সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৩)

অজয়পাড়ের উপকথা, উপন্যাসের পরের কাহিনী
সীমানা ছাড়িয়ে
পৃথিবী একটা ছোট গ্রহ। তার সব খবর জানা কঠিন। আর মহাকাশ বা ব্রম্ভান্ডের কথা বাদই দিলাম। অসীম এই মহাকাশ। কত বিচিত্র। তার কিছুই কি আমরা জানি? নিজেকে খুব বোকা লাগে যখন জ্ঞানের অহংকারে মত্ত হয়ে আস্ফালন করি ডাঁহা আহাম্মকের।
আমদের গ্রামের গর্ব মাধব।সে সকালে উঠেই পুরােনাে দিনের কথা ভাবতে ভাবতে দোকানের পাশের ছেলেটাকে বলছে, পোষোলা করতাম পৌষ মাসে। অজয় নদী যেখানে ‘এস’ এর বাঁক নিয়েছে ইংরেজি অক্ষরের মতো। সেখানে বন্ধু, বান্ধবী একসাথে পােষল্যা করতে যেতাম শীতকালে পৌষ মাসে। নদীতে চান করতাম। বাড়িতে নিষেধের বেড়া। বাঁধা গরু ছাড়া পেলে যখন পাগলের মতাে ছুটে ছুটে বেড়ায় স্বাধীনতার আনন্দে, ঠিক তেমনই আমরাও কী করবাে ভেবে পেতাম না। শুধু খেলা, ছােটা আর উল্টোপাল্টা চিৎকার চেঁচামেচিতে নদী উচ্ছল হতাে। প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসে বারে বারে। এত খােলা জায়গা, এত আকাশ, নদী, জল আমরা সহজে তাে পাই না। তাই মুহর্তের আনন্দ আজও হৃদয়ে রং ধরায়, চোখ ভেজায় নব আনন্দে। স্মৃতি রােমন্থনেও অনেক সুখ। ছেলেটি বলল, ঠিক বলেছাে মাধবদা। বলেই পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মাধব দেখে দোকানের সামনে একগাদা ও। গতকাল চায়ের দোকান বন্ধ করে রাতে বাড়ি ফেরার সময় বুড়িদির পাঁদাড়ে একটা ছেলেকে মলত্যাগ করতে দেখে মাধব প্রতিবাদ করেছিল। হয়ত তারই কাজ এটা। না হতেও পারে। সে ভাবে। নির্মল ভারত অভিযানের একটা মিছিল আসছিলাে। সমবেত স্বরে সবাই বলছে, “মাঠে ঘাটে পায়খানা, মৃত্যুর পরােয়ানা”। কে শােনে এসব কথা। কিছু ছাই এনে গু ঢাকা দিয়ে সে কোদালের সাহায্যে দোকানের সামনেটা পরিষ্কার করল। তারপর ঝাপ খুলে জল এনে আঁচ ধরিয়ে দিল। মিছিলটা চলে গেল। উনুনে তেল ফুটছে। এবার তৈরি গােলা বেসনে মাখিয়ে ছাড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোকানে ভিড় হয়ে গেল। মাধবের চপ একবার যে খাবে তাকে আবার আসতে হবে। তারপর দোকানে পেয়ে যায় জনপ্রিয় পত্রিকা। তাছাড়া বিভিন্ন লেখকের লেখা নতুন নতুন বই রেখে দেয় চায়ের দোকানে। লােকে চা খায় আর তারিয়ে তারিয়ে উপভােগ করে কুমারবাবুর গল্প। সব ধরণের বই মাধব দোকানে রাখে সবার পড়ার জন্য। আশা তার লেখা কাব্যগ্রন্থ তুমি মানুষ হলে, মাধব বার বার পড়ে। অন্য লােকেও পড়ে। এই ব্যবসার কায়দা। খদ্দের টানার ট্যাকটিক্স। আর তার ব্যবহার মানুষের একঞ্জা প দেখলাে গতকাল যে ছেলেটার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে সেও এসেছে। বসে কাম পড়ছে। গল্পের বইটার দিকে লােভী চোখে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি বলল, একটা কথা বলব। বল বল, তাড়াতাড়ি বল। দেখাে আমাদের তাে বাড়িতে পায়খানা নাই, তাই কাল… সকলে চলে যাওয়ার পর আমি বুড়িদির পাঁদারে মলত্যাগ করেছি বাধ্য হয়ে।
আমার দোকানের সামনে অপকর্ম কে করল বল তাে?
