সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৩৭)

সীমানা ছাড়িয়ে 

সমাজে এ রোগ ছড়িয়ে গেলে আরও অনেক লোক মরে যাবে। কিন্তু ছেলেটাতো বাবা হয় নি। ও কি করে জানবে বাবার দৃষ্টিকোণ। আমি কি ওর মায়ের অন্তর দেখতে পাচ্ছি। মেয়েদের বুক ফাটে মুখ ফোটে না। ছেলে হারাবার ভয়ে বা স্বামীকে হারাবার ভয়ে সে করোনা রোগের নাম করে না।
ওর মা বলে, বড্ড অপয়া রোগ। একজনকে গ্রাস করলে সারা বলয় গিলতে চায়।
বাবা ভাবেন, এখনও এই উন্নত যুগে মানুষ কত অসহায়। মিথ্যে ক্ষমতা আর টাকার বড়াই। কোনো কিছুই মৃত্যুকে আটকাতে পারে না।

ছেলে আইসোলেশন ক্যাম্পে চলে গেলো। করোনা পজিটিভ। চিকিৎসায় কোন ফল হলো না।

ছেলেটা চলে গেল…রমেশ আর তার বউ কেমন যেন হয়ে গেল। কারও সাথে আর কথা বলে না। তারপর পৃথিবীর সব রোগ সেরে গেল দুমাস পরে।সংসার সহজভাবে চলতে থাকল। সে ত থামতে জানে না।
আমি সুরেন্দ্রনাথ কলেজে আইন পড়তে ভরতি হলাম। বড়দা বাবার মত ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন চাকরিসূত্রেই।লিলুয়ায় বড়দার বাসায় থাকতাম। ফিরে ফিরে দেখতাম ছোটবেলার পুকুরটাকে। বন্ধুরা সব বড় হয়ে গেছে। কেউ আর পাত্তা দেয় না। সেই পাই স্যার,সৈকত,বিশ্বকর্মা পুজো আমার মনে বিষাদের বাজনা বাজায়। পরাণদার বাড়ির সামনে মিষ্টির দোকানে গেলাম। সেখানে পান্তুয়ার দোকানের বদলে মোমোর দোকান দিয়েছে পরাণদার ছেলে। পরাণদা বুড়ো হয়েছেন এখন। আমাকে দেখে বললেন, কে তুমি চিনতে পারলাম না তো। আমি পরিচয় দিলে তিনি আমাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন আমাকে, পাই স্যার নেই তো কি হয়েছে, আমি তোমাকে পান্তুয়া খাওয়াব। আমি বললাম, না তুমি এখন বুড়ো হয়েছ। আর তোমাকে কাজ করতে হবে না। পরাণদাকে প্রাণভরা ভালবাসা জানিয়ে চোখে জল নিয়ে বাইরে এলাম। এখনকার ছেলেরা কেউ আমাকে চেনে না। পরের দিন বিকেলবেলা পরাণদা তার বাড়িতে আমাকে ডাকলেন। থালায় চারটে পান্তুয়া। খেলাাম তৃপ্তি করে। শেষে তিনি কাগজের ঠোঙায় অনেকগুলো পান্তুয়া হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা তুমি বাসায় গিয়ে খেও। আমার আনন্দ হবে। ইতস্তত হয়ে আমি ঠোঙা হাতে ধরে একশ টাকার নোট বের করলাম। পরাণদা বললেন, ভালবাসায় টাকাপয়সার স্থান নেই। আমার এখন টাকার অভাব নেই। তোমাকে পান্তুয়া খাইয়ে আমি যে কতটা আনন্দ পেলাম তা আমি ছাড়া কেউ বুঝবে না। পরাণদার এই কথা শুনে আমি আর কথা বলতে পারলাম না। গলা ধরা গলায় বললাম, আসছি। এখনও পটুয়াপাড়ায় আমি সময় পেলেই চলে যাই পুকুরের পাড়ে। বসে থাকি শটিবনের ধারে। জঙ্গলের এক বুনো গন্ধে পরাণদার কথা মনে পড়ে।এই পুকুরে খেলার সঙ্গিদের মনে পড়ে। বুকটা চিন চিন করে ওঠে। মন উদাস হয়। অতিতের এই পুকুর পাড়ে আমার বয়স, আমার স্মৃতি থমকে রয়েছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চিরন্তন খেলায়। আমি পুকুড়ের পাড়ে বসে আমার ছোটবেলার খেলা খেলি আপনমনে।
ছেলের জন্য মায়ের অপেক্ষা চিরকালের প্রথা হয়ে গেছে। রাত্রিবেলা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমার তারা গুনতে ইচ্ছা হয়। যারা চার দেওয়ালে শ্বেত পাথরের আড়ালে বড় হয় তারা কি এই খোলা আকাশ আর আপন-মনে বেড়ে ওঠা প্রকৃতি বাগান দেখতে পায়। এইসব চিন্তা করতে করতে হাঁটার সময় গতি শ্লথ হয়ে যায়। আর মায়ের চিন্তা বাড়ে।
আমি জানি যত রাতই হোক মা ঠিক অপত্য স্নেহ নিয়ে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে।

আমরা চার ভাই দুই বোন। চারা গাছের মত বেড়া দিয়ে যত্ন করে মা আমাদের মানুষ করেছেন।
কোনদিন কোন অভাব তিনি বুঝতে দেননি।
বাবা চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।
সকালবেলা ব্রেকফাস্ট করে তিনি বেরিয়ে পড়তেন সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে।
আবার দুপুর সাড়ে বারোটায় খেতে আসেন।
তারপর দুপুর দুটোর সময় অফিস গিয়ে রাত্রি আটটার সময় বাড়ি ফিরতেন।
ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি প্রাণ মন সমর্পণ করে কাজ করতেন। নিজের কাজে বাবা খুব একটিভ ছিলেন।

