T3 || স্বাধীনতার খোঁজে || বিশেষ সংখ্যায় সুশোভন কাঞ্জিলাল

হাজীগঞ্জের স্বাধীনতা

এক
চারিদিক থেকে ধেয়ে আসছে শত শত লোক। মুখে তাদের রণ-হুঙ্কার। কারুর হাতে লেলিহান মশাল আবার কারুর হাতে লাঠি, কাস্তে, কোদাল বা আঁশ বটি। মাঝরাতে হাজীগঞ্জের কালো আকাশ, গ্রামবাসীর ক্ষোভের আগুনে ফর্সা হয়ে যেন নতুন সূর্যোদয়ের জন্য পটভূমি সাজাচ্ছে। স্বাধীনতার সূর্যোদয়!

দুই
ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে এলিনা মেমসাহেব। ততোধিক আক্রোশে বন্ধ ঘরে দাপাদাপি করছে মদ্যপ ব্রাউন সাহেব। মেমসাহেবের অনুরোধ বা হুকুম, যে কোনো একটা কারণে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বন্ধ দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির ভৃত্য আলতামাস। সাহেবের ক্রোধের আগুনে ভস্ম হওয়ার ভয় এই তল্লাটে কার নেই! কিন্ত জন্ম দাওয়া আর মৃত্যু আটকানোর জন্য মানুষ সব সীমা অতিক্রম করতে পারে।

তিন
ক্ষিপ্ত গ্রামবাসীরা দঙ্গলে দঙ্গলে সাহেবকুঠির একদম কাছেই চলে এসেছে। তারা আজ মংলার খুনের বদলা নেবেই। লালমুখো ব্রাউন সাহেবের সঙ্গে সব বোঝাপড়া আজ সাঙ্গ করবে ওরা। অনেক অত্যাচার সহ্য করেছে ওরা মুখ বুজে এই পাঁচ বছর ধরে। সেই যবে থেকে অত্যাচারী ডেভিড ব্রাউন এই এলাকার কালেক্টর হয়ে এসেছে।

চার
না পারলো না। মেমের অনুনয় বা ভৃত্যের বিনয় কিছুই আটকাতে পারলো না দোর্দন্ড প্রতাপ ব্রাউন সাহেবকে। চাবুক হাতেই বেয়াদপ প্রজাদের শায়েস্তা করতে বাংলোর বাইরে বেরিয়ে যেতে গেলেন সাহেব। কিন্তু দরজা একটু খুলে প্রজাদের সংখ্যা দেখে মেমের শেষ অনুরোধটি অবশ্য রাখলেন। স্ত্রীর হাত থেকে বন্দুকটা এক হাতে নিয়ে আর আরেক হাতে চাবুক ধরে, বীর দর্পে দরজা খুলে বাংলো থেকে বেরিয়ে এলেন সাহেব। বুক চিতিয়ে বেয়াদপ নেটিভদের সামনে। হঠাৎ প্রসব যন্ত্রনা উঠলো এলিনা মেমসাহেবের। আলতামাস প্রভুর বিপদ ভুলে মালকিনকে ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলেন আর পেছনের দরজা দিয়ে ছুটলেন গ্রামের ধাইমাকে ডাকতে।

পাঁচ
মংলা মানে মঙ্গল কয়াল একটু খ্যাপা ধরনের সবাই জানে। উচ্চতায় প্রায় সাড়ে ছয় ফুট আর চেহারাও তেমন খোলতাই। নিরাবরণ তৈলাক্ত আবলুস রঙের সুঠাম দেহতে একটি খাটো ধুতি জড়িয়ে যখন সে মাঠে লাঙ্গল টানে তখন সেই দৃশ্য দেখার জন্য রীতিমতো লোক জড়ো হয়ে যায়। মাংস পেশী গুলো যেন ঢেউ হয়ে অতল শরীরের সমুদ্রে খেলা করে। ঘাট থেকে ফিরতি সদ্যস্নাত মেয়ে বৌরাও মাঝে মাঝে ঝোপঝারের আড়ালে খানিক দাঁড়িয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করে যায় সবার অলক্ষ্যে। কিন্তু চিরকুমার মংলার বুদ্ধিশুদ্ধি বলতে কিচ্ছু নেই, সবাই বলে ছোটবেলা থেকে তার মাথায় একটি মস্ত বড় আব মানে টিউমার আছে তাই হয়তো। দাদার সংসারে থাকে আর গাধার মতন পরিশ্রম করে সারাদিন। বাকি কাজ বলতে খাওয়া আর ঘুম। দাদাও খুব স্নেহ করে ছোট ভাইটাকে। সেদিন দাদা রঙ্গন কয়াল গেছিল শহরে, সাহেবের পেয়াদারা এসে রঙ্গনকে না পেয়ে বকেয়া খাজনা আদায়ের জন্য ভাই মংলাকেই ধরে। মংলা উত্তেজিত হয়ে গুছিয়ে দু ঘা করে দুই পেয়েদার মধ্যে বখরা করে দিয়ে তাদের ধরাসায়ী করে। পেয়াদারা পালিয়ে বেঁচে সাহেবকে গিয়ে নালিশ করে। ক্ষেপে আগুন হয়ে সাহেব জনা কুড়ি পেয়াদা পাঠায় মংলা কে ধরে আনতে। তারা ধরে এনে সাহেবের বাংলোর সামনে এক প্রকান্ড খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে মংলাকে। দুপুরে ক্ষিদের চোটে কাহিল হয়ে মংলা খুটি শুদ্ধু উপড়ে তুলে বাড়ি ফিরে আসে। খবরটা জানার পর সাহেবের রোষানল রোখে কে? তার পেয়াদাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে নিজের ঘোড়ার পেছনে বেঁধে টেনে হিচড়ে ফের ধরে নিয়ে আসে মংলাকে। এবার শেকল দিয়ে বেঁধে চেলা কাঠ দিয়ে বেদম মারতে থাকে মংলাকে। হঠাৎ একটা মোক্ষম প্রহার এসে লাগে মংলার আবে। রক্ত বন্যা বইতে থাকে খ্যাপা মংলার মাথা থেকে। সদ্য বলি দাওয়া পাঠার মতন ছটফট করে স্থির হয়ে যায় বিশাল মংলা।

