দুপুরের পর থেকেই রামকমলবাবুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
ডাক্তারবাবু আগেই জবাব দিয়ে গিয়েছিলেন। বিকালের দিকে তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
বাড়িতে তাঁর কাছের সব মানুষজন বুঝতে পেরেছিল তিনি আর বেশিক্ষণ থাকবেন না। সকলেই বিষণ্ণ মনে তাঁর পাশে উপস্থিত; উপস্থিত রামকমলবাবুর সবচেয়ে প্রিয় তার ছোট্ট নাতি বুবাইও। বুবাই আড়াই বছর বয়সে যখন থেকে মানুষ চিনতে শিখেছে, তখন থেকেই দাদু অন্তপ্রাণ। দাদু ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী। দাদুর সঙ্গে খেলা, দাদুর কাছে বই নিয়ে ছবি দেখতে বসা, দাদুর সাথে খেতে বসা। এমন কি খাবার সময়েও দাদু যা খাবে ওকেও তাই দিতে হবে। রামকমলবাবুও প্রচণ্ড আদর আর ভালোবাসায় তাকে জড়িয়ে রাখতো।
রামকমলবাবুও বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর অন্তিম সময় আগত। এত মায়ায় ঘেরা
পৃথিবী ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে কোন অজানা লোকে! তাই বার বার আঁকড়ে ধরতে চাইছিলেন শেষবারের মতো প্রিয়জনদের। তিনি প্রিয় নাতিকে কাছে ডাকলেন। নাতির মাথায় স্নেহের স্পর্শ বুলাতে লাগলেন। হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। প্রিয় নাতি হারিয়ে গেল তাঁর দৃষ্টির আগোচরে। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা অশ্রুধারা। পরক্ষণেই রামকমলবাবু পাড়ি দিলেন অজানালোকে। ছোট্ট বুবাই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার একান্ত আপন দাদুর দিকে। কি ঘটে গেল তা বোঝার বয়সও এখনো হয়নি তার।
এরপর দুদিন কেটে গেছে। বুবাইয়ের শিশুমন এখনও বোঝেনি মৃত্যু কি? মানুষের হারিয়ে যাওয়া কি? তাই ওর শিশুমন বাড়ির মানুষের ভিড়ে খুঁজে বেড়ায় তার খেলার সাথি দাদুকে। দরজায় আওয়াজ হলে তাকিয়ে দেখে যদি তার দাদু এসে থাকে। দাদুর কথা জিজ্ঞসা করলে আদো আদো স্বরে বলে, “দাদু বাইলে গেছে, এখুনি ফিলবে তো।”
কী অদ্ভুত এই জীবন! একদিন যে মায়ার বাঁধন বেঁধে রাখে দেহ-মন, সময় এলেই সে বাঁধন ছিড়ে হারিয়ে যেতে হয় কোন আজানায়। পড়ে থাকে শুধু এই নশ্বর দেহ। বুবাই এর ছোট্ট মনেও দাদুর ছবিটা একদিন আবছা হতে হতে হারিয়ে যাবে স্মৃতির অতলে। তখন তার সরল চোখ আর খুঁজে বেড়াবে না তার একান্ত প্রিয় দাদুকে। বড় হওয়ার সাথে সাথে হয়তো কিছু কিছু রেখা থেকে যাবে মনের মাঝে। হয়তো শৈশবের স্মৃতিচারণের সময় কিছু কিছু কথা বা ঘটনা মনে ভেসে উঠবে অস্বচ্ছ ছায়ার মতো। বড় হয়ে মা-বাবার কাছে গল্প শুনবে দাদুর আদরের, দাদুর ভালোবাসার…..