সকালবেলা চোখ মেলেই দেখি মায়ের সুন্দর দেবী প্রতিমার মত মুখ। হাতে চা মুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি মাঝে মাঝে মাঝে মাকে একটা প্রণাম করে নিতাম। জানি সকালবেলা মায়ের মুখ দেখলে সারা দিনটা ভালো যাবে। রক্ত দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করা মা আমাদের জ্যান্ত দেবী।

এখন ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। যে যার নিজের মতো সংসার নিয়ে ব্যস্ত।
মা বৃদ্ধা হয়েছেন।
এবার মাকে তো যত্ন করে দেখাশোনা করা চিকিৎসা করানো তার খাওয়া-পরার সমস্ত ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন।

আমি আমার মায়ের নাম করে পৃথিবীর সব মায়ের 70% মা কিভাবে থাকেন তার কথা বলছি।

আর শতকরা তিরিশ ভাগ মা যেসব আছেন তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন।
তারা ভালই থাকেন আশা করি।
আমি কোনো বিতর্কে যেতে চাইছি না আমার দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটা ঘটনা বলছি।
তারা সবাইকে নিয়ে সুখে থাকে। কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে তাদের মাকে নিয়ে। ওদের আলাদা সংসারে একটি দুটি করে বাচ্চা স্বামী অফিস চলে গেলে স্ত্রীর আর কোন কাজের চাপ থাকে না। কারণ ছেলেও স্কুল চলে গেছে। নিজে বেশ পেট ভরে ভালোমন্দ খেয়ে ফাঁটিয়ে টিভির সামনে বসে অখন্ড অবকাশ কাটাচ্ছেন।

হয়তো মা বললেন, বৌমা এবার আমাকে খেতে দাও বেলা দুটো হলো, যাহোক একটু খাই।
বৌমা বললেন, যান রান্না ঘরে ঢুকে নিজে খেয়ে নিন।

ছোট ছেলের কাছে ছয় মাস। বড় ছেলের কাছে ছয়মাস মা থাকেন।
বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। এখন বিধবা মা। তিনি একাদশী করেন। তাহলে মায়ের খাবার কথা চিন্তা করা কি উচিত নয়?

কিন্তু ছেলেরা বলছে বাজে খরচ করার পয়সা নেই।

একাদশী বা উপবাসের দিন কষ্ট হয় বেশি মায়ের। ছেলেরা ওসব পাত্তা দেয় না। মেয়েরা তবু শ্বশুরবাড়ি সামলে মাকে দেখেন যতটা পারেন।

মা বিছানায় শয্যাশায়ী। পায়খানা, পেচ্ছাপ সবকিছু এখন বিছানায়। ছেলেরা যুক্তি করে মাকে হাসপাতালে ভরতি করে দিল। হাসপাতালে নাতি যায় দেখতে মাঝেমাঝে ঠাকুমাকে। নাতির অন্তর কেঁদে ওঠে। কিন্তু তার হাতে তো পয়সা নেই। ঠাকুমা হাতের সোনার বালা আর গলার চেনটা খুলে নাতির হাতে দিলেন উপহারস্বরূপ। নাতি কলেজে পড়ে। যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। সে সোনার গহনাগুলো বিক্রি করে ঠাকুমাকে দেখাশোনার জন্য আয়া রাখল। ফলমূল এনে ঠাকুমাকে
খাওয়াত। ঠাকুমা প্রাণভরে আশীর্বাদ করতেন নাতিকে। এসব কিন্তু বাড়ির লোকজন জানত না। তারা অপেক্ষায় থাকত কখন বুড়ি মরবে।

মরবে বললেই তো মরা হয় না। সময় তার বিচারক।নাতি বলল,ঠাকুমা এবার আমি তোমাকে ঘরভাড়া করে আলাদা জায়গায় রাখব। তোমার যত্ন করব। সেই রাতেই ঠাকুমা নাতিকে ছেড়ে চলে গেলেন।

ছেলেমেয়েরা এল। দাহকাজ সমাপ্ত হল। নাতি বলে উঠল আবেগ ভরা কন্ঠে, মা এবার তো ঠাকুমা নেই।এবার তোমার পালা শুরু হল। কি হবে গো, ঠাকুমার চোখের জলের অভিশাপ তোমাদের দগ্ধ করবে না তো…
নয় ছেলে আর পাঁচ মেয়েকে নিয়ে মিতা ও তার বর পাঁচবিঘে জমির আমবাগানে বেশ সুখেই ছিল। মিতার বর মিলিটারি বিভাগে কাজ করার সময় এক অত্যাচারী লম্পটকে মেরে জঙ্গলে পুঁতে ফেলেছিল। কেউ জানতে পারে নি। তারপর কয়েক বছর পরে চাকরি ছেড়ে তার শখের আমবাগানে চলে এল। একরাশ বৃষ্টিফোঁটার ঝাপটা লাগা সুখে সে মিতার সংসারে মেতে গেল। ছেলেরা ধীরে ধীরে বড় হল। একে একে তাদের বিয়ে হল। চাকরির সন্ধানে তারা চলে গেল বাড়ি ছেড়ে। মিতার বয়স হল। তার বর চলে গেল পরপারের ডাকে।

আমবাগানে মেজ ছেলে, ছোট ছেলে কে নিয়ে মিতা শেষ বয়সে আনন্দে ছিল। বয়স পঁচাশির কোঠায় হল মিতার। তবু সে মুড়ি ভাজে, বাগান পরিষ্কার রাখে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।