T3 সাহিত্য মার্গ || ১৫০ তম উদযাপন || সংখ্যায় সুশোভন কাঞ্জিলাল

গ্রীন কিং

এই লেকের বেঞ্চেই ইন্দ্রানী বসে থাকতো শ্যামলের জন্য। ইভিনিং ওয়াকের দাদু দিদারা বসে আছে এখনো। শ্যামল সন্ধ্যা নামার অপেক্ষায় পাশের বট গাছের নিচে অপেক্ষা করছিলো। সূর্য ঝুপ করে ডুবে যাওয়ার আধ ঘন্টার মধ্যেই বেঞ্চটা ফাঁকা হয়ে গেলো। গুটি গুটি পায়ে শ্যামল এগিয়ে সেই বেঞ্চটায় বসলো। ইন্দ্রানী ঠিক পাশে এসে বসবে শ্যামলকে একা বেঞ্চে দেখে। কিন্তু ঠিক তারপরেই দুটো চ্যাংরা ছেলে এসে বসলো শ্যামলের পাশে। গাঁজা খাচ্ছে। গাঁজার গন্ধ সহ্য হয় না শ্যামলের আর আজকাল। কিন্ত উঠে গেলে বেঞ্চটা হাত ছাড়া হয়ে যাবে। নাকে হাত চেপে বসে থাকলো শ্যামল। একটা রিফার টেনে উঠে গেলো অপোগন্ড দুটো। এবার তাহলে ইন্দ্রানী আসবে। ওহ বাবা আবার দুজন জোড়া শালিক এসে বসলো সেই বেঞ্চে। বাবা এতো প্রেম যখন ওয়ো না কি সব হোটেল খুলেছে সেখানে যাও না বাপু! শ্যামলদের সময়ে তো এই সব ছিলো না। ছিলো এই লেকটুকু। এই বেঞ্চেই তো একে ও অপরের কাছে উজাড় করে দিতো শ্যামল আর ইন্দ্রানী। কিন্ত এখন পাশে বসা এই দুই নারী পুরুষের চুম্বন আর দৈহিক ভালোবাসা শ্যামল সহ্য করতে পারছে না। আরো বাঁদিক ঘেঁষে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলো শ্যামল। কিন্তু প্রেম কি শুধুই শারীরিক! দুই শরীরের তৃপ্তি শব্দময়ও সেটা টের পাচ্ছে শ্যামল। কিন্ত বেঞ্চ ছাড়া যাবে না। ইন্দ্রানী আসবে। শ্যামল নিশ্চিত। বেঞ্চটা শুধু ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায়। শ্যামলের ধৈর্যের বাঁধ ঠিক ভাঙার আগের মুহূর্তে ওই দুজন কপোত কপোতী উঠে গেলো। এবার ইন্দ্রানী নিশ্চই আসবে। সেই লেকের বেঞ্চে শ্যামল ছাড়া আর কেউ নেই। ধুর বাল! আবার একটা বাচ্চা ছেলে বেঞ্চের পাশে ঘুরঘুর করছে। পাশের বট গাছটার চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কত বয়েস হবে? ১৫-১৬! দেখেই মহা ডেপো মনে হচ্ছে। নিজের মোবাইলের টর্চ লাইটটা জ্বালিয়ে বট গাছে কি খুঁজছে হারামজাদা। এ না গেলে তো ইন্দ্রানী আসবে না। ব্যাটার ছেলে হঠাৎ চিল্লে উঠলো “পেয়েছি পেয়েছি.. এই তো আই লাভ এস! তার মানে এই পাশের বেঞ্চটাই হবে!” শ্যামলের ইচ্ছা করছে শুয়োরের বাচ্চাটার কান মুলে পোঁদে লাথি মেরে এখান থেকে ভাগাতে। কিন্ত সেই ক্ষমতা তো আর নেই শ্যামলের। অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই শ্যামলের। উফফ, আপদটা এসে আবার বেঞ্চে বসলো। বারমুডার পকেট থেকে একটা