গল্পেরা জোনাকি তে শম্পা গুপ্ত – ২

রূপলাগি
আজ তিনদিন তুলিকা সৌরিশের কোনো এস এম এস এর উত্তর দেয়নি। সৌরিশও কথা বাড়ায় নি। হঠাৎই একদিন তুলিকা ফোন করে সৌরিশ কে।
“হ্যাঁ বলুন”,সৌরিশ বেশ গম্ভীর।
“আমি দেখা করবো”,তুলিকা বলে।
ওপাশ থেকে কোনও সাড়া নেই।
“হ্যালো হ্যালো সৌরিশ কী হলো?”তুলিকা একটু উদ্বিগ্ন।
“আমি আজ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি।আর থাকতে পারলাম না। ওদের কোনো অসুবিধা হবে না। সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি।” সৌরিশের গলা শান্ত।
“মানে ,চলে যাচ্ছেন?কোথায় ?এসবের মানে কী।মাথা খারাপ নাকি?” তুলিকা চিৎকার ক’রে ওঠে।
“গত দু’বছর ধ’রে আমার সংসারে ফাটল।সবরকম চেষ্টা করেছি। হলো না শেষ পর্যন্ত। জানেন কোনো ঘাটতি নেই। শুধু মানসিক মিল ঘটল না কোনোদিন।”সৌরিশের গলা কাঁপে।
“না না কী বলছেন! এ ভাবে চলে যাওয়া যায় না। কোনো দায়বদ্ধতা নেই আপনার! ছেলে বউ ফেলে যাবেন মানে? এ হঠকারিতার কোনো মানে হয় না। আমি আসছি দেখা করবো।”,তুলিকা এক নিঃশ্বাসে বলে যায়।
“এখন রাখছি”,সৌরিশ ফোনটা কেটে দেয়।
সারাটাদিন ওরা হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলল।সৌরিশ ঢাকুরিয়ায় একটা পিজিতে থাকার ব্যবস্থা করে নিয়েছে। তুলিকাকে ঘরের সমস্ত ছবি পাঠাল । ওর খুব পছন্দ ।
“আপনি ফিরে যান। আমি এরকম ভাবতেই পারিনা।সংসার ফেলে এভাবে যাওয়া যায়। আপনাকে ওদের প্রয়োজন। আপনারও।” তুলিকা বার বার সৌরিশ কে বোঝাতে থাকে।
“আমি আর এ নিয়ে কোনও কথা বলতে চাই না। আমরা যেমন কথা বলতাম চলবে।কিন্তু এ বিষয়ে আর আলোচনা নয়।” সৌরিশ বিরক্ত হয়।
রাতে তুলিকার ঘুম নেই।সৌরিশের কথা ভাবতে থাকে। একটা মানুষ চব্বিশ বছরের সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে? কারণ কী?
এ’কদিনে তুলিকা আর সৌরিশের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব হয়েছে। মজা করতে করতে সেটা হৃদয়ের হয়ে গেছে।সৌরিশ একদিন একটু ড্রিঙ্ক ক’রে তুলিকাকে বলে, “আমার সাথে প্রেম করতে হবে, হবেই”।
তুলিকার সোজা উত্তর সেটা পারবে না।
“আপনি বাড়ি ফিরে যান। এটাই শেষ কথা। আর তারপর আমি আর
যোগাযোগ রাখবো না।আপনি একটা স্বার্থপর মানুষ।”
তবু তুলিকা একদিন দেখা করতে বেড়িয়ে পড়ে। কলেজ স্কোয়ারের বেঞ্চে এসে বসে। এতদিনে ওরা তুমি বলা শুরু করেছে। দূর থেকে সৌরিশকে দেখে তুলিকা। অসম্ভব হ্যান্ডস্যাম একজন মানুষ। তুলিকার চোখ জ্বালা করে। তবু সে সপ্রতিভ।
“এসো।” তুলিকা সরে বসে।
সৌরিশ কেমন অবাক চোখে দেখে তুলিকাকে। তারপর বলে ,”একটু দেরি হয়ে গেল।তোমায় অনেকক্ষণ বসতে হলো ।”
তুলিকা ব্যাগ থেকে দুটো বই বার করে। আলাউদ্দিন খাঁ র জীবনী। সৌরিশের খুব প্রিয় মানুষ।
“তোর জন্য আনিয়েছি।
কী দেখছিস? আমি সুন্দর নই বা ফর্সা নই বা লম্বা নই তাইতো! একটা মানুষের বাইরের চেহারাটার বড়ো গুরুত্ব তোদের কাছে। রঙ ফিগার মুখ এসব তোদের কাছে প্রধান। তুই খুব স্বার্থপর। যে এত বছরের সংসার ছেড়ে চলে আসতে পারে তাকে আমার শ্রদ্ধা হয় না।”
” কী বলছ এসব?”চীৎকার করে সৌরিশ।
“আর তুই আমাকে চিনতে পারিস নি। আমিও পারিনি।
কাল যখন বললি তোর মামাবাড়ি গৌড়হাটি, চমকে
উঠেছিলাম। আমি তোর তুলিদিদি। ”
সৌরিশ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে।
তুলিকা বলে চলে,”মিনুমাসি যেদিন সুইসাইড করল মনে আছে? তোর বাবা আবার বিয়ে করেছিলেন শুনে।তোর তখন দশ,আমি আঠারো। তুই সেদিন আমার কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলি। আমি ঠায় বসে ছিলাম যাতে তোর ঘুম না ভাঙে।”
“হা ভগবান!” সৌরিশ কাঁদছে।
“আমি তো তোর মা বলিস, দিদি বলিস তাই। এতো নিকৃষ্ট তোর ভাবনা! আমার অবাক লাগছে! ঘরে ফিরে যা। তোর মায়ের মতো তোর বউ কে ঠেলে দিস না। উঠি!”
সৌরিশ চীৎকার করে ওঠে,” “না তুমি যাবে না ।পায়ে পড়ি। তুলিদি আমায় ক্ষমা করো। উফ্! কী সত্যের মাঝে দাঁড় করালে আমায়!”সৌরিশ মাথা চেপে ধরে।
তুলি উঠে দাঁড়ায়।সৌরিশের মাথায় হাত বোলায়। তারপর হাঁটতে থাকে।
সৌরিশ জোরে কেঁদে ওঠে,”মা !মাগো!”