সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৭২)

সীমানা ছাড়িয়ে

এবার অনিমেষ বলল আমাদের প্রতি বেশি পাড়ার লোকে সন্দেহ বাড়তে পারে এবার আমাদের বিয়ের পরে সন্তান বিষয়ে তাদের প্রশ্ন বাড়বে দু বছর বা চার বছর পরে সন্তান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। এখন আমরা ভাড়া থাকি না। নিজেরা বাড়ি করেছি। আমার স্ত্রীকে আমাদের কাছে এনে রেখেছি।

বৃষ্টি বললো, কথাটা মন্দ বলনি অনিমেষ কয়েকবছর সন্তান নিয়ে প্রশ্ন করল আমরা অনাথ আশ্রম থেকে চারজন শিশু দত্তক নেব। তারাই আমাদের সন্তান হবে।আমরা তাদের মানুষের মত মানুষ করব। তারাই একদিন সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবে।

তারা বর বউ সেজে থাকলো। পাড়ার কেউ গোপন খবর জানল না।

মানুষ মানুষের ভালো চাইবে, প্রতিবেশীরা একে অপরের উপকারে ছুটে যাবে এটাই তো মানুষের কর্তব্য। পৃথিবীর জন্ম থেকে মানুষ একা একা থাকত। ধীরে ধীরে দলবদ্ধভাবে থেকে মানুষ দেখলে সুবিধা বেশি।

এই অরণ্য জীবন থেকেই মানুষের যৌনপদ্ধতির বিভক্ত হয়ে যায়। স্বাভাবিক নর-নারীর মিলনের 90% মানুষ রাজি। স্বাভাবিক নর-নারী মিলনে 90% মানুষ অভ্যস্ত। কিন্তু শতকরা 10 ভাগ মানুষ আলাদা হলো যৌন মিলনের ক্ষেত্রে। পুরুষ পুরুষ পছন্দ করে। আর কোন মহিলা মহিলা পছন্দ করলো। এসব নিয়ে তখনকার দিনে কেউ মাথা ঘামাতো না। কিন্তু মানুষ যত উন্নত হলেও তাদের বুদ্ধি ও বাড়ল। শুরু হলো লড়াই সন্দেহ অত্যাচার। অনিমেষ বসে বসে ভাবছে, এমন সময় সে বলল, আমাদের লোক দেখানো বিয়ে তো দু বছর হয়ে গেল। এবার আমাদের চারজন শিশু দত্তক নিতে হবে। চলো আজ আমরা যাই অনাথ আশ্রম।আবির এলো বৃষ্টি এলো বৃষ্টি বলল রুমকি তোমাকে আর আমাকে গর্ভবতী হওয়ার অভিনয় করতে হবে কয়েক মাস আমরা অফিস যাব না। মাতৃত্বকালীন ছুটি নেব। পাড়ার সকলে দেখবে আমরা গর্ভবতী তারপর একদিন রাতে আমরা অনাথ আশ্রম এগিয়ে সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে আসবো। অনিমেষ বললো তাহলে চারজন শিশুর প্রয়োজন নেই। দুইজন শিশু মানুষ করতে পারলেই আমরা ধন্য হব। তারপর পেটে বালিশ বেঁধে গর্ভবতীর অভিনয় করে সমাজকে দেখালো রুমকি আর বৃষ্টি। তারপর বাবার বাড়ির নাম করে চলে গেল বাইরে। প্রায় এক বছর পর ফিরে এলো দুজন বাচ্চা ছেলে নিয়ে অনাথ আশ্রম থেকে। সদ্যোজাত শিশুদের ফেলে অনেক মা রা পালিয়ে যায়। সেই শিশু দুজনকে নিয়ে এসে তারা মানুষ করতে শুরু করল।আসমান বাড়িতে, তারা, আয়া রাখলো। চেহারায় কঠিন পরিশ্রমে দুইজন সন্তানকে বড় করে তুলল। কি কঠিন পরিশ্রম। তবু তাদের আনন্দের সীমা নেই।

বৃষ্টিদের সংসারে এসে শিশু দুটি শুধু দেবদূত হয়ে এলো তারা এক নতুন কাজের মেয়ে দেখেছে। সে শিশুদের দেখাশোনা করে। আর একজন কে রেখেছে রহিম। রান্নাবান্না করে বাজার করে রহিম খুব বিশ্বাসী ছেলে। সে তাদের সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। অনিমেষদার টাকার অভাব নেই চাহিদার বেশি তারা তাদের পাড়ায় যেকোনো প্রয়োজনে তারা হেল্প করে। তাদের সংসার নিয়ে প্রতিবেশীর নিয়ে বেশ সুখেই আছে।

