলিশ অ্যালফাবেটের লেটার গুলোর চেহারা যেমন দেখছি তেমন ছাড়া আর কি হতে পারে তা ধারণা করতে পারছিনা “। তবে বেতালদা নিজের সমন্ধে যাই বলুননা কেন আমি জানি উনি খুব তুখোড় বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। স্বরণশক্তিও অসাধারণ। নিজের বুদ্ধিকে ভালোভাবে প্রয়োগও করতে পারেন।অনিকেতের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম।অনিকেত বলতে শুরু করলো ,”ইঞ্জিনিয়ারিং এর দুটো দিক আছে একটি হলো ডিজাইনিং আরএকটি হলো ম্যানুফ্যাকচারিং দিক একদল আছেন যারা তাদের জ্ঞান ও কল্পনা মিশিয়ে নতুন কিছু তৈরি করার কথা ভাবেন। এদের বলে ইঞ্জিনিয়ার বা আরো স্পেশাফিকলি ডিজাইনার আর একদল আছে যারা প্রথম দলের ভাবনাকে কার্যে পরিণত করেন।অর্থাৎ সেই নতুন জিনিস তৈরি করেন বা ম্যানুফ্যাকচার করেন বা প্রোডাকশন করেন। এই দ্বিতীয় দলে পরে ফিটার বা সহজ ভাষায় কারিগর। এখন যার ভাবনা এবং যে এই ভাবনাকে কাজে লাগান এই দুই এর মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো যোগাযোগই থাকেনা। তাই এই দুই দলের মধ্যে একটা যোগ সূত্র থাকা থাকা দরকার। প্রথম দলের ভাবনার এমন এক ভাষা থাকা দরকার যা পরে দ্বিতীয় দল বুঝতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করবে। ড্রয়িং হলো সেই ভাষা যা দুই দলের মধ্যে যোগসূত্র। প্রথম দলের ভাবনার চিত্ররূপ হোল ড্রয়িং যা দেখে দ্বিতীয় দল বুঝে নিতে পারবেন প্রথম দল কি ভেবেছেন এবং কিভাবে করতে হবে।”অনিকেত কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামলো তারপর আবার বলতে শুরু করলো,”ড্রয়িং এ প্রজেকশন বলে একটা কথা আছে। এক কোথায় যাকে বলা হয় প্রতিরূপ। আমি কোনো জিনিসকে কিভাবে দেখব তার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রতিরূপ তৈরি হবে। যেমন ফার্স্ট অ্যাঙ্গেল প্রজেকশন, থার্ড অ্যাঙ্গেল প্রজেকশন। আমাদের দেশে সাধারণত ফার্স্ট অ্যাঙ্গেল প্রজেকশন করেই ড্রয়িং করা হয়।আর একটু বিশদে বলি। ধরুন একটি বস্তুর ওপর আলো এসে পড়লো।তাহলে বস্তুটার পেছনে দেয়ালে ওর যে ছায়া পড়বে সেটাই ফার্স্ট অ্যাঙ্গেল প্রজেকশন। আবার যদি সেই ছায়া ইটের দেওয়ালে না পরে কোনো কাঁচের দেয়ালে পরে এবং সেই কাঁচের দেওয়ালের পেছনে গিয়ে যদি দেখা যায় তাহলে বস্তুটির যেই প্রতিরূপ দেখা যাবে তা হলো থার্ড অ্যাঙ্গেল প্রজেকশন। “
