|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || T3 শারদ সংখ্যায় সুদীপ ঘোষাল

আমার প্রিয় ঋজুদা

বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রিয় লেখক বুদ্ধদেব গুহ।তাঁকে একবার দেখার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতেন তাঁর গুণগ্রাহীরা।তাঁর অভাবে এক শূণ্যআসন তৈরি হল যা অপূরণীয়।
বুদ্ধদেব গুহর ১৯৩৬ সালে কলকাতায় জন্ম হলেও তাঁর ছোটবেলা কেটেছিল বরিশাল ও রংপুরে। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সুপরিচিত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশুনা করেন।বুদ্ধদেব গুহর পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল চাটার্ড অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন একজন নামী চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। দিল্লির কেন্দ্রীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে পশ্চিমবঙ্গের আয়কর বিভাগের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত করেছিল। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের অডিশন বোর্ডের সদস্য হয়েছিলেন তিনি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সদস্য ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রভবনে পরিচালন সমিতির সদস্যও নিযুক্ত হয়েছিলেন। বুদ্ধদেব গুহ খুব সুন্দর ছবি আঁকেন। নিজের লেখা একাধিক বইয়ের প্রচ্ছদ তিনি নিজেই এঁকেছেন। গায়ক হিসেবেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন।বুদ্ধদেব গুহের প্রধান পরিচয় তিনি শিকার কাহিনি বা অরণ্যপ্রেমিক লেখক। কিন্তু অরণ্যানীর জীবন বা শিকার ছাপিয়ে তাঁর রচনা ধারণ করেছে এক প্রেমিক সত্তাকে। এই প্রেমিক সত্তা একইসঙ্গে প্রকৃতি ও নারীকে অবিচ্ছিন্নভাবে ধারণ করেছে তার গল্প ও উপন্যাসে। বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যে বুদ্ধদেব গুহের এক নিঃসঙ্গ নাম কারণ যে ধারার সাহিত্য তিনি রচনা করেছেন তা বাংলা মূলধারার পরিপ্রেক্ষিতে অভিনব। অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘‘বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবন থেকে তাঁর সাহিত্যের ভুবন খানিকটা দূরে। টাঁড়ে, বনে, অরণ্যে, বাঘের গায়ের ডোরায় সে সব কাহিনি ছায়াময়। তাঁর নায়কদের নাম ঋজুদা, রুরু, পৃথু। নায়িকাদের নাম টিটি, টুঁই, কুর্চি। তারা ছাপোষা বাঙালি জীবনের চৌহদ্দিতে নেই। কিন্তু পাড়ার লাইব্রেরি থেকে সেই বই বুকে নিয়েই বাঙালি গৃহবধূ তাঁর নিঃসঙ্গ দুপুর কাটাতেন। লুকিয়ে ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ পড়তে পড়তে বাঙালি কিশোর বুকের ভিতরে যৌবনের প্রথম আলোড়ন টের পেত। কিশোরী নিজের অজান্তেই কখন যেন যুবতী হয়ে উঠত।’জঙ্গলমহল’ তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। তারপর বহু উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি লেখক হিসেবে খুবই অল্প সময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তার বিতর্কিত উপন্যাস ‘মাধুকরী’ দীর্ঘদিন ধরে বেস্টসেলার। ছোটদের জন্য তার প্রথম বই- ‘ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে’। ঋজুদা তার সৃষ্ট একটি জনপ্রিয় অভিযাত্রিক গোয়েন্দা চরিত্র। আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৭৬ সালে। প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ঋতু গুহ তার স্ত্রী। সুকণ্ঠ বুদ্ধদেব গুহ নিজেও একদা রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। পুরাতনী টপ্পা গানে তিনি অতি পারঙ্গম। টিভি এবং চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে তার একাধিক গল্প উপন্যাস।কোজাগর আয়নার সামনে অভিল্বাহিক অববাহিকা অবরোহী অদ্ভুত লোক আলোকঝারি অনবেষ বাবল বাজে চন্দনপুরের কড়চা বাংরিপোসির দু রাত্রির বাসনাকুসুম বাতি ঘর চবুতরা চান ঘরে গান চারকন্যা চারুমতি ছৌ কুমুদিনী পাখসাট পরিযায়ী বাসানাকুসুম একটু উষ্ণতার জন্য গুঞ্জা ফুলের মাল হলুদ বসন্ত জগমগি যাওয়া-আস ঝাঁকিদর্শন পলাশতলির পড়শি জঙ্গল মহল বনোবাসার লবঙ্গীর জঙ্গলে খেলা ঘর কোয়েলের কাছে মান্ডুর রুপমতী মহরা নগ্ন নির্জন ওয়াইকিকি কাঁকড়িকিরা পামরি জলছবি পারিধি রাগমালা কুর্চিবনে গান রিয়া সুখের কাছে এক ঘরের দুই রাত।বুদ্ধদেব সর্ব সময়ের লেখক। কিন্তু লেখাই তাঁর জীবিকা নয়। কৃতী অ্যাকাউন্টেন্ট বুদ্ধদেবকে তাই প্রকাশনা সংস্থার চাহিদা মেটানোর জন্য দু’ হাতে লিখতে হয়নি। নিজস্ব রচনাশৈলীর আশ্রয়ে তিনি যে সব বহুপঠিত, বহুমুদ্রিত ও বহু আলোচিত উপন্যাস এ যাবৎ লিখেছেন, সেগুলি বাংলা সাহিত্যের ধারায় একটি স্বতন্ত্র ঘরানা ও বিশিষ্ট সংযোজন। অরণ্যপ্রেমী ও অরণ্যচারী এই স্রষ্টা আত্মপ্রকাশের লগ্ন থেকেই তাঁর জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। ‘হলুদ বসন্ত’- এর পর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি। শক্তিশালী এই লেখক নরনারীর প্রেমজীবনের অন্তরচিত্র এমন ভাবে এঁকেছেন যে, পাঠকদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলে গেছে। নিবিড় ভালবাসার সংরাগ তাঁর একাধিক প্রেমের উপন্যাসের পটভূমিতে সৃষ্টি করেছে রামধনুর বর্ণচ্ছটা।আবার শুধু এ জাতীয় উপন্যাসেই নয়, প্রতীকী উপন্যাস কিংবা গোয়েন্দা উপন্যাসেও বুদ্ধদেব সিদ্ধহস্ত।
সদাহাস্যজ্বল সুলেখকের অসামান্য কৃতিত্ব তাঁকে অমর করে রাখবে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।