পিসেমশাই তন্ত্র সম্পর্কে প্রায় সমগ্র জ্ঞান আপনার আছে, আমরা জানি। যদি এই সমুদ্রজলের একচামচ জলের ধারণা করতে পারি তো ভালো লাগবে। আর আমাদের প্রয়োজনেও লাগতে পারে। পিসেমশাই কম্বলের আসনে বসে আমাদের চারদিকে গঙ্গার জল ও মন্ত্র পড়ে গন্ডি কেটে নিয়ে বললেন, যেখানে সেখানে এইসব মন্ত্র পড়তে নেই। তাই স্থানশুদ্ধি করে নিলাম। তারপর তিনি শুরু করলেন তার কাহিনী। তন্ত্র- ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু গভীর তার অন্তর্নিহিত অর্থ। তন্ত্র হল এক বৃহৎ ও অতিপ্রাচীন গুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় বিষয়। মুক্ত বিশ্বকোষে বলা আছে, তন্ত্র হিন্দুসমাজে প্রচলিত ঈশ্বর উপাসনার একটি পথবিশেষ। শিব ও মহাশক্তির উপাসনা সংক্রান্ত শাস্ত্রগুলিকেও তন্ত্র সাধনা নামে অভিহিত করা হয়। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, এই মহাবিশ্ব হল শিব ও মহাশক্তির দিব্যলীলা। তন্ত্রে যেসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রীতি-নীতির বর্ণনা রয়েছে তার উদ্দেশ্যই হল মানুষকে অজ্ঞানতা ও পুনর্জন্মের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া।খ্রিস্ট্রীয় প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম দিকে তন্ত্র সাধনার বিকাশ লাভ করে। গুপ্তযুগের শেষভাগে এই প্রথার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। মূলত বৌদ্ধধর্মের হাত ধরেই পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে এই তন্ত্রশাস্ত্রটি। তন্ত্র ভারতের অতিপ্রাচীন এবং গুরু পরম্পরার একটি গুপ্ত বিদ্যা। প্রাচীন ভারত থেকে বহু মূল্যবান পুঁথি চীনা পরিব্রাজকরা তাঁদের দেশে নিয়ে চলে গেছেন।
রতন বললো, এটি গুরু পরম্পরা বিদ্যা বলে প্রকৃত গুরুর খোঁজ করতে হয়। দীক্ষা ছাড়া এ শাস্ত্র সম্পর্কে সহজে কেউ কাউকে কিছু বলে না। তাই নয় পিসেমশাই?
পিসেমশাই বললেন, ভারতের আদি ও অকৃত্রিম তন্ত্র সাধনার জায়গা হল নীলাচল পর্বত। যা ‘কামাখ্যাধাম’ নামে পরিচিত। তন্ত্র এমনই একটি শাস্ত্র যার মাধ্যমে নিজেকে অনুসন্ধান করা যায়। নিজের অন্তরের ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায়।তন্ত্র শব্দটির অর্থ ব্যাপক, সৃষ্টির পরিচালনার নিয়ম । আমি বললাম, বাবা বলেন মহাদেবের ডমরু থেকে তন্ত্রের উৎপত্তি । সতী বা দেবি দূর্গার দশ হাতে আছেন দশ মহাবিদ্যা । এই দশমহাবিদ্যার উপর ভিত্তি করেই অনেকটা গড়ে উঠেছে । তন্ত্রের বিষয়টা অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত ।