ঈশ্বর মানুষকে সবকিছু একসাথে দেন না কিছু দিলে অন্য কিছু অপূর্ণ থেকে যায় সব পাওয়া হয়ে গেলে জীবনে বেঁচে থাকার আনন্দ আর থাকে না না পাওয়ার দুঃখ নিয়ে জীবন কাটানোর মধ্যেও একটা আনন্দ আছে একটা সংগ্রাম আছে।

ছেলেদের নাম রেখেছে সুজয় আর বিজয় তারা পড়াশোনায় খুব ভালো যে তারা মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরে কলেজে ভর্তি হলো তারা যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং চালাক।

দিন ছুটির দিনে সকলের বাড়ি আছে দুপুরে খাওয়ার পরে ওরা চেয়েছিল চারটি ঘর একটিতে সুজয়ের বাবা মা আরেকটি ঘরে বিজয়ের বাবা মা ওরা একটা ঘরে থাকে আরেকটি ঘরে কাজের মাসি থাকে এইভাবে ছোট থেকে শুনে আসছে।

দুপুরবেলা বিজয় বাথরুম যাচ্ছিল হঠাৎ সিজারের ঘরে নজর গেল বিষয়গুলো ঘরে মার সুজয় শুয়ে আছে তারা বিচিত্র কাজকর্ম করছে।কান। লাল হয়ে গেলো লজ্জায় সঙ্গে নিয়ে দেখল দুজনেই সম্পূর্ণ উলঙ্গ। দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে বোধ হয়। এদিকে বাবাদের দরজা বন্ধ। দেখা যায় না কিছু।

সুজয় বলল সমকামীরা এরকম ব্যবহার করে এগুলো তো বলেছি। তাহলে আমরা কি ওদের সন্তান নয়। বিজয় বলল তা কেন। সমকামী মেয়েরা সন্তান নিতে পারে ইচ্ছে করলে। তারা সন্তান নিতে পারে, আবার না হতেও পারে। আমরা এ ব্যাপারে আরো খোঁজ খবর নেব।

সুজয় আর বিজয় অন্যরকম হয়ে গেল তাদের বাবা মা জিজ্ঞেস করে তোদের কি শরীর খারাপ কি হয়েছে বল বিজয় বলে না না কিছু হয়নি আমি ঠিক আছে সুজয় বলে শরীর ঠিক আছে কিন্তু মন ভালো নেই পড়ার খুব চাপ তারা পড়ার দিয়ে বাড়িতে চুপ করে থাকে তাদের মনে একটাই প্রশ্ন সমকামীদের সন্তান হয় না? তাহলে তারা কোথা থেকে এলো? নিশ্চয়ই তারা অনাথ আশ্রমের ছেলে? তা না হলে? সমকামি মেয়েরা কি সন্তান ধারণ করে? এইসব নানা প্রশ্নে কিশোরমন কুঁড়ে কুঁড়ে ব্যথা পায়।

তারা কাছাকাছি থাকা একটা অনাথ আশ্রমের গেল এলাকার একটাই অনাথ আশ্রম সেখানে খোঁজ নিল তারা তাদের বাবা মায়ের নাম আলাদা করে বলল পুরনো রেজিস্টার বের করে বৃদ্ধ নরেশ বাবু দেখছিলেন নামগুলো বিজয় বলল আপনি যদি অনুমতি দেন আমরা আপনাকে হেল্প করতে পারি আমরা দেখে দিচ্ছি দিন পাতা উল্টাতে উল্টাতে তাদের নজরে পড়লো কুড়ি বছর আগে করা তাদের বাবা-মায়ের অকপট স্বীকারোক্তি আমরা স্বেচ্ছায় দুইজন শিশুসন্তানকে পালনের জন্য দত্তক নিলাম।

তার সঙ্গে কাজ করা কিছু আইনি কাগজপত্র। বাড়িতে কিছু না বলে তারা দুজনে চলে গেল শহর ছেড়ে। যে বাবা-মা তাদের তিলে তিলে কষ্ট করে বড় করে তুলেছে তাদের কথা তারা অভিমানে অভিমানে ভুলে গেল। বিজয় একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে কাজ করতে শুরু করলো অনেক দূরে। মনের অনেক দূরে।

