সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৩)

হারিয়ে যাওয়া একলব্য

তা না হলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত।একলব্য ছিল নিষাদ রাজ্যের রাজপুত্র। অনার্য হিসেবে নিষাদরা সবসময়ই ছিল অবহেলিত। তাদের অবয়ব, বেঁটে আকৃতি, কুচকুচে কালো গাত্রবর্ণ, যুদ্ধ ক্ষেত্রে পারদর্শী না হওয়া তাদেরকে আর্যদের চোখে করে তুলেছিল হীন। এরকম পরিস্থিতির মধ্যেই একলব্য স্বপ্ন দেখেছিল বিশ্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হওয়ার। সে পণ করেছিল যে কোন মূল্যে সে গুরু দ্রোণ এর শিষ্য হবে।
দ্রোণাচার্য ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ অস্ত্রবিশারদ ও ধনুর্ধর। তিনি ছিলেন পান্ডব ও কৌরবদের অস্ত্রশিক্ষার গুরু এবং যুদ্ধ শিক্ষার সমস্ত জ্ঞান তিনি তাদের প্রদান করেছিলেন। সেসময় ভারতবর্ষে দ্রোণাচার্যের চেয়ে বড় কোনো অস্ত্রগুরু ছিল না। অর্জুন ছিল দ্রোণাচার্যের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য। অর্জুনকে তিনি যে বিদ্যা দিয়েছেন অন্য কাউকে তিনি তা দেননি। পুত্র সমুতুল্য স্নেহ করতেন তিনি অর্জুনকে। তাই কেউ ধনুর্বিদ্যায় অর্জুনের সমকক্ষ হোক তা তিনি চাননি। অর্জুনের প্রতি দ্রোণাচার্যের এই বাৎসল্য একসময় একলব্যের জীবনে নিয়ে এসেছিল বিপর্যয়।
অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য কাছে একলব্য অস্ত্রশিক্ষা করতে গেলে দ্রোণাচার্য তাকে শূদ্র বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং একলব্য কিন্তু তাতে বিরত না হয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে, গভীর অরণ্যে দ্রোণের মাটির মূর্তি নির্মাণ করে অস্ত্রশিক্ষা শুরু করে এবং তাকে গুরু বলে মনে করে। এইভাবে দীর্ঘদিন সাধনা করে তিনি ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী হন। একলব্য মহাভারতের সবচেয়ে অবহেলিত চরিত্রগুলোর একটি। যে নিজ গুণে, নিজ চেষ্টায় হয়ে উঠেছিল অর্জুনের সমপর্যায়ের ধনুর্ধর, অনেক ক্ষেত্রে সে অর্জুনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।একলব্য দ্রোণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হলেও থেমে থাকার পাত্র ছিলেন না।
একলব্যের সাধনা
একলব্য বনের মধ্যে দ্রোণের একটি মাটির প্রতিমা নির্মাণ করেন। এই মাটির প্রতিমাকেই গুরু বলে স্বীকার করে নিজে নিজেই অস্ত্রবিদ্যা শিখতে শুরু করেন তিনি। কিছুসময়ের মধ্যেই তিনি ধনুর্বিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে ওঠেন। একদিন কৌরব-পাণ্ডব ভাইয়েরা শিকার করার জন্য বনে গমন করেন। মৃগয়ার জন্য একটি কুকুরও সাথে নিয়েছিলেন তারা। সেই কুকুরটি একটি হরিণকে অনুসরণ করতে করতে নিষাদপুত্র একলব্যের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং একলব্যকে দেখে সে জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকে। তখন একলব্য একসাথে সাতটি তীর সেই কুকুরটির মুখের ভেতর নিক্ষেপ করেন। কুকুরটি সেই অবস্থায় পাণ্ডবদের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়। পাণ্ডবেরা কুকুটির মুখে প্রবেশ করা সেই সাতটি তীর দেখে ভীষণ অবাক হয়ে যান। সেই ধনুর্ধর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই কুকুরটির মুখে শব্দভেদী তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। সেই ধনুর্ধরের দক্ষতা বিচার করে পাণ্ডবেরা নিজেদের অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট বুঝতে পেরে ভীষণ লজ্জিত হলেন। এরপর পাণ্ডবেরা বনের ভেতর সেই তীরন্দাজকে খুঁজতে থাকেন। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে এক বনবাসীকে অনবরত তীর বর্ষণ করতে দেখতে পান তারা। একদিন একলব্য গভীর সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। এই সময় একটি কুকুর প্রচণ্ড শোরগোল করে তাকে বিরক্ত করে। কোনভাবেই কুকুরটিকে তাড়াতে না পেরে একলব্য কুকুরটির মুখে সাতটি তীর এমন দক্ষতার সাথে বিদ্ধ করেন যে, কুকুরটি বেঁচে থাকে কিন্ত তার আওয়াজ করার জন্য মুখ নাড়ানোর অবস্থা থাকে না। এটি ছিল রাজবংশের পোষা কুকুর।তারা কুকুরটিকে দেখতে পেয়ে গেছে যে সাতটি বিদ্ধ হয়ে আছে কিন্তু সে মনে নেই ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে কিন্তু চিৎকার করতে পারছে না তখন তারা বুঝল এখানে নিশ্চয়ই বিখ্যাত কোন ধনুর্ধর আছেন গোপনে। যাকে আমরা কেউ দেখিনি।তন্ন তন্ন করে তারা খুঁজতে খুঁজতে একলব্যের সন্ধান পেয়ে যান এবং রাজপুত্ররা জিজ্ঞেস করেন আপনি কে? তখন একলব্য উত্তর দেন, আমি দ্রোণাচার্যের শিষ্য। জাতপাত কিভাবে বিদ্যমান ছিল এই অংশেই তার প্রমাণ মেলে। দ্রোণ একজন নিষাদকে, একজন অস্পৃশ্য, ম্লেচ্ছকে কোনোদিনো সাধারণদের সমান হতে দিতে চাননি। এই বর্ণবাদীরা সবসময় উচ্চনীচ ভেদাভেদ তৈরি করে, নিচু জাতির লোকেদের পায়ের তলায় পিষে মারতে চেয়েছে। তারা কখনো তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষদের তাদের কাধের সাথে কাঁধ মিলিয়ে চলতে দেয়নি। একজন শিক্ষকের এমন মানসিকতা যে হতে পারে তা আজ আমরা কল্পনাও করতে পারিনা। কুরুবংশের কেউ নয়, সামান্য একজন শূদ্রের এত ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শিতা দেখে অর্জুন, দ্রোণের সেরা ছাত্র, ঈর্ষা করেন,একলব্যকে। তিনি দ্রোণের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন যে দ্রোণাচার্য অর্জুনকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হিসেবে গড়ে তুলতে তো পারেন নি, তার সেরা ছাত্র হচ্ছে সামান্য এক নিষাদ।দ্রোণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে গড়ে তুলবেন। দ্রোণ তো কেবল আকাশ থেকেই পড়লেন না, তার মাথায় একই সাথে যেন আকাশও ভেঙে পড়ল। কোথাকার কোন একলব্য নাকি তার শিষ্য, যাকে তিনি তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, আর তিনিই নাকি তাকে এমন শিক্ষা দিয়েছেন যা নাকি অর্জুনেরও নাগালের বাইরে! পড়িমরি করে ছুটলেন দ্রোণ অর্জুনকে নিয়ে একলব্যের খোঁজে। একলব্য তার ঘরের বাইরে গুরুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। আগের বার গুরু তার আগ্রহে জল ঢেলে দিয়েছিলেন। এইবারও একলব্যের গুরু দর্শনের আনন্দ শেষ হবে আরেকটি বিষাদের গল্পের মধ্য দিয়ে। দ্রোণ যখন একলব্যের কৌশলের কিছু নমুনা দেখলেন, তার তো চক্ষু চড়কগাছ!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।