সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৪৮)

সীমানা ছাড়িয়ে
– বুঝতে পারচো না। তোমার গান,বাজনার প্রতি ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমাকে একা পেয়েও তুমি সুযোগের অপব্যবহার করো নি অসভ্যদের মতো। তোমার সহজ,সরল ব্যবহারে আমি মুগ্ধ। আমি নিজের জন্য তোমার। মতো সৎ ছেলের খোঁজে ছিলাম এতদিন। জমিদার বাবু আমাকে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছেন।
এই বলে তাকে বিছানায় ফেলে খুব আদর করলো পিউ। সে বাধা দিলো কিন্তু মেয়েটির ব্যবহারে নির্বাক হয়ে গেলো।
পিউ বলে চলেছে,আমি তোমাকে ভালোবাসি।
সে চুপ করে রইলো
তারপর নবকুমার বাড়ি এলো। বাড়ি এসে টাকা পয়সা সব মায়ের হাতে দিলো। হাত, পা ধুয়ে নিজের ঘরে বসলো। তখনও তার হাত পা কাঁপছে। পিউকে সেও ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু এ তো অসম আর্থসামাজিক প্রেম। সে ক্লাস একটু পড়েছে। সে জানে তারা বিয়ে করলে সমাজ মেনে নেবে না। তথাকথিত শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পরবে। সে এটাও জানে সমাজের সেনাপতিরা বায়েনপাড়ার কাজের মেয়েদের বিছানায় তুলে পা চাঁটে। তবু তারা প্রকাশ্যে তার স্বীকৃতি দেবে না কিছুতেই। তাহলে তাদের মুখোশ খুলে যাবে। তাই সে মায়ের কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বললো।
মা সন্তানদের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। সব শুনে তার মা ছেলেকে একটা গোপন মন্ত্র শিখিয়ে দিলেন। মায়ের দেওয়া বুদ্ধিকে নবকুমার মন্ত্র বলে থাকে। এই মন্ত্র তাকে অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।
তারপর ঝড়, বাদল পেরিয়ে অন্য ঋতু উঁকি মারছে। ঘরে ঘরে সোনার ধান গোলায় উঠছে। নবকুমার সকালে ঢোল বাজানো প্র্যাকটিস করে গান করতে করতে মাঠে গেলো। ধান কাটা,মাছ ধরা সব কাজ সে করে নিজের হাতে। মা কে কোনোদিন কাজ করার জন্য ধনীদের ঘরে পাঠায় না। সে ভাবে,সকলে তো নিজের কাজ নিজে করতে পারে। তাহলে একটা অবহেলিত সমাজ তৈরি হতো না। তার খুব খারাপ লাগে। অনেকে তাদের দাস পাড়াকে ঝিপট্টি বলে। ঝিপট্টি,বেশ্যাপট্টি সব নিজেদের প্রয়োজনে সৃষ্টি করে তথাকথিত সমাজপতিরা। তাদের ঝোলার জন্য গলার দড়ি জোটে না। এই ভেবে সে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো।
পিউ সাইকেল চালিয়ে বাজারে গেছিলো। কাউকে বাজার করতে দেয় না। পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকেন মায়ের সমান জমিদার গিন্নি। আজ পিউ এর পায়ে একটা পাথর লেগেছে। ব্যাথা হচ্ছে। রাস্তার ঢালাই এর পাথরগুলো রাক্ষসের মতো দাঁত বের করে আছে। নামেই ঢালাই। আর হবে না কেন। যারা চেয়ার দখল করে বসে আছে তারা ঘুষ খাবে। তবে অনুমোদন দেবে রাস্তা তৈরি করার। তারপর যে তৈরি করবে সে খাবে। তারপর তলানি। এতে আর কি হবে।
ভিতরে ঢুকতেই পিউ এরবান্ধবী বললো,কি হলো পায়ে। পিউ বললো,ও কিছু না,একটু লেগেছে। সে বললো,যা করবি একটু দেখে শুনে করবি।
পিউ ব্যাগ রেখে তার প্রিয় বান্ধবী রীতাকে ফোন করলো। ওর সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একবার ওরা ভূত দেখেছিলো।পিউ এর বন্ধুদল বিরাট।
একবার ন্যাশানাল পাড়ার একটা বাড়িতে ভূত দেখেছিলো দুজনে। একটি বাচ্চা মেয়ে সামনে এসে বললো,একবার এসো আমাদের বাড়ি। আমার মা ডাকছে। রীতা বললো,তোর মা কে তো চিনি না।
মেয়েটি বললো,একবার এসো না।
ওরা ভিতরে গিয়েছিলো। তারপর দেখলো মেয়েটা আর ওর মা হাত বাড়িয়ে নারকোল গাছ থেকে নারকোল পেরে আনলো। তারপর এক কিল মারলো। নারকোল ভেঙ্গে গেলো। তারপর রক্ত হাতে বললো,খা, খা।
ভয়ে ওরা ছুটে বাইরে এলো। রীতা ও পিউ মামুদপুরের মেশোকে বলেছিলো ঘটনাটা। তিনিও ভয়ে পালিয়েছিলেন। মেশো তার আত্মীয় অমলকে ঘটনাটা বলেছিলো। অমল বন্ধুদের বলেছিলো। পিউ এর মনেআছে অমল ও তার বন্ধুরা সবাই আড্ডা মারছে। এমন সময় অমল বলে উঠলো, জানিস ন্যাশানাল পাড়ার বনের ধারে যে তিনতলা লাল বাড়িটা আছে সেখানে নাকি ভূত দেখা গেছে।