বৃষ্টি আর রুমকি সুজয় আর বিজয়কে দেখতে না পেয়ে কেঁদে কেঁদে আকুল। তারা শুধু অনিমেষ আর আবিরকে বলে তাদের ছেলেদের ফিরিয়ে আনার কথা। তারা থানায় জানিয়েছে। তারা বলেছেন, খোঁজ চলছে পাওয়া গেলে জানানো হবে। আমারাও বাবা মা কে দুঃখ দিয়ে বাড়ি থেকে চলে এসেছি। তারপরে আমরা আছি এই দুঃখের মাঝে। চাকার মত ঘোরে কৃতকর্মের ফল।

সুজয় আর বিজয় যে বাড়িতে ভাড়া এসেছে সেই মালিকের নাম বলে না। মালকিনের নামে বাড়ির নাম লেখা, নন্দিতা।

বৃষ্টি বলল ঠিক বলেছ আমাদের এটাই পাওনা ছিল কি করব আমরা ঈশ্বর আমাদের শরীরে কিভাবে তৈরি করে দিছেন ওরা তো ওরা হয়তো কোনরকমে তা জানতে পেরেছে তাই তারা আমাদের ছেড়ে চলে গেল প্রতিবেশীরা জিজ্ঞাসা করে কোথায় তোমাদের ছেলেরা চাকরি পেয়েছে দুজনে এখন আর এখানে থাকবে না চাকরি জায়গাতেই থাকবে।

বছরের পর বছর চলে যায় ওরা আর ফিরে না অনিমেষ আর আবির একদিন টাটা সুমোতে চেপে মন্দিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ পথে দুর্ঘটনা দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। কিন্তু কেউ ছিল না তারপরওরা পরলোকে চলে গেল। বাঁচানো গেল না।

কিন্তু বৃষ্টি আর রুমকি একদম একা হয়ে পড়ল। তাদের বাবা-মা পুত্র স্বামী কেউ নেই। পৃথিবীতে তারাই একা। কেবল একে অপরে খোঁজ রাখে। আর খোঁজ নেয় প্রতিবেশীরা। বৃষ্টির যৌবনের বয়স পেরিয়ে গেছে। তারা কাজের লোকের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। নিজেরা রান্নাবান্না করতে পারে না। কষ্ট করে কোন রকমে বাথরুমে যায়।

সুজয় আর বিজয় বিয়ে করেছে তারা আলাদা বাসা ভাড়া করেছে। সুজয় ছেলেদের নিখোঁজের কথা

পুলিশ খুঁজতে খুঁজতে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দুজন ছেলেকে আর দুজন লোককে পেয়ে গেল রাস্তার মাঝে তারা ছবি তুলে নিল সেই ছবি তারা বৃষ্টিকে দেখে দেখালো বৃষ্টি বলল এই দুই ছেলের মাঝে এই যে ছবি দেখছেন এর নাম টোটন।এই টোটনের নামে ডায়েরি করা আছে। ডায়েরি নাম্বার তিনশ পাঁচ। পুলিশ ফাইল খুলে পেয়ে গেল রেপ কেসের ডিটেলস। পুলিশ হানা দিল একরাতে টোটনের গোপন বাড়িতে।টোটন শেষ বয়সে ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। কিন্তু সুজয় আর বিজয় ভাড়া বাসা ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও।

সুজয় আর তার স্ত্রী ভট্টনগরে থাকে। আর বিজয় ও স্ত্রী শ্বশুর বাড়ি সোনারপুরে থাকে। তাদের মধ্যে খুব কম দেখা হয়। এর ফলে তাদের একদম ভালো লাগে না।
ঘটনাচক্রে একদিন কলকাতায় সুজয়ের সঙ্গে বিজয় দেখা হলো বিজয় বলল আমি শুনেছি বাবা এবং কাকু অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন একবার আমাদের যাওয়া উচিত চল বাড়ি গিয়ে খবর নিয়ে আসি।

কলকাতায় তারা ছোট থেকে মানুষ হয়েছে তারা চলে গেল বাড়ি rumky-r বৃষ্টি তাদের দেখে আনন্দে আত্মহারা হলো তারা হাতজোড় করে সুজয়কে বলল তোরা ঘরে ফিরে আয় তোদের তোদের বিয়ে আমরা হাসিমুখে মেনে নিচ্ছি তোরা ঘরে ফিরে আয় সুজয় বিজয় বউদের নিয়ে এক মাস পরে বাড়ি ফিরে এলো।

তারা ছেলেদের ডেকে বলল তোরা সুখে থাকলেই আমরা সুখী টাকা-পয়সা বাড়িঘর তৈরি থাকলো আমাদের পেনশনের টাকায় চলে যাবে আমরা বৃদ্ধাশ্রমের থাকবো তোরে কষ্ট দেবো না।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।