সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৩৮)

সীমানা ছাড়িয়ে
মিতা বেশ কিছুদিন ধরে তার এক টি ছেলে সনৎকে দেখতে পায় না। সব ছেলে মেয়েরা মায়ের সঙ্গে দেখা করে কিন্তু সনৎ কেন দেখা করে না। প্রশ্ন করে মিতা সব ছেলে মেয়েদের। কেউ বলে, মা আমি কি করে বলব তার কথা। আবার কেউ বলে, ওর ব্যাপার অই জানে, আমরা জানি না মা।
মিতার কেমন যেন সন্দেহ হয়। সে ভাবে, ছেলেটি কি মরে গেল? আর দেখা করে না কেন। আবার ভাবে, হয়ত রাগ হয়েছে বলে আসে না। মিতার মনে প্রশ্নগুলো ভিড় করে আসে।
ময়ুরাক্ষীর ধারে বাড়ি মিতার। ছোট থেকেই এই নদীর বুকেই তার যত অভাব অভিযোগ ছুঁড়ে দেয়। ফাঁকা নদীর ধারে চেঁচিয়ে সে মন হাল্কা করত। আজ মিতার নদীর ধারে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই বাড়িতে বসেই কাঁদে আর নদীকে গোপন কথা বলে।
ছোট ছেলে ছিদাম মদ খাওয়া ধরেছে দাদা মরার পর থেকে। সংসার আর তার ভাল লাগে না। মায়ের কাছে বসে। মা তার হাতে পরা আংটি দুটি হাত দিয়ে ধরে দেখে। ছিদাম কথা বলে না। শুধু মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। মা, তার না বলা কথা কেমন করে বুঝে যায়। মা বলেন, ভাল করে সংসার কর। শরীরের যত্ন নিও। আর তারপরেই বলেন, হারে ছিদাম তোর দাদা সনৎ আর দেখা করে না কেন?
ছিদাম কি করে বলবে,জানি না মা।
সে কি করে মাকে বলবে, দাদা মারা গেছে ক্যানসারে। আর এক দাদা ভুগছে রোগে। কখন কি হয়, কেউ জানে না। আর মায়ের বয়স পঁচাশি হল কিন্তু মরার কোন লক্ষণ নেই। ছিদাম ভাবে, কেউ চায় না মা মরুক। কিন্তু দাদারা মরার লাইনে নাম লিখিয়েছেন। ছিদামের শরীরও ভাল নেই। মা পুত্রশোক পেলে বাঁচবেন না। আর বিছানা থেকে উঠতে পারে না মিতা। তবু কোনও ছেলে বলে না। ছিদাম ঠিক করে নিল, আজ সে বলবে মাকে সমস্ত ঘটনা। মা মরে যায় যাবে? মরবে না বেঁচে যাবে। সে ভাবে, রাতে হেগে মুতে বিছানায় মাখামাখি। মদ খাই বলে পরিষ্কার করতে পারি। আর কেউ মায়ের ঘরের দিকে আসে না। বৌ, ভাইঝি,ভাইপোরা কাজ নিয়ে থাকে। আবার রাধামাধবের মন্দির আছে। ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার আছে। এমতাবস্থায় কাউকে দোষারোপ করা যায় না।
ছিদাম ভাবে আজ বলবেই মাকে আসল ঘটনা। বাইরে একবার বেরিয়ে এল। কোঁচর থেকে প্লাষ্টিকের বোতল বের করে তরল পদার্থের সবটুকু গলায় ঢেলে দিল। তারপর আয়েশ করে একটা বিড়ি ধরাল।
ঘরে ঢুকতেই মা বলল,আয় ছিদাম এখানে বোস। এঘরে ছিদামই বেশি আসে। আর ছিদামের গায়ের গন্ধ মায়ের চেনা হয়ে গেছে। ছিদাম জানে, মা এবার প্রশ্ন করবে। ঠিক তাই। মা বললেন , বাবা ছিদাম, তুই বল সনৎ কোথায়। সে আসে না কেন? আর কদিন ধরে ভোলাকে দেখছি না। কি হল তাদের।
ছিদামের নেশা ধরেছে।নেশার ঝোঁকে সে বলল,আরে মা শোন আসল কথা। সনৎদা দুবছর আগে মরে গেছে। আর ভোলাদা আজকালের মধ্যেই সেঁটে যাবে বোধহয়। তুমি বুড়ি হয়েছ বলে কেউ বলে না। আমি বলে ফেললাম। ক্ষমা করে দিও। তবে মা, এবার তোমার মরাই ভাল। আর বেঁচে থাকলে কষ্ট পাবে গো, বলেই ছিদাম বাইরে তালা লাগিয়ে চলে গেল।
সকাল সকাল উঠে ছিদাম মন্দিরে একটা প্রণাম করে মায়ের ঘরে তালা খুলল।গু,মুত পরিষ্কার করবে বলে তৈরি হল।
তার আগে ছিদাম মায়ের গায়ে হাত দিল।অনুভুব করল, মায়ের দেহ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
সকলকে ডেকে আনল ছিদাম। মেজদা বললেন, ভাল হল বুঝলি ছিদাম। ছেলে মরার দুঃখটাতো পেল না। নাকি বল বৌমা।
নাতি নাতনিরা ঠাকুমাকে ভালবাসত। তার ফুলের মালা দিয়ে সাজাল মিতার শেষশয্যা।
