সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ১৭)

সীমানা ছাড়িয়ে
অনিমেষবাবু বি ডি ও অফিসে কাজ করতেন।কাজের সূত্রে তাকে ঘুরে বেড়াতে হতো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।সন্তু ঝিনুক ঘাটা স্টেশনে ট্রেন ধরত।কোনো কোনোদিন রাত হয়ে যেত।একদিন রাতে স্টেশনে বসে আছে। সামনেই একটা ঠান্ডা সরবতের স্টল। খুব গরম পড়েছে।সন্তু একটা স্প্রাইট কিনে পান করলো। ঠান্ডা সরবত খেয়ে শরীরটা বেশ শীতল হলো। ট্রেনটা লেট করছে।গ্রামে গ্রামে ঘোরার ফলে পরিচিতি একটু বেড়েছে।অনেকে কথাও বলছে। একজন বললো,কি ক্যাশিয়ার বাবু আজ রাত হলো কেন?
—-আর বলবেন না। কাজ সারতে দেরী হয়ে গেলো।
—-বেশি রাত করবেন না। আপনার কাছে তো টাকা পয়সা থাকে। এই জায়গাটা হলো ডাকাতের জায়গা। জামাই মারি আর ঝিনুকঘাটা এই দুটো গ্রামের নাম মনে রাখবেন। বেশ চলি।
অনিমেষ ভাবছে লোকটা জানে তার কাছে টাকা থাকে অফিসের। অনেক টাকা। ব্যাগটা চেপে ধরলো।তারপর স্টলের দোকানদারের সঙ্গে গল্প করতে লাগলো।
অনিমেষ বললো, ভাই কখন তুমি বাড়ি যাও?
—-এই ট্রেনটা চলে গেলেই যাব। আপনাকে একা ফেলে যাব না।
হঠাৎ একটা লম্বা ষন্ডা গোছের লোক ছুটে এসে ঠান্ডা সরবতের স্টলে বরফের ভেতর কি একটা ঢুকিয়ে রাখলো।তারপর অনিমেষের দিকে তাকিয়ে বললো,কে আপনি? অন্ধকারে বসে কেন?
দোকানদার বললো ও আমাদের ক্যাশিয়ার বাবু গো। তুমি তো চেন?
—–ও আপনি। তা এত রাত কেন??
—-ট্রেনটা লেট করছে তাই?
—– বসুন। আমি জলে হাত ধুয়ে আসি। আমি না আসা অবধি নড়বেন না।
অনিমেষ লোকটার মুখে মদের গন্ধ পেলো। নেশা করেছে বোঝা গেলো। সন্তু ভয় পেলো।
অনিমেষ বললো ভাই দোকানদার তোমার দোকানে বরফের ভেতর কি রাখলো?
দোকানদার বললো,যতটুকু দেখলাম তাতে মনে হলো কোনো মেয়েছেলের সোনার গহনা ভরতি কাটা হাত। বরফের ভেতরে রাখলো।কাল কোনো সময়ে এসে নিয়ে যাবে।
অনিমেষের হার্টফেল হওয়ার মত অবস্থা হলো। স্টলের লোকটা বললো,আপনাকে চেনে তো। আপনার ভয় নেই।
অনিমেষ ভাবলো অনেক টাকা সঙ্গে আছে। কি জানি কপালে কি আছে?
ট্রেনটা আসছে না। জানতে পারলো অনিমেষ, আজ ট্রেন তিন ঘন্টা লেটে আসছে।
স্টলের লোকটা বললো,আপনার তো পরের স্টেশনেই নেমে বাড়ি। আপনি মাঠে মাঠে হেঁটে চলে যান।ছয় কিলোমিটার রাস্তা। মাঠে মাঠে গেলে চার কিলোমিটার হবে।
অনিমেষ বললো,ঠিক বলেছো ভাই। আমি তবে যাই।
লোকটা বললো,খবরদার, ফন্টেকে বলে যাবেন। তা না হলে সব কেড়ে নেবে।
হন হন করে হেঁটে ফন্টে এলো। বললো,বাঃ,আপনি তো খুব ভালো লোক। এখনও বসে আছেন?
অনিমেষ বললো,আপনার সঙ্গে দেখা করে যাবো বলে বসে আছি। ট্রেন অনেক লেটে আসছে।মাঠে মাঠে যাবো।যদি আপনি অভয় দেন।
—-হুঁ, সঙ্গে ব্যাগ আছে। টর্চ আছে দেখছি। আমার তিন ব্যাটারির টর্চটা নিন। আর আপনারটা আমাকে দিন। আমার টর্চে নিল ফোকাস আছে। সবাই চেনে এই আলো। কেউ আটকালে শুধু টর্চ জ্বালবেন। কথা বলবেন না। যান কোনো ভয় নাই আপনার। আমি এই দোকানে দুদিন পরে টর্চ নিয়ে নেব।আপনি আমার টর্চ এই দোকানেই রাখবেন।
অনিমেষ বললো,আপনাকে নমস্কার জানাই।আমার অনেক উপকার করলেন।তা না হলে আজ বাড়ি যেতে পারতাম না।
কোনোরকমে কথা বলে, অনিমেষ টর্চ নিয়ে হন হন করে হেঁটে চলে এলো মাঠ পেরিয়ে পুকুর পাড়ে।এবার নির্ভয়ে সে একটু বিশ্রাম নিতে বসেছে এমন সময় হেঁড়ে গলায় একটা লোক বললো, কে রে। ব্যাগ রেখে এখানে বসে পড়লি।
অনিমেষের মনে আছে। কথাবলা যাবে না। উত্তরে টর্চ জ্বাললো।টর্চের আলো দেখে ওরা ভয়ে পালালো।বললো,পালা পালা। এত ফাটা ফন্টের লোক।
অনিমেষের মনে পড়ে, জল পান করে বীরবিক্রমে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। একটা টর্চের কি মাহাত্ম্য।সেটর্চটা জ্বেলে হাঁটতে হাঁটতে আনন্দে গান করতে শুরু করলো।
বিজয় লেখক।চাকরী করে একটা প্রাইভেট ফার্মে। যখনই তার লেখা কোনো ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় সে রেলওয়ে স্টেশনের স্টলে গিয়ে ম্যাগাজিনটি কিনে বাড়ি ফেরে।কিন্তু রেলওয়ে স্টেশনে ঢুৃকতে গেলে প্ল্যাটফরম টিকিট কেটে ঢুকতে হয়।এখন দশ টাকা লাগে একটা প্ল্যাটফরম টিকিটে।খুব গায়ে লাগে বিজয়ের।কিন্তু কিছু করার নেই। টিকিট না থাকলে আবার টিকিট চেকার ফাইন করতে পারেন। অতএব টিকিট নিয়ে স্টেশনে ঢোকাই উচিত বলে মনে করলো বিজয়।
আজ থার্ড আই পত্রিকায় বিজয়ের একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
খুব আনন্দিত হয়ে সে তার বন্ধু সুমনকে বললো,তুই একটু দাঁড়া, আমি প্ল্যাটফরম টিকিট কেটে বইটা নিয়ে আসি।
শুনে সুমন বললো,আরে প্ল্যাটফরম টিকিটের দাম দশটাকা। তুই দাঁইহাটের টিকিট নিলে পাঁচ টাকায় পাবি। একটা টিকিট থাকলেই হলো।
বিজয় বললো,এটা তো জানা ছিলো না। তাহলে এত দিন ধরে আমার অনেক টাকা সেভ হতো।