সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ১৬)

সীমানা ছাড়িয়ে

আমার বনধু পল্লব যাচ্ছিলো বাজারে। আমি তার সঙ্গ নিলাম।
—- চায়ের দোকানে ছেলেটাকে দেখলি?
—- হ্যাঁ, দেখেছি,ওর সব কথাই শুনেছি। কিছু করার নেই। পারবি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখতে।
না। কারণ, পরের ছেলেকে রেঁধে বেড়ে কে খাওয়াবে। আপনি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন। উত্তরটা একই হবে।

তাহলে কি উপায়। সুনাগরিক হিসাবে আমাদের দায়ীত্ব তো কম নয়। বললো আমার বন্ধু।
আর আমরা যাদের খাওয়া পড়ার চিন্তা থাকে না, তারা শৈশবে ছোটাছুটি, নানারকম খেলা, সাইকেল চালানো এইসব করেই দিন কেটে যায়। মনে আছে মিলু, বিশ্বরূপকে সাইকেল চালানো শেখাতে গিয়ে প্যান্ট খুলে গিয়েছিলো। তবু দায়ীত্ববোধে সে সচেতন। বন্ধু যাতে পরে না যায় তার জন্য সাইকেল কিন্তু ছাড়ে নি। এই নিয়ে পিনু, নোটোন, আশীষ,অধীরের হাসাহাসিতে লোক জড়ো হয়ে গেছিলো।তখন আমরা বারো কি তেরো য় পা দিয়েছি।

আর সুনামি বলে ছেলেটার মুখে হাসি নেই। শুধু কাজ আর কাজ। তা না হলে খেতে পাবে না তো। তারপর সাতকুলে কেউ নেই ওর। কোথায় রাত কাটায় তার কোনো ঠিক নেই। হয়ত দোকান বন্ধ হওয়ার পরে ঝাপ ফেলে ওখানেই শুয়ে পরবে।
চা দোকানের মালিক কাজে গাফিলতি করার জন্য সুনামিকে একদিন খুব বকাবকি করলো। দিন দশেক পরেএসে দেখলাম দোকানের কাজ ছেড়ে সুনামি অন্য কোথাও চলে গেছে ভালোবাসার খোঁজে।

এখন আমি বাড়ি ফিরেছি। সফল হয়েছি। একটা হাই স্কুলে মাষ্টারি করি। এই বলে সোম চুপ করলো। মনের লাভা বেরিয়ে এসে চোখে আনন্দ অশ্রু হয়ে ঝরে পরলো। এবার সোমের বাবা, মা তার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন।

এখন সোম পুরোপুরি সংসারী। তবু তার মন মানুষের জন্য ভাবে। পৃথিবীর কোণে কোণে তার মন অভুক্ত,ব্যথিত,আতুর লোককে সান্ত্বনা দিয়ে চলে আজও…
সৌমর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে গ্রামের আশেপাশের বহু মানুষের সঙ্গে।সে তাদের খোঁজ খবর রাখে।সকলেই তাকে ভালোবাসেন।অট্টহাস সতীপীঠ কাছেই।সেখানে যাতায়াতের সূত্র ধরে অনেক মানুষের খোঁজ খবর সে রাখত।পাঁচুন্দির হাট বসে প্রতি বৃহস্পতিবার।গরু,মোষ,ছাগল নিয়ে কেনাবেচার উদ্দেশ্যে নিয়ে পরিচয় আরও গভীর হত।রমজান,ইজাজুর,মহম্মদ নূর,বেণুকর,অপু,সুকুমার,রুণু,শঙ্করী,অসীম,বিজয় ও আরও কতলোক অজান্তেই পরম আত্মীয় হয়ে গিয়েছিলো।হাটের স্ট্যাম্প মারা গরু, ছাগল সারি দিয়ে যায় পাকা রাস্তা দিয়ে।এই হাট এই অঞ্চলের প্রাণের স্পন্দন।এই অঞ্চলকে ঘিরেই সৌমর এখনকার জীবনযাত্রা। হয়ত আবার কোনোদিন মুক্তোর খোঁজে বেড়িয়ে পড়বে গেরুয়াবেশে।তার মতিগতি দেখে অনেকেই এই কথা বলে থাকেন।সৌম্য বেশ কয়েকটা লোকের কথা এখনও ভুলতে পারে না।