মিহির বললো, তাহলে তোএকদিন সবাই মিলে গিয়ে দেখে আসতে হবে।
পিউ দোকান গেছিলো। সে বললো,টোটোনদা সত্যি আমরা দেখেছি ভূত নিজের চোখে। যা করবে সাবধানে কোরো আর পারলে ঘনাদাকে সঙ্গে নিও। ওর সাহস আছে।
টোটোন বলে উঠলো, তোরা খুব আজগুবি কথা বলিস। আরে টোটোন থাকতে ভূতের বাপও বাড়ি ছেড়ে পালাবে। চল তাহলে একদিন দেখাই যাক। আমরা সামনের অমাবস্যায় ওই বাড়িতে যাবো। ফিষ্ট করবো। মাংস আর লাল জল। বুঝলি কিনা। জমবে ভালো।
অমল বললো, শোন আসল কথাটা বলি। আমার মামুদপুরের মেশো একদিন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলো। বিকালে ওই বাড়ির দিকে বেড়াতে গেছিলো। একট বাচ্চা ছেলে কাঁদতে কাঁদতে মেশোকে বললো, আমার খিদে পেয়েছে। মামা জিলাপি কিনে ছেলেটাকে বললো, যাও খেয়ে নাও।
ছেলেটি নাছোড়বান্দা। বললো, আমার বাবাকে দেখবে এসো। কতদিন খেতে পায়নি। এসো দেখে যাও।
মেশো সরল লোক। মায়া হলো। ভিতরে গিয়ে দেখলো বাবা নয়। এক ভয়ংকর স্কন্ধকাটা ভূত। বললো, আমার গলা কেটে সবাইকে মেরে আমার সংসার শেষ করেছে তোর মতো একটা পাষন্ড। আমি কাউকে ছড়বো না। কাটা মুন্ডুটা হাতে। সেই মুন্ডুই কথা বলছে।
মেশো ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে। এবার ভবলীলা সাঙ্গ ভাবছে মেশো। এমন সময় ছেলেটি সামনে এসে বললো, বাবা এই লোকটি ভালো। জিলাপি কিনে দিয়েছে। এই বলে ছেলেটি উড়তে উড়তে জিলাপি খেতে লাগলো। উড়ন্ত অবস্থায় ছেলেটির মা বললো, এঁকে ছেঁড়ে দাঁও। যাঁও যাঁও। জিঁলাপি খাঁও।
তখন সুযোগ বুঝে মেশো পালিয়ে এসে বাঁচে।
টোটোন ভয় লুকিয়ে বাতেলা দিলো অনেক। বললো, ঠিক আছে আমরা কুড়িজন একসাথে যাবো ওই বাড়িতে। দেখা যাবে। কত ধানে কত চাল। তবে কিছু অস্ত্র সঙ্গে নিস বাবা।
চালাক টোটোন। তাই দল বাড়াচ্ছে। ঠিক হলো কুড়িজন বন্ধু একসাথে যাবে। অনেক ছেলের মাঝে নিশ্চয় ভূত আসবে না।
মাঝের কয়েকদিন যে যার কাজ নিয়ে থাকলো। তারপর এসে গেলো সেই অপেক্ষার অমাবস্যা। দিনের বেলায় সবকিছু কেনাকাটা সেরে সবাই দুরু দুরু বুকে রাতের প্রতিক্ষায়। কিন্তু কেউ ভয় প্রকাশ করছে না। বাড়িতে কেউ বলে নি। সবাই বলেছে, আজ একজন বন্ধুর জন্মদিন। রাতে বাড়ি আসবো না। ওখানেই সব ব্যবস্থা।
রাতের বেলা ন্যাশানাল সিনেমা হলের কাছে সবাই একত্র হলো। সবাই চললো এবার সেই অভিশপ্ত বাড়িতে। টোটন চুপ। কোনো কথা নেই। অমল বললো, কি রে টোটোন, চুপ মেরে গেলি কেন? কথা বল।
টোটোন বললো, এই দেখ আমার অস্ত্র। একটা মস্ত নেপালা বের করে দেখালো। তারপর বললো, ভূতের দফা রফা করবো আজই।
কথায় কথায় বাড়িটা চলে এসেছে কাছে। অমল বললো, চল ভিতরে ঢুকি। নবা বললো, তোরা যা, আমার কাজ আছে। তবে অই বাড়িতে ভূত আছে। পিউ আর রীতা আমাকে বলেছে। যাস না বাড়ি যা। ঘনাকে কেউ রাজী করাতে পারলো না। ঘনাকে পিয়ালী আড়চোখে দেখলো। মনে মনে ভাবলো, কি সুন্দর চেহারা ছেলেটার।
দুজন লোক পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। বললো, মরতে যেচো কেনে ওই বাড়িতে? খবরদার ওই দিকে মাড়িয়ো না। গেলেই মজা টের পাবে।
এখন আর ফেরার কোনো ব্যাপার নেই। হুড়মুড় করে সবাই ঢুকে পড়লো বাড়ির ভিতরে। তারপর মাকড়সার জাল, ধুলো পরিষ্কার করে রান্না শুরু করলো। এখনও অবধি কোনো ভৌতিক কান্ড ঘটে নি। ভয়টা সকলের কমে গেছে।
টেটোন বললো, অমল তোর মেশোর গাঁজার অভ্যাস আছে নাকি?
সকলের সামনে অমল একটু লজ্জা পেলো। তারপর ভাবলো, বন্ধুরা একটু ইয়ারকি মারে। ওতে ইজ্জত যায় না।
টোটোন এক পিস কষা মাংস নিয়ে লাল জলে মন দিয়েছে। সে এই দলের নেতা। সবাই অলিখিত ভাবে তাকে মেনে নিয়েছে নেতা হিসাবে। নেতা কষা মাংসতে কামড় মারার সঙ্গে সঙ্গে কষ বেয়ে লাল রক্ত।