ছিদাম একবার দেখল মায়ের মুখের দিক তার মনে হল, মা তাকে যেন হেসে বলছেন, তুই আমাকে মুক্ত করলি ছিদাম..।বাসে উঠেই একটা লোক এক সুন্দরী মহিলার পিছনে দাঁড়ালো।বাসে বেশ ভিড়। এই লোকাল বাসগুলো একদম, যাকে বলে নড়বড়ে। খাটালা বাস দুলতে দুলতে চলেছে। লোকটি আরামসে পিছনে দাঁড়িয়ে । কোনরকমে ব্যালেন্স রেখে দাঁড়িয়ে আছেন।
বাসের কুড়ি জোড়া চোখ কমপক্ষে নজর রাখছে।
মহিলাটি গর্জে উঠলেন,সকালে উঠেই গাঁজা সেবন করেছেন মনে হয়। একটু সরে দাঁড়ান। নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুন। লোকটি সরে দাঁড়াল। কিন্তু ব্যালেন্স রাখতে পারছেন না ভিড়ে।
আমি দূরে ছিলাম। বুঝলাম,লোকটার কপালে কষ্ট আছে।
একটা বছর চল্লিশের যাত্রী লোকটাকে বললো, দু কান কাটা আপনার। সরে দাঁড়ান। তা না হলে এক ঘা নিচে পড়বে না। সাবধান। এইসব যাত্রীরা সিন ক্রিয়েট জন্য ছুটে যায় ।কিন্তু প্রয়োজনে হাওয়ার মত মিলিয়ে যায়।
হঠাৎ মহিলাটি ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটার গালে সপাটে এক চড় মারলেন। লোকটি চড় খেয়ে গালে হাত রেখে বসে পড়লেন।
মহিলাটি একটু অবাক হলেন। মহিলাটি দেখলেন লোকটি দুহাতে সব্জী ভরতি একটা ব্যাগ ধরে আছেন।
লোকটি কোনো প্রতিবাদ করলেন না কেন
আমি ভাবলাম, কি হলো উনি বসে পড়লেন কেন?
বছর পঁচিশের একটি ছেলে এগিয়ে গিয়ে বললো,বসে কেন? উঠে বসুন। যান নেমে যান। না হলে দেবো আর এক চড়। বদমাশ কোথাকার। আরও পাঁচজন কন্ডাকটরকে ডাকলেন।অভিযোগ করলেন বসে থাকা লোকটার বিরুদ্ধে।
কনডাক্টর ভাড়া নিতে এলেন। সবাই ভাড়া দিলেন। কিন্তু লোকটি বসে আছে। কন্ডাকটর ভাড়া নিলেন না তার কাছে। একটা সিট খালি হলে বসিয়ে দিলেন আদরে।
মহিলা জিজ্ঞেস করলেন,ভাই ওনার ভাড়া নিলেন না কেন?
কন্ডাকটর বললেন, আপনি চড় মারলেন দেখলাম। কিন্তু যাকে মারলেন সে দেখতে পায় না, আপনার আমার মত। কথাও বলতে পারেন না। তবু উনি ভিক্ষা করে টাকা জোগাড় করে একটা অনাথ সেবাশ্রম চালান। মিথ্যে কথা মনে হচ্ছে নয়? সাজানো গল্পের মত মনে হচ্ছে, তাই না?
এক ভদ্রলোক বললেন, না না। সত্যিকথা আমিও জানি। আমি দেখলে ওনাকে বাধা দিতাম চড় মারার সময়।
মহিলাটি হঠাৎ করে কেঁদে ফেললেন। বাসের মধ্যে একটা থমথমে পরিবেশ। অন্ধ সমাজসেবী চুপচাপ নেমে গেলেন বাস থেকে। তার,যে অনেক কাজ। তারপর দুটো স্টপেজের পরে আমিও নিচে নেমে ভাবলাম, নিঃশব্দে বিবেকের চড়টা, মহিলার গালে বেশ জোরেই লেগেছে। তা না হলে উনি কাঁদবেন কেন?অন্ধলোকটি সত্যিকারের মানব প্রেমিক।বেশ ভাল লাগল ভেবে যে, সব পুরুষ ভন্ড,অসভ্য হয় না। কেউ কেউ প্রেমিকও হন…
আমি এখন বিশুর পাশে বাড়িতে আছি সংসার নিয়ে। অনেক বন্ধু ছেড়ে চলে গেছেন পরপারে। সৈকত,অংশুমান,লতিকা, ছিদাম এখন বৃদ্ধ বয়সে মন্ডপতলায় আড্ডা মারে। নূর আলি,আদৃজা, সুনীল ও আরও অনেক বন্ধু পর্দাটানার অপেক্ষায় বুড়ো হয়ে বসে আছি। জীবনের স্টেজে অভিনয় এবার শেষ হবার পালা।
করোনার আক্রমণে মৃত্যু এখন ঘরে ঘরে।এখন ২০২০ সালে করোনা আর আম্ফপানে মানুষ বিপদগ্রস্ত। একদিন আলো জাগবে। জীবন হাসবে। জীবনগুলো মিলিয়ে যায় ছন্দবিহীন, এক অজানা বলয়ে।বিশুর সঙ্গে আমি,মিলু,রমেন,অলোক ও আরও সবাই একসঙ্গে থাকতাম। একই অঞ্চলে বাড়ি হওয়ার জন্য সকলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে বংশ পরম্পরায়। বিশু বলে, মহাকাল এবার হয়ত পৃথিবী ধ্বংস করার পথে,নব সৃষ্টির আশায়। আমি বললাম, ধ্বংসের পরেই আবার সৃষ্টিসুখে সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেন নব উদ্যমে, নব আশায়। চক্রাকারে পাক খায় ধ্বংস, সৃষ্টি, সুখ, দুঃখ,আর সত্য মিথ্যার চাকা। শেষে জয় হয় নব উদ্যমের নব সৃষ্টির, নব আশায় বুক বাঁধে পৃথিবীর মানুষ।