গল্পে সৌমি জানা

গরবের রঙ

“Mr. and Mrs. Mukherjee, look at this. Surjyashish is a brilliant student. Please talk to your son. He must understand we can not let this happen in our institution. We have a reputation in the society!”
নিজেদের একমাত্র সন্তান সূর্য্যাশীষ ওরফে বাবুনের হাতে লেখা একটি চিঠি সেদিন সুপূর্ণা ও স্নেহাশীষ কে দেখিয়েছিল ওর স্কুলের প্রিন্সিপাল । চিঠিটা পড়ে বুঝতে অনেকটা সময় লেগেছিলো ওদের দুজনের , চিঠির বিষয়বস্তু ভেবে প্রিন্সিপাল এর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা ঘরে বসেও দরদর করে ঘামছিল ওরা। ক্লাস টুয়েল্ভের মেধাবী ছাত্র বাবুন চিঠিটি লিখেছিলো নিজের সহপাঠী ঈশান এর উদ্দেশ্যে।
বাবুনের স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তাটা সেদিন জীবনের দীর্ঘতম দুরত্ব মনে হয়েছিল সুপূর্ণার। গাড়িতে বসে ছেলের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল ওর। মুখার্জী বাড়ির একমাত্র বংশধর বাবুন আত্মীয়স্বজনের চোখের মণি। ওকে নিয়ে অনেক আশা সকলের। সেই ছোট্ট থেকেই শহরের নামকরা ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্র বাবুন পড়াশুনা, স্পোর্টস , ডিবেট ক্লাব, গিটার , সুইমিং , ক্রিকেট সবেতেই তুখোড় । বন্ধুদের মা, বাবার অফিসের কলিগ , পাড়া প্রতিবেশী সকলের কাছেই রোলমডেল সুপূর্ণার ছেলে।
ক্লাস টেন এর বোর্ড এক্সামে ভীষণ ভালো রেজাল্ট করলো বাবুন প্রত্যাশামতো। কিন্তু ইলেভেনে ওঠার পর থেকেই একটু করে বদলাতে শুরু করলো ও। অমন চনমনে ছেলেটা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যেতে লাগল ! বাড়িতে যতক্ষণ থাকে নিজের ঘরে দরজা বাঁধা করে রাখে। কথা বলতে গেলে বিরক্ত হয়। ঘুমায় না , অনেক রাত পর্যন্ত আলো জ্বলে থাকে ওর ঘরে। কেমন যেন একটা উদ্ভ্রান্ত ভাব ওর চখেমুখে। হয়তো পড়াশুনার চাপ , ভেবেছে সুপূর্ণা। বন্ধুদের সঙ্গেও তেমন মেশেনা আর। শুধু রোহন ফোনে জানিয়েছিল ঈশান নামে একটি নতুন ছেলের সঙ্গেই আজকাল বেশি সময় কাটায় সূর্য্যাশীষ। স্নেহাশীষকে বলতে ও বলেছিল ” তোমার ছেলে প্রেমে পড়েছে। জিজ্ঞেস করে দ্যাখো। ” তাও করেছিল একদিন সুপূর্ণা। ” কি রে বাবুন, তোর কি ভালো লাগে কাউকে? ” প্রশ্নটা শুনে খাওয়া থামিয়ে কয়েক মুহূর্ত মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল বাবুন। “ভালোবাসিস কোনো মেয়েকে ?” ব্যাস , প্রচণ্ড রেগে উঠেছিল ছেলে ! “What rubbish ! এইসমস্ত ভুলভাল বকা ছাড়া তোমার কি আর কোনো কাজ নেই মা !” খাবার শেষ না করেই উঠে গেছিল বাবুন। গত বছর দেশের বাড়িতে অসুস্থ শাশুড়ি মা যখন নাতির হাত ধরে বলেছিলেন “তোমরা চিন্তা কোরোনা , নাতবৌ এর মুখ না দেখে আমি মরছি না ” তখনও ঠিক একইভাবে রেগে উঠেছিল বাবুন ! খুব অবাক হয়েছিল সুপূর্ণা।