পিসেমশাই বললেন ঠিক তাই। সাধারনভাবে, তন্ত্র অসীম জ্ঞানের আধার । সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের তন্ত্রসাধনায় দেখা যায়, যা অবিদ্যাকে গ্রাস করে তাই জ্ঞান । সঠিক দিশা উম্মোচন করে, সৃষ্টির কারন বুঝতে সাহায্য করে তন্ত্র । তন্ত্র সৃষ্টি , স্থিতি বিনাশাং শক্তিভূতে সনাতনী। ধর্ম দেয়,জীবন পরিচালনা শক্তি । ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর এই তিন শক্তির পরিচালনা নিয়মিত করে তন্ত্র ।তন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত আছে মন্ত্র ,যন্ত্র । তন্ত্র সাধনায় সাধক সৃষ্টির রহস্য জেনে পরমানন্দ অনুভব করে ।
আমি বললাম, একটু বিশদে বলুন। তিনি বললেন, হ্যাঁ তোমরা এখন সাবালক। সব বলা যাবে আশা করি। তন্ত্রমতে মদ, মোহ, মাৎসর্য এই নিয়ে সংসার। নারীর ভূমিকা তন্ত্র সাধনায় অপরিসীম।বায়ুরুপ লিঙ্গকে শূণ্যরুপ যোনীতে প্রবেশ করিয়ে কুম্ভক আসনে সাধনা করতে হয় সাধককে। খুব কঠিন সাধনা। চৈতন্যময়ী প্রকৃতিকে তুষ্ঠ করতেই পূজা করা হয়; যাতে পূজারী, ভক্তের জীবন আনন্দময়, কল্যাণময় হয়ে ওঠে। তন্ত্র হচ্ছে দর্শন বা তত্ত্ব। আর পূজা হচ্ছে পদ্ধতি। পূজার উপচার বা উপকরণ নিষাদরা তাদের নিজস্ব পরিবেশ থেকেই সংগ্রহ করেছিল। পরবর্তীকালে বাংলায় তাদের এই ধারণার দৃঢ় হয়েছিল। এই নারীকেন্দ্রিক তান্ত্রিক ধারণাটি পল্লবিত হয়েছিল। কারণ, তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী জেনেছে, মা বলে জেনেছে, মায়ের দেবীপ্রতিমা কল্পনা করেছে। দেবী মা’কে একজন তান্ত্রিক নিষ্ঠাভরে ভজনা করতে চায়, আরাধনা করতে চায়, পূজা করতে চায়। পাশাপাশি একজন তান্ত্রিক মনে করেন, একজন ভক্ত চৈতন্যময়ী শক্তির অনুগত থাকলে চৈতন্যময়ী শক্তির কৃপায় তার অশেষ কল্যাণ সাধিত হতে পারে।রতন বললো, এই হল বিজ্ঞান এবং তন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য।পিসেমশায় বললেন, চৈতন্যময়ী প্রকৃতিরূপী নারীবাদী তন্ত্রের দেবী দূর্গা- কালী- বাসুলী – তারা- শিবানী। কিন্তু তন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন শ্রেষ্ঠ দেবতা শিব। তন্ত্রমতে শিব তাঁর শক্তি পেয়েছে কালীর কাছ থেকে। আবার শিব- এর রয়েছে পৃথক নিজস্ব শক্তি। তন্ত্রমতে পুরুষ শক্তিলাভ করে নারীশক্তি থেকে। শিব শক্তি লাভ করেছেন তাঁর নারীশক্তির শক্তি থেকে। তবে শিবের নিজস্ব শক্তিও স্বীকৃত। তন্ত্রসাধনার মূল উদ্দেশ্যই হল, দেবীর সাধনা করে দেবত্ব লাভ তথা শক্তিমান হওয়া।এখানেই বলে রাখি যে- প্রাচীন ও মধ্যযুগের বঙ্গবাসী পরবর্তীকালে নগর গড়ে তুললেও সে তার অরণ্যজীবন কখনও পরিত্যাগ করেনি কিংবা বিস্মৃত হয়নি। বাঙালি মননের অন্যতম বৈশিষ্ট্য,গ্রামে নগরেও পূজা হয়েছে। উপচার হল পূজার উপকরণ।
রতন বললো, উপচারেও দেখা যায় নিষাদ উপকরণ। এই উপকরণগুলি কি কি?
আমি বললাম, এ সবই প্রাচীন বাংলার লোকজসমাজের কৃষিপণ্য। প্রাচীন বাংলার নিষাদসমাজের তান্ত্রিক বিশ্বাস ও বাহিরাগত মতের কিছু পার্থক্যও আছে বলুন পিসেমশাই।
পিসেমশাই বললেন, একদিনে সব জানা যায় না। ধীরে ধীরে আত্মসংশোধনের মাধ্যমে এগোতে হয় তন্ত্রপথে। এই পথেই জীবন আর মরণের সীমারেখা পার হয়ে অসীমে মেশা সহজ হয়ে যায়।