একটানা অনেক্ষন কথা বলে মনে হয় অনিকেতের গলা শুকিয়ে গেছে। ও একটু জল খেতে চাইলো। জল খেয়ে আবার বলতে শুরু করলো, “এর পর বলতে হয় ভিউ প্রসঙ্গে। একটা সলিড বডির অনেকরকম ভিউ হতে পারে।একটা সলিড বডি থ্রি ডাইমেনশনাল হয়। অর্থাৎ তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, আর উচ্চতা থাকে। কিন্তু এই তিনটে ডাইমেনশন আমরা একসঙ্গে দেখতে পাইনা।তাই তিনটে ডাইমেনশন কে বুঝতে গেলে বা মাপতে গেলে আমাদের বিভিন্ন ধরণের ভিউ নিতে হবে।উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক এইটা “বলে অনিকেত একটা দেশলাই এর বাক্স হাতে তুলে নিলো। বললো,”এবার দেখুন যদি দেশলাই বাক্সের উপর দিকটা তাকাই তাহলে বাক্সোটার ছবি দেওয়া সারফেস টাই দেখতে পাবো আর আকৃতি দেখতে পাবো আয়তকার। তার মানে টপ ভিউ থেকে আমরা দেখতে পাবো দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ এই দুটো ডাইমেনশন। এইবার দেশলাই বাক্সের সাইডে যে বারুদ লাগানো আছে সেই সাইডটা চোখের সনে তুলে ধরলে আরো একটা রেক্টঙল বা আয়তোক্ষেত্র দেখতে পাবো।কিন্তু তার শেপটা হবে আলাদা। এটা হলো সাইড ভিউ এই ভিউ থেকে পাওয়া যায় দৈর্ঘ্য আর উচ্চতা। এবার দেশলাই এর যে দিকটা খোলাযায় সে দিকটা চোখের সামনে ধরুন এটাকে বলা যায় ফ্রন্ট ভিউ এই ভিউ থেকে পাওয়া প্রস্থ ও উচ্চতা। তাহলে এই দেশলাই বাক্স বা তার মতো সিমেট্রিকাল বা কোনো সলিড বস্তুর ক্ষেত্রে তিনটে ডাইমেনশন পেতে গেলে অন্তত দুটো বা তিনটে ভিউ নিতেই হবে। কিন্তু সলিড বস্তুটা যদি দেশলাই বক্সের মতো
রেগুলার শেপের না হয় তাহলে বিষয়টা জটিল হবে। সেক্ষেত্রে অনেকরকম ভিউ নিতে হবে। যেমন একটা চার চাকার গাড়ি বা আগেকার দিনের স্টিম ইঞ্জিন এগুলো সব কম্পোজিট স্ট্রাকচার।এদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কম্পোনেন্টের আলাদা নিয়ে সেকশনাল ড্রয়িং করতে হয়।”এও পর্যন্ত বলে অনিকেত থামলো। অনিকেত থামতেই বেতালদা বললেন,”আচ্ছা ভাই এতক্ষন যা বোঝালে তা ভালো ভাবেই বুঝলাম। কিন্তু আমাদের অর্কসাহেব যে ইংলিশ হরফ আর সংখ্যার ড্রয়িং গুলো বানাতে বললেন সেগুলো তো টু ডাইমেনশন। তাহলে ওদের ড্রয়িং কেমন হবে? অনিকেত একটু মুচকি হেসে বললো, “আপনি ঠিক বললেন আবার ঠিক বললেন না। অ্যালাফাবেট এবং সংখ্যা যখন খাতায় লেখা হয় বা বইয়ের পাতায় থাকে তখন টু ডাইমেনশনাল। কিন্তু তাদের যখন সলিড বডির আকার দেওয়া হয় তখন তারা থ্রি ডাইমেনশনাল।লক্ষ করে দেখুন অর্কদা আমাকে যে অ্যালফাবেট বা সংখ্যা দিয়েছে তার থিকনেসও আছে ওরা তাই থ্রি ডাইমেনশনাল “। এই কথা বলে অনিকেত প্লাস্টিকের A লেটার টা বেতালদার হাতে দিয়ে বললো,”এটা দেখলেই বুঝতে পারবেন। আরো একটা ব্যাপার হলো যে ড্রয়িং এ ব্যবহৃত বিভিন্ন লাইনের আলাদা আলাদা মানে আছে। কন্টিনিউয়াস লাইন, ডটেড লাইন, হিডন লাইন, সেন্টার লাইন। আর আছে অনেক রকমের সিম্বল। ওয়েল্ডিং, ড্রিলিং, মেশিনিং, এদের সিম্বল আলাদা রকমের “। অনিকেত এবার তার বক্তব্য শেষ করে চুপ করলো।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।