অনিমেষ বোস বারান্দায় বসে থাকতেন সকালে।তার দুই ছেলে।সবুজ ও বিজয়।সবুজ সরকারী চাকরি করে আর বিজয় লেখক।সে একটা প্রাইভেট স্কুলে কাজ করে। অনিমা সবুজের স্ত্রী। তার রান্নার লোক আছে।কাজের মাসি আছে।সারাদিন মোবাইলে
দিন কাটে অনিমার।সে খুব প্রাকটিক্যাল।একদম রোবোটিক।শ্বশুর শ্বাশুড়িকে পাত্তা দেয় না।কেউ কিছু বললেই তর্ক করে না বুঝে।অথচ ছেলেরা মা বাবার সঙ্গে মুখ তুলে কথা বলেনি কোনোদিন।

বিজয় বৌ নিয়ে কাটোয়ায় থাকে।তার সংসার সে নিজে বুঝে নেয়।তার স্ত্রী খুব ভালো।

কিন্তু বড় বৌমা অনিমা খুব মুখরা।কাউকে সম্মান দিতে জানে না।
অনিমেষবাবু রাশভারি মানুষ। তিনি বুঝলেন,এখানে থাকা কষ্টকর।তাঁর কাজে ব্যাঘাত ঘটে।তিনি আর কবিতা দেবী কৃষ্ণ মন্দিরের লাগোয়া ঘরে চলে গেলেন বড় ছেলেকে বল।ছোটো ছেলে দূরে শিক্ষকতা করে।সেখানেই ভাড়া নিয়ে আছেন তিনি।
অয়াদিপাউসের মত অনিমেষবাবু সত্যের অনুসন্ধান করেন।আজীবন করে এসেছেন।রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের সেবক তিনি।চিরকাল

আর সবিতা দেবী রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।সংসারের কাজ করতেই তার ভালো লাগে।পুরোহিত এলে একবার মন্দিরে যান।প্রসাদ আনেন ঘরে।স্বামীকে দিয়ে তারপর নিজে খান। অবসর সময়ে সবিতাদেবীর মনে পড়ে পুরোনো কথা।আগে খুব মজা হত শ্বশুরবাড়িতে।
সব জা , একত্রে মিলিত হতো ননদ বা দেওরের বিয়েতে। একবার বাসু দেওরের বিয়েতে পুণ্যলক্ষী বৌদি ছেলে সেজেছিলো। প্যান্ট, জামা পরে চার্লি চ্যাপলিনের মতো একটা লাঠি নিয়ে অভিনয় করে চমকে দিয়েছিলে বিয়ে বাড়িতে। সব জা রা প্যান্ট পরা ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে যখন ভাশুরদের সামনে দাঁড়ালো,মাথা লজ্জায় নিচু করেছিলো পুরুষদল। তখনকার দিনে এটা একটা ভীষণ সাহসের ব্যাপার ছিলো। অভিনয়ের শেষে যখন জানতে পারলো প্রকৃত ঘটনা তখন সকলে হাসাহাসি আর চিৎকার শুরু করলো। নতুন বৌ বুঝতে পারতো একান্নবর্তী পরিবারের আনন্দ। বিয়ের শেষে যে যার চাকরীর জায়গায় চলে গেলে বাড়ি ফাঁকা লাগতো। নতুন বৌ এর ভালো লাগতো না। স্বামী চলে যেতো চাকরীর জায়গায়। বাড়িতে মা, বাবা আর বেকার দেওরের দল। তারপর জলের ধর্মে যে কোনো পাত্রের আকার ধারণ করতো নতুন বৌ। বাবা,মায়ের সেবা,দেওরের খাওয়া, রান্নাবান্না সব নজরে রাখতে হতো নতুন বৌকে। প্রাণমন ছটফট করতো বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য। শ্বশুর, শ্বাশুড়িকে রাজী করে শর্ত মেনে যেতে হতো বাবার বাড়ি। তখন পুরোনো মাটির গন্ধে নতুন বৌ ভুলে যেতো সব না পাওয়ার দুঃখ।
কিন্তু এখন পরিবার গুলো ভেঙ্গে টুকরো হয়ে গেছে।স্বার্থপরের মত নিজেরটা ছাড়া কিছুই বোঝে না।মা, বাবার খোঁজ নেয় না।কিসের এত ব্যস্ততা।মনগুলো যান্ত্রিক হয়ে গেছে যন্ত্রযুগে।ছেলেদের জন্য খুব চিন্তা হয় সবিতাদেবীর।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।