কাগজ রেখে হঠাৎ উঠে দৌড় মারলো। আহাম্মক একটা। এখনকার বাঙালির বাচ্চারা এমনি। তোর বয়েসের থেকে ছোট টেগরা বল স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়ে ছিল রে অর্বাচীন! পাগলাচোদা যত!! এইসবই ভাবছিলো শ্যামল কিন্ত হঠাৎ খেয়াল হলো বেঞ্চ তো বটেই আশেপাশেও কেউ নেই। এবার তাহলে ইন্দ্রানী আসবে। কিন্ত অনেক অপেক্ষা করেও ইন্দ্রানী এলো না। মাঝে পুলিশের দুবার টহল দাওয়া হয়ে গেছে। উঠে যাচ্ছিলো শ্যামল হঠাৎ দমকা হাওয়া উঠলো। ঝড় আসছে। আজকাল ঝড়, বৃষ্টি, রোদ এইসব কিছুই আরো ভালো লাগে না শ্যামলের। হাওয়ায় উড়ে এসে ওই বাচ্চাটার রেখে যাওয়া কাগজটা মুখে এসে ঠোক্কর খেলো। খুব বিরক্তি তে কাগজটা খুলে দেখলো বাংলায় লেখা। কি বাজে হাতের লেখা। কিন্তু এই লেখাটা খুব চেনা। এটা ইন্দ্রানীর হাতের লেখা। পড়া শুরু করলো শ্যামল।
“ঘন্টু আমি আর বেশিদিন বেঁচে থাকবো না রে বুঝতে পারছি। তোকে ছোট থেকে যেই রাজার গল্প বলতাম মনে আছে দি গ্রীন কিং! যে এমন রাজা ছিলো যে রাজ্যে সবাইকে সমান মর্যাদা দেয়ার সংগ্রাম করতো। সে তরোয়াল ধরে ছিলো সবাইকে রাজা বানানোর জন্য! আসলে সে আমার ভালোবাসা ছিলো। শ্যামল! পারলে তার মতন হওয়ার চেষ্টা করিস সোনা নাতি আমার। তোর ঠাকুরদা বা বাবার মতন হোস না। মানুষের জন্য বাঁচিস ঘন্টু আমার। হয়তো শ্যামলই তোর ঠাকুরদা হতো কিন্তু একদিন যখন লেকের বট গাছে আমি আই লাভ এস লিখে আমাদের নিয়মিত বসার বেঞ্চে গিয়ে বসলাম, পুলিশ পিছু করে আমার সামনে আমার স্বপ্নপুরুষ কে গুলি করে টানতে টানতে লেকের জলে ভাসিয়ে দিলো। দি গ্রীন কিং শহীদ হলো আমার চোঁখের সামনে। আমাকেও পুলিশ লেক থানায় ধরে নিয়ে গেলো। আমার বাবা আমায় পরের দিনই যদিও ছাড়িয়ে নিয়ে এলেন। কিন্তু বেশ কিছু বছর পর থেকেই আমি তোর ঠাকুরদাকে নিয়ে রোজ লেকে ইভনিং ওয়াক করে সেই বেঞ্চেই বসতাম পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও। লেকের জলে দেখতে পেতাম শ্যামলের দেখানো স্বপ্নের পৃথিবী। যাই হোক বাবা এটা শুধু মাত্র ঠাকুমা আর নাতির গোপন কথা। পারলে এই যুগের দি গ্রীন কিং হয়ে দেখাস। আর আরেকটা কথা তোর ভালো নাম সবুজ কেনো আমি দিয়ে ছিলাম বুঝেই গেছিস হয়তো।
গুড বাই
ঠাম্মি ”
শ্যামল তো আর কাঁদতেও পারে না। খুব ঝড় উঠেছে আর এলো মেলো বৃষ্টি। সহ্য হচ্ছে না আর শ্যামলের। মুখের মধ্যে চিঠিটা ঢুকিয়ে আবার ঝাঁপ মেরে লেকের জলে আত্মগোপন করলো নতুন সবুজের আশায়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।