-বলতে পারব না। আমি নই। তুমি কত ভালাে লোক। তােমাকে আমার খুব ভালাে লাগে।
-বেশ, পুরবােধিবাবুর সংগঠন সকলের উপকার করে থাকেন। তােরাও আবেদন কর। সমাজসেবি , পুরােবােধি বাবু, অসীম ডাক্তার, অজয় আচার্য,অলোক দত্ত মহাশয়রা আছেন। ঠিক পেয়ে যাবি। কােন অসুবিধার কথা অনিলদা, , অশােকাকে বলবি। ওরা সকলের উপকার করেন। সমাজসেবী মানুষকে জানাতে পারেন। তাদের মিলিত সংগঠন সমাজে অনেক ভালো। কাজ করে থাকেন।ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে চলে যাবার আগে বলল, একবার বইটা পড়ব। মাধব বলল, পড়তে হবে কিন্তু। জানিস তো ভাই, বউ আর বই বাইরে গেলে আর ফেরে এখানে বসে পড়তে হবে কিনা। ন। আমার দাদু বলতেন আমাদের। পুরােনাে প্রবাদ আর কি।। ঠিক আছে, আমি বসেই পড়ব। নিয়ে যাবাে না। ছেলেটি বসে বই পড়তে শুরু করল। একজন বলল, বই পড়াে ভালাে ভালাে। আর এখানে, সেখানে মলত্যাগ করাে কেন। ছেলেটি চুপ করে থাকলাে।। মাধব বলল, শুধু একা ওর দোষ নয়। একা কেউ সমস্যার সমাধান করতে পারে না। শুধ ও নয় সমস্ত জনগণকে সচেতন হতে হবে। সামান্য চপের দোকানের মালিক হয়ে সে স্বপ্ন দেখে, ছেলেদের জন্য সে স্কুল করেছে। কত ছেলে মেয়ে লেখাপড়া শিখছে। আর তার চোখের সামনে ভারতের সমস্ত ছেলেমেয়ে স্কুলের পথে পা বাড়িয়েছে। আর্থিক সঙ্কট চলছে। ঠিক একদিন আলাের পরশ পাবােই। এইসব ভাবতে ভাবতে মাধব ভাবুক হয়েও মাধবদা তােমার চপ ছাড়াে। পােড়া গন্ধে আর ছেলেটার চিৎকারে গােবিন্দ সম্বিতফিরে পেল। দেখেছিস একটু অন্যমনস্ক হয়েছি আর ..
-দাও আমাদের চপ, মুড়ি দাও। আচ্ছা দাদা, তুমি কী এত চিন্তা করাে। মাঝে মাঝেই
-তুমি কেমন যেন হয়ে যাও। জানি না রে। কেন যে মনটা উড়ু উড়ু করে। কে জানে না ও কেন ওইরকম হয়ে যায়। সে বলে, কত অভুক্তজন একমুঠো ভাতের জন্য কাদে। তাদের কান্না আমার অন্তরে দুঃখের ঝড় তােলে।সে কেঁদে ফেলে। মাধবদা, তােমার চোখে জল কেন?