এখন ও বুঝতে পারছে কেন সাধারণ কথায় ঐভাবে রিঅ্যাক্ট করেছিল ছেলে। কারণ অন্যের কাছে যেটা সাধারণ ওর কাছে সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জ ! উফফ , কত ঝড় সহ্য করছে নিজের মনে ছেলেটা , অথচ মাকে একবারও বলেনি। মা কি এতই অবুঝ ! চোখ ফেটে জল এলো সুপূর্ণার। বাড়ি ফিরে কান ধরে আজ জিজ্ঞেস করবে ও ছেলেকে , ছোটবেলা থেকে তোর কোন কষ্টটা মা বোঝেনি যে আজ এত বড় কথা মাকে গোপন করলি বাবুন ? কিন্তু বাড়ি ফিরে ওই প্রশ্নটা ছেলেকে করতে পারেনি সুপূর্ণা। কারণ হাতের শিরা কেটে থোকথোক রক্তের মাঝে অসহায় ভাবে সেদিন মাটিতে পড়েছিল তার বাবুন l
তাদের একমাত্র সন্তান সমকামী , চিঠি পড়ে জেনেছিল স্নেহাশীষ ও সুপূর্ণা। যেদিন থেকে নিজের এই সত্তার কথা বুঝতে শুরু করেছিল বাবুন , সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল ওর নিজের সাথে দ্বন্দ্ব। সমাজ সংস্কারের ভয়ে মা বাবাকে বলতে পারেনি নিজের অনুভূতির কথা। জীবনের এত বড় সত্য বন্ধুবান্ধব প্রিয়জন কারোর কাছে প্রকাশ করতে না পেরে গুটিয়ে নিচ্ছিলো নিজেকে। একমাত্র ঈশানকে সে পেয়েছিল সমভাবাপন্ন। দুই বন্ধু মিলে স্বপ্ন দেখেছিলো এক নতুন সমাজের যেখানে তাদের সত্ত্বাকে প্রকৃত স্বীকৃতি দেবে মানুষ। বিদ্রুপ আর বিকৃতির লক্ষ্য হবেনা তাদের অনুভূতি। চিঠিতে ঈশানকে সেকথাই জানিয়েছিল বাবুন। ঈশানের রক্ষণশীল পরিবার মেনে নিতে পারেনি এই মনোভাব। অসৎ সঙ্গে কুপথে যাচ্ছে তাদের ছেলে একথা ভেবেই প্রিন্সিপালকে চিঠিটি দিয়ে সূর্য্যাশীষের শাস্তি দাবী করেছিল তারা সেদিন স্কুল কতৃপক্ষের কাছে। এদিকে পরিবার ও সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই ভেবেই প্রচণ্ড অবসাদে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল কিশোর বাবুন।
কিন্তু তা হতে দেয়নি মুখার্জী পরিবার। প্রায় দশ বছর আগে ICU তে যখন নিথর পড়েছিল বাবুন , তখন তার বাবা মা শপথ করেছিল কিছুতেই ছেলেকে হারতে দেবে না তারা। ও তো কোনো অন্যায় করেনি , পৃথিবীতে সব মানুষের নিজের মতো বাঁচার অধিকার আছে। ওর কাছে যা স্বাভাবিক সেটা নিয়েই ও বাঁচবে। সমাজের কত গতানুগতিকতায় আমরা গা ভাসিয়ে দিই প্রতিনিয়ত , ভুলে যাই সবার উর্দ্ধে ভালোবাসা আর মানবতা ! হয়তো মা বাবার প্রত্যয়ের জোরেই সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছিল বাবুন আর জেনেছিল ওর সাথে আছে ওর পরিবার। আজ প্রাইড প্যারেড এ দেওয়া ছেলের স্পীচের ভিডিও দেখে আনন্দে চোখে জল এলো ডঃ সূর্য্যাশীষ মুখার্জীর বাবা মার , সত্যি সন্তানের জন্য বড় গর্ব তাদের। বেঁচে থাক বাবুন , আপোষ করে নয় , নিজের মতো করে মাথা তুলে l
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।