T3 || ১লা বৈশাখ || বিশেষ সংখ্যায় সন্দীপ গাঙ্গুলী

আবর্তন

গাঢ় হলুদ রঙের শিফন শাড়িটা রুমানাকে ভীষন টানছিল,খানিকটা দোলচালের মধ্যে ছিল নেবে কিনা। হঠাৎ কাঁধে স্নেহের স্পর্শে চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে দেখে অনসূয়াদি পাটকিলে রঙের শাড়িতে একই রকম সুন্দরী ,বলেন “নিয়ে নে অত চিন্তাকরার দরকার নেই।”

রুমানা ফিরে গেল ঊনিশ বছর আগে কলেজ জীবনের প্রথম দিকে, অনসূয়া মুখার্জি বাংলার অধ্যাপিকা। প্রথম ক্লাসেই ওরা বুঝতে পারল দিদি কেবল সুন্দরী নয় অধ্যাপনাতেও অতুলনীয়া।
কয়েকদিনের মধ্যেই ওরা কয়েকজন দিদির খুব কাছের হয়ে উঠল, মাঝে মাঝে রুমানারা যেত ওনার ফ্ল্যাটে নোটস নেওয়ার জন্যে। ওখানেই একদিন আলাপ কৃষ্ণেন্দুদার সঙ্গে, ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। কলেজ শেষ হওয়ার বছর খানেক পর একদিন দিদির ফোন ” এই রবিবার সন্ধ্যেতে চলে আসিস আমার ফ্ল্যাটে,কৃষ্ণেন্দু কে বিয়ে করছি “।

রুমানার মা যতদিন ছিলেন বাংলা নববর্ষের দিন নতুন কিছু না কিছু দিতেন,বলতেন ” এই দিনটা একান্ত বাঙালিদের,তাই সকলেরই এই দিনটায় নিজেকে নতুন করে সাজান উচিৎ ” । মা মারা গেছেন প্রায় আট বছর হল, তারপর থেকে রুমানা পয়লা বৈশাখের দিন নিজেকে নতুন ভাবে দেখতে চায়, অন্তত নিজের মনের দর্পণে। তাই যখন শাড়িটা নেবে কিনা ভাবছিল, তখন অনসূয়াদির স্নেহস্পর্শে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল।মায়ের পর একমাত্র তিনিই আছেন যে রুমানাকে বোঝেন।

রুমানা স্কুলের চাকরিতে জয়েন করার প্রায় বছর চারেক পর,কিছু বইয়ের খোঁজে একদিন কলেজস্ট্রীটে যায়। অনসূয়াদির সঙ্গে ওখানে হঠাৎ দেখা,একরকম জোর করেই নিয়ে গেল কফিহাউসে। একথা সেকথার পর বললেন ” জানিস কৃষ্ণেন্দুর সঙ্গে আর থাকতে পারলামনা।হয়তো আমারই দোষ , ও চেয়েছিল আমাকে মানিয়ে নিতে,কিন্তু আমার বোহেমিয়ান মানসিকতা বোধহয় সংসারের উপযুক্ত নয়,তাই সম্পর্কটার ইতি হয়ে গেল।” রুমানা ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল কফিহাউস থেকে।

চার বছরের মধ্যে কৃষ্ণেন্দু যখন রুমানাকে ছেড়ে চলে গেল গার্গীর কাছে,তখন তাদের কন্যা শ্রুতি মাত্র দু বছর। কেন জানিনা তখন রুমানার মনে হচ্ছিল অনসূয়া দিই তার একমাত্র আশ্রয়। কয়েকদিন পর রুমানা আসে অনসূয়ার ফ্ল্যাটে। তার মনে এতদিনের বাষ্পরা দিদির স্নেহের পরশে শ্রাবণ ধারাপাতে পরিণত হয়। রুমানাকে ওখানে কয়েকদিন থেকে যেতে বলেন তিনি, মনের ভার লাঘবের জন্য।
পরেরদিন দিদি কলেজ বেড়িয়ে যাওয়ার পর,ছোট্ট শ্রুতি যখন ঘুমিয়ে পড়েছে তখন স্মৃতিরোমন্থন
করতে করতে দিদির ঘরে ঢুকে তার চেনা লাল ডায়রি টা টেবিলে দেখে।
রুমানা অনেক চেষ্টা করেও সেটা পড়ার ইচ্ছে আর রোধ করতে পারে না।
ওটা পড়ার পর অনসূয়াদিকে নতুন করে চিনতে পারে,আর নিজের ওপর ততোধিক ঘৃণা বাড়তে থাকে।

দিদি কত চেষ্টা করেছিলেন কৃষ্ণেন্দুর সঙ্গে সম্পর্কটা বাঁচিয়ে রাখার,কিন্তু সে তখন রুমানায় আসক্ত। একদিন সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে চলে গেল অনসূয়াকে ছেড়ে।তার কিছুদিন পর অনসূয়াদি জানতে পারেন কৃষ্ণেন্দু রুমানার সঙ্গে আছে,কিন্ত কোন ভাবেই সেটা বুঝতে দেন নি।

সেদিন কলেজ থেকে যখন অনসূয়া ফিরলেন তখন আকাশ জুড়ে কালবৈশাখীর মেঘের ঘনঘটা। ফ্ল্যাটের একচিলতে বারান্দায় আকাশের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে ছিল রুমানা। অনসূয়া দি কে দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না, আকাশের কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি তার চোখ থেকে চিবুক ছুঁয়ে ঝরে পড়ে। সম্পর্কের প্রস্রবনে হারিয়ে যাওয়া দুই অসমবয়সী নারী উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠে “হৃদয় আমার প্রকাশ হল …” , অদ্ভুত সরলতায় খিলখিলিয়ে হেঁসে ওঠে শ্রুতি হয়তো স্বপ্নের সান্নিধ্যে।

চশমার কাঁচটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল,ওটাকে মুছে হলুদ শিফনটা নিয়েই নিল রুমানা। কদিনপর পয়লা বৈশাখ,শ্রুতিকে নিয়ে সে যাবে অনসূয়াদির কাছে নতুন আশার অঙ্কুরোদগমের উদ্দেশ্যে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।