ও কিছু না, এই উনুনের ধোঁয়ায় এই রকম হয়েছে। খরিদ্দার সবাই চলে গেলে, ঠিক দুপুর একটার সময় চারজন ভিক্ষুক আসে। তাদের খাবারের জন্য টাকা পয়সা দিয়ে সে গান করতে করতে নিজের বাড়ি যায়। অনেকে তার নয়ায় খেয়ে, পরে বেঁচে আছে। কিন্ত মাধব খুশি নয়। আরও অনেক মানুষের সেবা করতে চায় সে।
তারপর বাড়ি গিয়ে দুপুরে স্নান, খাওয়া সারা হলে বিশ্রাম নিয়ে বিকেল চারটের সময়। আবার দোকান খােলে। এইভাবে বেশ চলে যায় দিনগুলাে। মাধবের বয়স বেড়ে যাটের দরজায় কড়া নাড়ে।মাধব গান জানে। তাই মন খারাপ হলেই সে গান করে। খরিদ্দারও আনন্দ পায়। সকলেই তাকে ভালােবাসে।
নবগ্রাম গ্রামের আর সেনপাড়া গ্রামের অনেক গরীব মানুষ দুপুরে খেতে যায়। কোনো পয়সা লাগে না। ওখানে বাবু, ভবরঞ্জন মাস্টারমশাই, আদিত্য কবিয়াল, সহ বিবেকানন্দ ডাক্তারবাবু, তাপসদা, জয়দেবদা, ভবদা, বিকাশদা, পল্লবদা, অনিলদা, প্রবীন আলােকদা, প্রলয়, দিলীপ দা ও আরও অনেকে ভবা পাগলার ভক্তরা ভবা পাগলা সেবা দেখাশােনা করেন। প্রত্যেক দিন প্রায় পাঁচশাে অভুক্ত লােক ওখানে খাওয়া দাওয়া করেন। সবাই খায় কিন্তু কার টাকায় এই ব্যবস্থা কেউ জানে না। জানে শুধুমাত্র কমিটির লােকজন। আজ রিপাের্টার এসেছেন। কমিটির লােকের কাছে জানতে চাইছেন, কার টাকায় এই সেবাশ্রম চলে বলুন তাে?সেক্রেটারি প্রবীরদা বললেন, মাধবদার টাকায় এই সেবাশ্রম চলে। তিনি চপ ও মুড়ি বিক্রি করেন। | রিপাের্টার যখন মাধবের চপের দোকানে গেলেন সে তখন চা দিতে দিতে গান ধরেছে, ও মন সওদাগর বিদেশে বাণিজ্যে এসে কেন বাধিস বসতঘর, দেশের মানুষ দেশে ফিরে চল | রিপাের্টার প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলেন, কবি অসীম সরকারের গান। খুব ভালাে করেন তাে আপনি। আপনি এতবড় সমাজ সেবক। সামান্য চপের দোকান থেকে আয় করে আপনি এই অসম্ভব কাজ কী করে করলেন। মাধব বলল, কোনাে কাজই, ইচ্ছা থাকলে, অসম্ভব নয়। শুধু প্রয়ােজন অদম্য ইচ্ছা শক্তি। আমি তিল তিল সঞ্চয়ে তাল করেছি। নিজের খরচ কম করে অর্থ বাঁচিয়েছি তিরিশ বছর। আমি যা সঞ্চয় করেছি আর লােকের কাছে পাওয়া অর্থ একত্র করে, আমি এই আশ্রম গড়ে তুলেছি। আমার জীবনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। আমি আজ খুব খুশি। কত মানুষ আমাকে এই কাজে সাহায্য করেন তার ইয়ত্তা নেই। রােজ আমার কাছে অনেক অনেক টাকা আসে সাহায্যবাবদ। সব টাকা ওই আশ্রমের নামেই সঞ্চিত হয়। আমার কিছুই নয়। সব মানুষের। ভববাবু, কুমারবাবুর মতাে কত লােক যে টাকা পয়সা দান করেন তার ইয়ত্তা নেই।এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে বলতে তার চোখে অশ্রুধারা। আনন্দের অশ্রু। জীবনের সবকিছু সকলের জন্য উজাড় করে নিঃস্ব হওয়ার আনন্দ একমাত্র দাতারাহ অন্তরে অনুভব করেন, সাংবাদিক গম্ভীর হয়ে বললেন। এতকিছু করেও মাধব কিন্তু নির্বিকার। এই সেবাশ্রমের কাজ সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ুক। আর স্বপ্ন দেখে ভারতমাতার সমস্ত সম্তান গরম ভাত খাচ্ছে পেট ভরে। শত শত সমাজ কর্মী এগিয়ে।সবুুজ ধানক্ষেতের ঢেউয়ে ফুটে উঠেছে ভারতের মানচিত্র। মাধব লাবাসে। সে দেখতে পায়, তরুণদের হাতে লাঙলের বোঁটা। তারা চাষআসছে দৃপ্ত পদক্ষেপে। সব স্বপ্ন দেখতে ভালােবাসে। সে একদিন এসে বলল, মাধবদা তােমাকে নিউ আপনজন ক্লাব’ পুরস্কৃত করবে। রঞ্জন একদিন এসে বল সয়ে বলল, কেন রে, কী করেছি আমি। আমি এখনও কিছু করিনি। তবে, সে গম্ভীর হয়ে বলল, কেন কিসের জন্য? সে বলে, এ কথার কোনাে উত্তর হয় না, দাদা। কারণ সবাই জানে তুমি কী করেছে। ক্লাবের ছেলেরা এলে মাধব তাদের বলল, তােরা আমার সঙ্গে থাকিস তা হলেই হবে। মানুষের ভালাে করাই হােক আমাদের জীবনের ব্রত। সকলকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের সাহায্য নিয়ে গােবিন্দ পাশের গ্রামে গড়ে তুলল আর একটি সেবাশ্রম। তার নামও দিল ভবা পাগলা সেবাশ্রম। এমনি করে সদিচ্ছার জোরে দশটি আশ্রম আজ চলছে মাধবের দয়ায়। মানুষ আজ জাতিবিদ্বেষ ভুলে গিয়ে মানুষের সেবায় নিয়ােজিত। পরশ পাথরের পরশে আজ অনেক তরুণ দীক্ষা নিয়েছে মানব সেবার ব্রতে।। বাংলার সরকার সেবা মনােভাবের স্বীকৃতি স্বরূপ মাধবকে সম্মানিত করতে চায়। আনন্দ সংবাদটা সবাই মাধবকে জানাতে গিয়ে জানতে পারল, সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে রাস্তায়। অসংখ্য, আরও অনেক অভাবী মানুষের পাশে তার হৃদয় কুসুম ফোটানাের আশায়।
কেতুগ্রামের এদিকে অজয় তীরে নেমে এলো সন্ধ্যা চারিদিকে সন্ধ্যার অন্ধকারে প্রকৃতি ছিল ঢাকা। কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখা যায় আকাশের তারা, অগুন্তি তারা। তবু তার মধ্যেই চলে সময় প্রবাহ। আবার সকাল হয়। কলরবে মেতে যায়,গ্রাম। আর পাশের এলাকার গুমটিতে পুরুলিয়া মুসলমানের বসতি কম। তবু কেতুগ্রাম রাউন্দী এলাকায় মুসলমান বসতি আছে। বিভিন্ন গ্রামের মুসলমান পাইকার আসে। তারা ভুলকুড়ি, দক্ষিণ দিকে কোপা, কোমডাঙ্গা গ্রাম থেকে গরু ছাগল নিয়ে কেনাবেচা করে। এদিকে প্রবাহিত হয় অজয় নদ সময়ের তালে তালে। ফলে হিন্দু মুসলমান আত্মীয়-স্বজন এখানে। মুসলিম পাড়ার নদের জল মিলিত হয় হিন্দু পাড়ার নদের জলে। তারা একে অপরের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার সম্পর্কে।