সাপ্তাহিক কোয়ার্ক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুশোভন কাঞ্জিলাল (পর্ব – ৯৮)

আটানব্বই

আধো ঘুম আধো জাগরণেই ভোর হয়ে গেল। তারা তারি উঠে পড়লাম। পার্ক হোটেল পৌঁছতে হবে সকাল দশটায়। হাতে বেশি সময় নিয়েই, মোক্তারকে সঙ্গে নিয়ে সকাল ৭টায় বেরিয়ে পড়লাম। পুনিতকে দেখার জন্য হসপিটাল পৌঁছে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পেশাল পারমিশন নিয়ে পুনিতের কেবিনে গেলাম। গিয়ে দেখি খাঁচায় বন্দি সিংহের মতো পুনিত ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে। আমাকে দেখতে পেয়েই উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো “স্যার গুডমর্নিং। আমাকে এবার ছাড়তে বলুন তো স্যার। ব্যাটা মোক্তার নাকি আপনার প্রটেকশন দিছে? এমন একটা সিরিয়াস এবং এক্সাইটিং কেস যেখানে আপনার ওপর যখন তখন আক্রমণ হতে পারে। এই রকম কেসে মোক্তারের মতো একটা পেটমোটা হাবিলদার কি করে প্রটেকশন দেবে বলুনতো? ও ব্যাটা দৌড়োতে পারবে? খুব দ্রুত কিছু মুভ করতে হলে লদস বদস ভুঁড়ি নিয়ে পারবে? আমি এবার হেসে ফেললাম। ভাগ্যিস মোক্তার এখানে নেই। আমি পুনিতকে ধরে বেডে বসালাম। বললাম “পুনিত তুমি শান্ত হও আগে। তারপর সব বলছি “।পুনিত বলল,”এমন একটা কেস আর আমাকে নাকি বন্দি করে রেখেছে। এই কদিনে কিকি ঘটনা ঘটেছে আমাকে খুলে বলুন স্যার প্লিজ “। আমি পুনিতকে একে একে ওর মিস করা ঘটনা গুলো বললাম। তবে ধাঁধা আর কোয়ার্কর কথা বাদ দিয়ে। কারণ কোয়ার্কর কথা বাইরে যত কম বলা যায় ততই ভালো। পুনিতের সঙ্গে ঘন্টাখানেক কাটিয়ে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এলাম মোক্তারকে সঙ্গে নিয়ে। একটা ট্যাক্সি ধরে উঠে বসলাম। চলতে চলতে আর্যমাকে ফোনে জানিয়ে দিলাম যে পুনিত ভালো আছে। ডাক্তার বলেছে ওকে দিন দুয়েক পর ছেড়ে দেবে। আর আমি বার্গেনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি পার্ক হোটেলে। মোক্তারকে হোটেলের ভিতর ঢুকতে নিষেধ করলাম। বললাম যে হোটেলের বাইরে কাছেই কোথাও দাঁড়িয়ে থাকতে। মনে হয় ভয়ের কিছু নেই। আমি রিসেপশন এ গিয়ে বললাম ডঃ বার্গেনস্টাইন এর সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট এর কথা। সুইট নাম্বার টা বললাম 1029। সুন্দরী রিসেপশনিস্ট ইন্টারকমে ডঃ বার্গেনস্টাইন এর সাথে কথা বলে কনফার্ম করলো।আমি যেতে যেতে ভাবলাম ভাগ্যিস এসকর্ট দিয়েছিলো। নির্দিষ্ট লিফ্ট থেকে নেমে করিডোর ধরে এগোচ্ছি এর ভাবছি এতো ভুল ভুলেইয়া। সবই একরকম।