ছয়
মদ্যপ স্বৈরাচারী ব্রাউন সাহেব এসে দাঁড়ায় উন্মত্ত জনতার সামনে। কেউ এগিয়ে আসার দৃষ্টতা দেখালেই চাবুক চালায় সাহেব। ঘা খায় কয়েকজন। কিন্ত সেই প্রবল জনরোস চাবকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না সাহেব। বাধ্য হয়ে গুলি চালায় ব্রাউন। হোক আজ জালিয়ানবালা বাগের পুনরাবৃত্তি এই হাজীগঞ্জে। উপরমহলে সে জবাব দিয়ে সামলে নেবে। কিন্তু সেই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য জনতাকে সাহেবের গুলি ভয় দেখাতে পারলো না। কি আশ্চর্য একটা গুলিও কারুর গায়ে লাগলো না। গুলির আওয়াজ যেন কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে বন্দুকের নলে তলিয়ে গেল প্রবল বিদ্রোহের দামামার আওয়াজে। বিতশ্রদ্ধ প্রজারা পিটিয়ে মেরে ফেললো নিষ্ঠুর অত্যাচারী কালেক্টর ডেভিড ব্রাউনকে। এই নরপিশাচ পাঁচ বছর ধরে অনেক অত্যাচার করেছে। আজ অবসান হল এই অসহায়তার, আজ থেকে বাড়ির মেয়ে বৌরাও নিরাপদ, সকল অত্যাচারের অবসান, আজ থেকে মুক্ত সবাই, আজ থেকে সবাই স্বাধীন। এক গ্রামবাসী বাংলোর গা বেয়ে উঠে ছাঁদে ওড়া লাল সাদা পতাকাটা টেনে হিচড়ে ছিঁড়ে ফেললো। আরেকজন তার দিকে ছুঁড়ে দিলো মৃত মংলার রক্তাক্ত ধুতি। পতাকার বদলে সেটাকেই পোলের সঙ্গে বেঁধে দিলো প্রথমজন। প্রবল বাতাসে উড়তে থাকলো মংলার ধুতি। নিজেদের স্বাধীনতার প্রতীকটি উড়তে দেখে জয়ল্লাসে ফেটে পরলো জনতা।
সাত
সেই আওয়াজে চেপে গেল এক সদ্যজাত শিশুকন্যার কান্না। এলিনা তখনো  মুহ্যমান। ধাইমার কোলে শিশুটিকে ফেরত দিয়ে দীর্যশ্বাস ফেলে আলতামাস। না! এতো পুরোই সাহেবের বাচ্চা। বৃথাই সে তার সাহেবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। সাহেব তো নিজের লোক দিয়ে মংলার লাশটা লোপাট করেই দিয়ে ছিল নিজেদের গোরস্থানে পুঁতে দিয়ে। কেউ কিছুই টের পেতো না যদি না অযথা ভয় পেয়ে সে মংলার ধুতিটা গ্রামবাসীদের হাতে দিয়ে সব সত্যিটা জানিয়ে আসতো। আলতামাস পেছনের দরজা দিয়ে লুকিয়ে বেরিয়ে গ্রামবাসীর ভিড়ে মিলিয়ে গেল।
আট
এলিনার যখন হুঁশ এলো, চারিদিকে তাকিয়ে নিজের সন্তানকে খুঁজতে লাগলো। ধাইমা হাসি মুখে মেয়েকে তার বুকের ওপর শুইয়ে দিলো। কাঁপা হাতে মেয়েকে দুই হাতে তুলে দু’চোখ ভরে দেখে ফুঁপিয়ে উঠলো এলিনা। এতো ডেভিদেরই সন্তান। না হলেও, ডেভিড তো বুঝতেও পারতো না। খামোকা ডেভিডকে মরতে হলো! সে জানে ডেভিড আর বেঁচে নেই, থাকার কথাও না। বান্দুকের গুলি গুলো তো সে নিজেই বার করে রেখে ছিলো। এলিনার আর উপায় ছিলো না যে। নিজের স্ত্রীর গর্ভে নেটিভের কালো বাচ্চা দেখলে ডেভিড বৌ আর বাচ্চা দুজনকেই মেরে ফেলতো। কিন্তু এলিনা জানতো যে ডেভিডের পক্ষ্যে বাবা হওয়া সম্ভব নয় যদিও অহংকারী ডেভিড তা কখনই মানত না। এলিনা মাতৃত্বের জন্য সব করতে পারে। জন্ম দাওয়া আর মৃত্যু আটকানোর জন্য মানুষ সব সীমা অতিক্রম করতে পারে। সে আজ এক পরিপূর্ণ নারী এবং এক স্বাধীন মা। তার আর কিছু চাই না। স্বামীর নামের যে টাকাগুলো পাবে তা দিয়ে ব্রিটেনে ফিরে গিয়ে মা মেয়ের দিব্যি চলে যাবে স্বাধীন ভাবে। মেয়েটার একটা নাম দিতে হবে। কৌতূহলী ধাইমাকে মেয়েকে ফেরত দিয়ে এলিনা বললো “হার নেম ইস ইন্ডিয়া ব্রাউন।”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।