নির্দিষ্ট দরজার কাছে গিয়ে বেল বয় বেল বাজাল। একজন মোটা মেমসাহেব দরজা খুলে হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করলেন,”junior ABC”। আমিও হেসে উত্তর দিলাম,”ইয়েস মি ম্যাম “। মেমসাহেব বেশ আন্তরিকতার সাথে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বসার জায়গায় আমাকে বসিয়ে উনি জার্মান ভাষায় বললেন যে, ওনার সাহেব কে আমার কথা গিয়ে জানাচ্ছেন। এবার আমি বুঝলাম মেমসাহেবটি ডঃ বার্গেনস্টাইনের মেড। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডঃ বার্গেনস্টাইন এর মেড। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডঃ বার্গেনস্টাইন আবির্ভাব হলো আমার সামনে। কিন্তু খুব অবাক হলাম যে উনি নিজের পায়ে হেটে আসেননি। এসেছেন হুইল চেয়ারে বসে। ওনাকে চেয়ার ঠেলে নিয়ে এসেছেন ওই মেড কাম অ্যাটেনডেন্ট। ডঃ বার্গেনস্টাইন অথর্ব!খুব আন্তরিকতার সঙ্গে উনি আমায় ওয়েলকাম করলেন। জার্মান বলেই হয়তো সকাল দশটাতেই আমসকে বিয়ার অফার করলেন। আমি ভদ্রতার খাতিরে রিফিউজ করলাম না। বেশ খোস মেজাজেই গল্প শুরু করলেন প্রায় আসি বছরের বৃদ্ধ জার্মান। কথা বলার সময় আন্তরিক শ্রদ্ধাও ঝরে পড়লো। শুধু তাই নয় বাবা ছিলেন সাধক মানুষ, একজন সাচ্চা আলকেমিস্ট।
ওনার মুখেই শুনলাম পৃথিবীর সমস্ত অ্যালকেমিস্ট দের গ্লোবাল সংগঠন হল “রয়্যাল অ্যালকেমিস্ট সোসাইটি “বা সংক্ষেপে RAS কিন্তু বিজ্ঞান সাধনা এর নিছক সাধনায় সীমাবদ্ধ রইলো না। যখন সাধনার মধ্যে লোভ স্বার্থপরতা ঢুকে পড়লো। কিছু দুরো দৃষ্টি সম্পন্ন বিজ্ঞানী যারা ক্রমশ কোন ঠাসা হয়ে পরে ছিলেন।তারা লোভিদের সাথে না পেরে উঠে আলাদা এক সংগঠন তৈরি করলেন, নাম দেওয়া হলো SOAM। বাবা প্রথমে RAS er মেম্বার ছিলেন। কিন্তু বাবা ছিলেন নিঃস্বার্থ বিজ্ঞান সাধক। তার সাধনা ছিল মানব কল্যাণের জন্য। বঞ্চিত মানুষদের অধিকার অর্জনের জন্য। তাই তিনি কোনো মোতেই RAS এর সাথে খাপ খাওয়াতে পারলেন না। তিনি RAS ছেড়ে SOAM এর মেম্বার হলেন। কিন্তু বাবা ওদের ছাড়লেও ওরা বাবাকে ছাড়লো না। বাবা ছিল সব থেকে সম্ভাবনা ময় বিজ্ঞানী। তাকে ছাড়লে ওদের ক্ষতি হবে। তাই বাবাকে নিয়ে একটা টানাপোড়েন বজায় ছিল। বাবার মৃত্যুর আগে SOAM এর অধিবেশন হয়েছিল, তাতে বাবা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছিলেন। যে তিনি ফিলজফারস স্টোন খুঁজে পেয়েছেন। একথা RAS এর কাছেই নিশ্চই পৌঁছেছিলো। তারপর থেকেই ওরা হয়তো মরিয়া হয়ে গিয়েছিলো বাবাকে ফিরে পাওয়ার জন্য। এর বাবা বোধহয় RAS এর বাহুবল, অর্থবল এবং তার আবিষ্কারের প্রতি ললুপতায় খুব বিপন্ন বোধ করেন এবং নিজের আবিষ্কারকে বাঁচাতে নিজের আত্মহুতির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। অথবা RAS এর শয়তানেরাও আমার বাবাকে মেরে ফেলতে পারে। বাবার মৃত্যু হত্যা না আত্মহত্যা একথা বার্গেনস্টাইন ও নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।